সৌদি-পাকিস্তান চুক্তিতে তুরস্কের যোগদানের আগ্রহ, মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিরক্ষার নতুন বাজারকে সামনে আনছে!
আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে, ব্লুমবার্গ গত ৯ জানুয়ারি জানিয়েছে, চার মাস আগে স্বাক্ষরিত সৌদি আরব–পাকিস্তান পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যুক্ত হতে আগ্রহী তুরস্ক। সময়টি গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প প্রশাসনের মর্জিমাফিক চলার সময়েই আঙ্কারা এই আগ্রহ দেখাচ্ছে—যখন লেনদেনভিত্তিক মার্কিন নিরাপত্তা নীতির বিরুদ্ধে সুরক্ষা গড়ে তোলার ধারণা আর তাত্ত্বিক নয়, বরং বাস্তবেই এর প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে।
তবে এটিকে যদি "তুরস্ক ন্যাটো থেকে সরে যাচ্ছে" ধরনের কোনো গল্প হিসেবে পড়েন, তাহলে মূল সংকেতটি আপনার চোখ এড়িয়ে যাবে।
আসল গল্পটি হলো—মধ্যপ্রাচ্যে এখন নিরাপত্তা কীভাবে কেনাবেচা হচ্ছে। এটা আর একক ছাতার নিচে নয়, বরং স্তরভিত্তিক একটি পোর্টফোলিও হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। চুক্তির প্রতিটি ধারা ধরে ধরে। এর মাধ্যমে সৃষ্ট করিডর ধরে ধরে। আর বাণিজ্যিক যুক্তি নীরবে এর সেলাইয়ের ভেতর গেঁথে দেওয়া হচ্ছে।
কারণ ২০২৬ সালে এসে নিরাপত্তা আর শুধু চুক্তি দিয়ে নির্ধারিত হয় না। এটি নির্ধারিত হয় অর্থায়ন, যৌথ উৎপাদন, লজিস্টিকস এবং সেই রাজনীতির ছায়ায় অনুসরণ করা ক্রয় সিদ্ধান্তের মাধ্যমে।
এই পদক্ষেপকে সংজ্ঞায়িত করছে তিনটি মাত্রা
তুরস্কের এই চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার উদ্যোগ তিনটি মাত্রায় কাজ করছে, যা নির্ধারণ করবে এটি কেবল প্রতীকী কোনো অঙ্গভঙ্গি নাকি উপসাগরীয় নিরাপত্তা কাঠামোয় একটি কাঠামোগত পরিবর্তন।
মাত্রা ১: রাজনৈতিক সংকেত বনাম কার্যকর একীভূতকরণ
সমষ্টিগত প্রতিরক্ষা ধারা মানেই সমষ্টিগত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নয়। ন্যাটোর ৫ নং অনুচ্ছেদ শক্তিশালী, কারণ এর পেছনে রয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান—গভীর পরিকল্পনা, আন্তঃকার্যকারিতা মানদণ্ড, কমান্ড একীভূতকরণ এবং সাত দশক ধরে সদস্য দেশগুলোর একযোগে সামরিক কার্যক্রম পরিচালনার অভ্যাস। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর স্বাক্ষরিত সৌদি–পাকিস্তান চুক্তিতে এসব অবকাঠামো নেই—অন্তত এখনো নয়।
করপোরেট ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা টিমগুলোর কাছে এই পার্থক্যটি নির্ণায়ক। একটি ধারা গল্প বদলায়। প্রতিষ্ঠান বদলায় ঝুঁকি প্রিমিয়াম। প্রশ্ন হলো—তুরস্ক কোন সংস্করণে বিনিয়োগ করছে।
মাত্রা ২: প্রতিরক্ষা–শিল্প চ্যানেল
