বিমানের চড়া ডলার রেটের চাপে ফ্রেইট ফরোয়ার্ডাররা, সুবিধা পাচ্ছে বিদেশি এয়ারলাইনস
রপ্তানি পণ্য পরিবহনে একমাত্র গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের নির্ধারিত ডলারের বিনিময় হার কয়েক মাস ধরেই ব্যাংকের প্রচলিত হারের চেয়ে বেশি। এতে স্থানীয় ফ্রেইট ফরোয়ার্ডারদের খরচ বাড়ছে এবং মুনাফা কমছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের এয়ার কার্গো বাজারে আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে বিদেশি এয়ারলাইনগুলো—এমনটাই বলছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাফা) তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাইয়ে প্রতি ডলারে এই ব্যবধান ছিল ২ টাকা ৮৩ পয়সা। সম্প্রতি ব্যবধান কিছুটা কমলেও ৮ সেপ্টেম্বর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের নির্ধারিত বিনিময় হার সোনালী ব্যাংকের টিটি ক্লিন রেটের চেয়ে ১ টাকা ১৫ পয়সা বেশি ছিল।
বাফা জানায়, ৮ সেপ্টেম্বর থেকে রপ্তানি পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ১২৩ টাকা ৬৫ পয়সা নির্ধারণ করেছে বিমান। একই দিনে সোনালী ব্যাংকের টিটি ক্লিন রেট ছিল ১২২ টাকা ৫০ পয়সা।
সংগঠনটির মতে, বিমানের তুলনামূলক বেশি বিনিময় হারের কারণে ফ্রেইট ফরোয়ার্ডারদের খরচ সরাসরি বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের আকাশপথে রপ্তানি কার্গো পরিবহনকারী প্রায় ৮৫ শতাংশ বিদেশি এয়ারলাইনস এই বাড়তি হারের সুবিধা পাচ্ছে।
বিষয়টি নিয়ে গত ১৩ সেপ্টেম্বর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে চিঠি দেন বাফার সভাপতি মো. আরিফুল হাসান। বাজার পরিস্থিতি ও ব্যাংকগুলোর প্রচলিত বিনিময় হার বিবেচনায় নিয়ে বিমানের নির্ধারিত হার পর্যালোচনার আহ্বান জানান তিনি।
বাফা বলছে, তুলনামূলক বেশি বিনিময় হারের কারণে ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে। একই সঙ্গে এতে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের সামগ্রিক ব্যয়ও বাড়ছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, রপ্তানি পণ্যের ফ্রেইট পরিশোধে মূলত দুটি পদ্ধতি প্রচলিত—'ফ্রেইট প্রিপেইড' ও 'ফ্রেইট কালেক্ট'। প্রিপেইড পদ্ধতিতে রপ্তানিকারক আগেই পণ্য পরিবহনের ভাড়া পরিশোধ করেন। আর ফ্রেইট কালেক্ট পদ্ধতিতে পণ্য গন্তব্যে পৌঁছানোর পর আমদানিকারক পরিবহন ভাড়া পরিশোধ করেন।
ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার নাসির আহমেদ বলেন, "রপ্তানি পণ্যের প্রায় ১০ শতাংশ প্রিপেইড পদ্ধতিতে এবং বাকি ৯০ শতাংশ ফ্রেইট কালেক্ট পদ্ধতিতে পরিবহন করা হয়। ফলে বিনিময় হারের পার্থক্যজনিত সমস্যার বেশির ভাগই ফ্রেইট কালেক্ট চালানের ক্ষেত্রে তৈরি হয়।"
প্রিপেইড পদ্ধতিতে পণ্য গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত পরিবহন ব্যয় বহন করেন রপ্তানিকারক। অন্যদিকে, ফ্রেইট কালেক্ট পদ্ধতিতে গন্তব্যে পণ্য পৌঁছানোর পর বিদেশি আমদানিকারক পরিবহন ভাড়া পরিশোধ করেন।
ফ্রেইট কালেক্টের ক্ষেত্রে বিদেশি পক্ষের কাছ থেকে ডলারে পরিবহন ভাড়া আদায় এবং দেশে এয়ারলাইনসকে টাকায় তা পরিশোধের সময় বিনিময় হারের পার্থক্যের কারণে ফ্রেইট ফরোয়ার্ডারদের লোকসান হয়।
খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, মোট রপ্তানি কার্গোর প্রায় ১০ শতাংশ পরিবহন করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। ফলে বাংলাদেশের আকাশপথে রপ্তানি কার্গোর বড় অংশ পরিবহনকারী বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোই তুলনামূলক বেশি বিনিময় হারের কারণে বেশি আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে।
বর্তমানে ঢাকার বিমানবন্দর থেকে প্রায় ৩৮টি বিদেশি এয়ারলাইনস ফ্লাইট পরিচালনা করছে। এর মধ্যে এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজ, সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস, থাই এয়ারওয়েজ, সৌদিয়া, মালয়েশিয়া এয়ারলাইনস ও ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনস উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্গো পরিবহন করে।