এই চুক্তির বাণিজ্যিক যুক্তি তার বক্তব্যগত কাঠামোর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রয়টার্স চলতি মাসে জানিয়েছে, সৌদি আরবের পাকিস্তানকে দেওয়া ঋণকে সামরিক সরঞ্জাম প্যাকেজে রূপান্তর করার আলোচনা চলছে। এটিই এখন ছক: নিরাপত্তা চুক্তি ক্রমেই ক্রয়, যৌথ উৎপাদন ও প্রতিরক্ষা–শিল্প সমন্বয়ের অর্থায়নের বাহনে পরিণত হচ্ছে।
তুরস্ক যদি এই কাঠামোয় যুক্ত হয়, প্রথম দৃশ্যমান সংকেত হবে না নাটকীয় নিরাপত্তা নিশ্চয়তা। বরং সেগুলো হবে নীরব ও পরিমাপযোগ্য—যৌথ উৎপাদনের ঘোষণা, মহড়ার সময়সূচি, রপ্তানি ঋণ কাঠামো, বন্দর ও লজিস্টিক সুবিধায় প্রবেশাধিকার। এসব উপাদান যথেষ্ট কার্যকর, আবার যথেষ্ট অস্পষ্টও যাতে বিশেষ পরিস্থিতিতে অস্বীকার করা যায়, এবং যথেষ্ট বাণিজ্যিক যাতে বেসামরিক অংশীজনদেরও আকৃষ্ট করে।
মাত্রা ৩: প্রতিরোধের ধারণা বনাম প্রতিরোধের বাস্তবতা
পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্তি এই নিরাপত্তা কাঠামোয় এমন কিছু নিয়ে আসে, যা খুব কম দেশই বড় পরিসরে বিক্রি করতে পারে: সেটা হচ্ছে দেশটির কঠোর নিরাপত্তা সক্ষমতার ধারণা—যার মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের ইঙ্গিতও রয়েছে। যদিও তা সৌদি-পাকিস্তান চুক্তির ভাষ্যে উল্লেখ নেই। সৌদি আরব সেই ধারণাগত প্রিমিয়াম কিনছে। প্রশ্ন হলো, তুরস্কের সম্ভাব্য অন্তর্ভুক্তি এটিকে আরও শক্তিশালী করবে, নাকি দুর্বল করবে।
অ্যাক্টর-ইন্টারেস্ট ম্যাট্রিক্স: কে কী চায়
এই উদ্যোগটি বুঝতে হলে বিভিন্ন অংশীজনের প্রতিদ্বন্দ্বী মনোভাবের ম্যাপিং করা দরকার হবে। যেমন—
তুরস্কের হিসাব: বিচ্ছেদ নয়, দরকষাকষির শক্তি
আঙ্কারা ন্যাটো ছাড়েনি। তুরস্ক বিকল্প তৈরি করছে—সমান্তরাল সম্পর্ক হিসেবে, যা জোট রাজনীতি যখন লেনদেনভিত্তিক হয়ে ওঠে, তখন তার দরকষাকষির পরিসর বাড়ায়। লক্ষ্য হলো ঝুঁকি-বিমা কাঠামো, কোনো বিদ্যমান নিরাপত্তা ব্লককে বা এইক্ষেত্রে ন্যাটোকে প্রতিস্থাপন করা নয়।
এই ধারা বহু বছর ধরেই দৃশ্যমান: ন্যাটোর আপত্তি সত্ত্বেও রাশিয়া থেকে এস-৪০০ কেনা, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে প্রতিরক্ষা–শিল্প সম্পর্ক গভীর করা, এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানি—বিশেষ করে ড্রোন—যা পশ্চিমা চ্যানেলের বাইরে আঙ্কারার কূটনৈতিক প্রভাব তৈরি করেছে। সৌদি–পাকিস্তান কাঠামোয় প্রবেশের চেষ্টা সেই যুক্তিকেই প্রসারিত করে।
সৌদি আরবের সমীকরণ: বিদ্রোহ নয়, বিকল্প নিরাপত্তা
রিয়াদ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে মূল্য দেয়। তবে দেশটি বিকল্প বা প্রতিরক্ষা সম্পর্ক তৈরি করছে, এমন সম্ভাবনা মাথায় রেখেই যে, ওয়াশিংটন যদি তার অভ্যন্তরীণ কোনো কারণে বিপদের সময় রিয়াদের নিরাপত্তা না দেয়, তাহলে নতুন নিরাপত্তা চুক্তির অংশীদাররা যেন কিছুটা হলেও তা করতে পারে। এতে নিরাপত্তা নিয়ে সৌদি শাসকদের চিরকালীন শঙ্কা অনেকটা দূর হয়, এবং তা অনিশ্চয়তার খরচ কমায়।
পাকিস্তানের সঙ্গে চুক্তি সেই বিকল্পের একটি স্তর। তুরস্ক আরেকটি স্তর যোগ করবে: কারণ দেশটি ন্যাটোর সদস্য, আবার ন্যাটো জোটের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনীও তাদের। আঙ্কার রয়েছে প্রতিষ্ঠিত প্রতিরক্ষা–শিল্প সক্ষমতা এবং ইউরোপ, ককেশাস ও মধ্যপ্রাচ্যের সংযোগস্থলে ভৌগোলিক অবস্থান।
পাকিস্তানের মূল্যায়ন: নগদ লাভের স্বার্থ
পাকিস্তানের স্বার্থ তুলনামূলকভাবে সরল—চুক্তির নগদায়ন। একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি বাণিজ্যিক চ্যানেল হিসেবে কাজ করে—অস্ত্র প্যাকেজ, যৌথ উৎপাদন, প্রশিক্ষণ ধারাবাহিকতা ও অর্থায়ন কাঠামো এতে অন্তর্ভুক্ত থাকে। নিরাপত্তা এখানে ব্যালান্সশিটের একটি হাতিয়ার, যা ভূরাজনৈতিক সম্পর্ককে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগয়ে রূপান্তর করে। আবার সামরিক শিল্পের সক্ষমতাতেও রূপান্তর ঘটায়।
করপোরেট সিদ্ধান্তকারীদের কেন এখনই এর দাম নির্ধারণ করা উচিত
যারা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরজুড়ে কার্যক্রম থাকা কোনো কোম্পানির বোর্ড পরিচালনা করেন, তাহলে এই প্রভাবগুলো চুক্তির ভাষার কোনো সামরিক পরীক্ষার আগেই দেখতে পারবেন।
নিরাপত্তা আখ্যান বদলালে আঞ্চলিক ঝুঁকির প্রিমিয়াম সমন্বয় হয়। বীমা ব্যয়, কাউন্টারপার্টি মূল্যায়ন ও অর্থায়নের শর্ত—সবই প্রতিরক্ষা কাঠামোর পরিবর্তনে সাড়া দেয়, এমনকি তা অস্পষ্ট হলেও। ব্যবসাবানিজ্যে এর প্রভাব টের পেতে যুদ্ধের প্রয়োজন নেই। দরকার শুধু ঝুঁকির গল্পে এমন পরিবর্তন, যাতে ঋণদাতা ও বীমাকারীরা তাদের আচরণ মূল্যায়ন করতে শুরু করে।
কাঠামোগত পরিবর্তন: পোর্টফোলিও হিসেবে নিরাপত্তা
তিন দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা একটি অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল: যেখানে প্রভাবশালী এক গ্যারান্টর হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ছিল, যার অঙ্গীকার ছিল নির্ভরযোগ্য।
সেই যুগটি এখন প্রতিস্থাপিত হচ্ছে আরও জটিল ও বাণিজ্যিক এক ব্যবস্থায়। একের ওপর এক ক্ষুদ্র জোট। বিকল্প তৈরির কৌশল। প্রতিরক্ষা–শিল্প করিডর, যেখানে কূটনীতি ও চুক্তির সীমারেখা ঝাপসা।
তুরস্ক যদি সৌদি–পাকিস্তান চুক্তির দিকে এগোয়, তাহলে তা সেই রূপান্তরের আরেকটি ধাপ চিহ্নিত করবে। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা এখন একটি পোর্টফোলিও—আর পোর্টফোলিও মানেই সক্রিয় ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
কোম্পানিওয়ালাদের বোর্ডরুমের জন্য সারকথা হলো: ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি আর মাঝেমধ্যে আসা কোনো ধাক্কা নয়। এটি এমন এক পরিবর্তনশীল কাঠামো, যা নীরবে আপনার ব্যয়ভিত্তি পুনর্মূল্যায়ন করতে পারে। যারা সামরিক সরঞ্জামের পাইপলাইন, ক্রয় প্রবাহ, মহড়ার সময়সূচি, অর্থায়ন কাঠামোয় নজরে রাখছেন, তারা পরিবর্তনগুলো দেখবেন তা খবরের শিরোনামে আসার যথেষ্ট আগেই।