কার্গোর পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেলে এয়ারলাইনসগুলো পণ্য পরিবহনের জন্য পৃথক কার্গো ফ্লাইটও পরিচালনা করে। ইন্টারন্যাশনাল এয়ার এক্সপ্রেস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৪০০ থেকে ৪৫০ টন রপ্তানি কার্গো পরিবহন করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, ঢাকা কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন সাধারণত প্রায় ৪০০ টন আমদানি কার্গো আসে। তবে কোনো কোনো দিন এর পরিমাণ কমে প্রায় ৩০০ টনও হয়।
বছরে প্রভাব ২০০ কোটি টাকা
দেশের মোট রপ্তানি কার্গোর বিপরীতে বিনিময় হারের এই পার্থক্য হিসাব করলে এর আর্থিক প্রভাব উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠে।
খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর তৈরি পোশাক খাতের প্রায় ২ লাখ ১৪৮ টন রপ্তানি কার্গো পরিবহন করা হয়েছে, যার মোট ফ্রেইট মূল্য ছিল ১০০ কোটি ডলারের বেশি। প্রতি ডলারে ২ টাকা বিনিময় হার বেশি ধরা হলে বছরে অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় আনুমানিক ২০০ কোটি টাকা।
ফ্রেইট ফরোয়ার্ডাররা বলছেন, কম মুনাফায় ব্যবসা পরিচালনা করায় এই অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তাদের জন্য বিশেষভাবে কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করছে।
নাসির আহমেদ বলেন, "ধরা যাক, একজন ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার ১ লাখ ডলারের এয়ার কার্গো হ্যান্ডল করছেন। এই ব্যবসায় প্রতিযোগিতা এত বেশি যে বড় অঙ্কের মুনাফার সুযোগ খুবই কম। এমনকি ৫ শতাংশ মুনাফা ধরলেও তার আয় হবে মাত্র ৫ হাজার ডলার।"
তিনি বলেন, সম্প্রতি একটি ব্যাংক প্রতি ডলার প্রায় ১২১ টাকা ৭৫ পয়সা দরে দেওয়ার প্রস্তাব দিলেও এয়ার কার্গোর ক্ষেত্রে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিনিময় হার ছিল প্রায় ১২৩ টাকা ৬৫ পয়সা। অর্থাৎ প্রতি ডলারে ব্যবধান প্রায় ১ টাকা ৯০ পয়সা।
তিনি বলেন, "শুধু বিনিময় হারের পার্থক্যের কারণেই যদি প্রায় ২ হাজার ডলার লোকসান হয়, তাহলে মুনাফার বড় একটি অংশই চলে যায়। এর সঙ্গে উৎসে কর (টিডিএস) এবং বিমানবন্দর ও হ্যান্ডলিংয়ের অন্যান্য খরচ যোগ হলে প্রকৃত মুনাফা আরও কমে যায়।"
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে বিনিময় হারের পার্থক্যজনিত এই অতিরিক্ত ব্যয় ফ্রেইট ফরোয়ার্ডাররা চাইলেই রপ্তানিকারকদের ওপর চাপাতে পারেন না।
বাজার হারানোর শঙ্কায় স্থানীয় ফ্রেইট ফরোয়ার্ডাররা
খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১ হাজার ৪০০টি ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তবে এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক প্রতিষ্ঠান নিয়মিত পণ্য পরিবহনের কাজ করে।
নাসির আহমেদ বলেন, স্থানীয় ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং ও লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে নিজেদের সক্ষমতা ও অবকাঠামো গড়ে তুলছে। তবে বিনিময় হারের পার্থক্যের কারণে ধারাবাহিকভাবে লোকসান হলে তাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, স্থানীয় ফ্রেইট ফরোয়ার্ডারদের ওপর এ চাপ অব্যাহত থাকলে একপর্যায়ে তাদের বাজার অংশীদারত্ব কমে যেতে পারে এবং এ খাতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চায় বাফা
গত ২ জুলাই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে দেওয়া এক চিঠিতে বাজারে প্রচলিত বিনিময় হারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডলারের বিনিময় হার পুনর্নির্ধারণের আহ্বান জানায় বাফা।
এ বিষয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মুখপাত্র মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিমান নিজে থেকে কোনো বিনিময় হার নির্ধারণ করে না।
তিনি বলেন, "বিমান ইচ্ছামতো ডলারের বিনিময় হার নির্ধারণ করে না। সরকার যে হার নির্ধারণ করে দেয়, বিমান সেটিই অনুসরণ করে। বিষয়টি নিয়ে আমি আমাদের অর্থ বিভাগের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা কিছুদিন ধরে এ নিয়ে আলোচনা করছে।"
