১২২ অপরাধী চক্র ঢাকায় সক্রিয়: সংখ্যায় শীর্ষে মিরপুর, সবচেয়ে বেশি সহিংসতা মোহাম্মদপুরে
রাজধানী ঢাকায় কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজ ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর সাঁড়াশি অভিযান শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা গেছে, শহরে বর্তমানে ১২২টি সক্রিয় অপরাধী চক্র বা গ্যাং কাজ করছে। কিশোর গ্যাংয়ের ক্রমবর্ধমান সহিংসতা এবং অপরাধী চক্রগুলোর পেছনে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা থাকার বিষয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদনের পরই এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি গ্যাংভিত্তিক খুনের ঘটনা নগরবাসীকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। গত ২০২৬ সালের ১২ এপ্রিল মোহাম্মদপুরভিত্তিক 'অ্যালেক্স গ্রুপ'-এর নেতা এবং ১৮টি মামলার আসামি ইমন হোসেন ওরফে অ্যালেক্স ইমনকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এই হত্যা মামলায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে 'পিচ্চি হেলাল'-কে আসামি করা হয়।
এরপর গত ১৫ সেপ্টেম্বর কেরানীগঞ্জের আর্শিনগরে একটি সেলুনের ভেতর গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয় 'পাতালি গ্রুপ'-এর নেতা ফরহাদকে, যিনি মূলত পিচ্চি হেলালের নির্দেশে কাজ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ডিএমপির প্রতিবেদনে দেখা যায়, এই গ্যাংগুলোর বেশিরভাগই পূর্বে আওয়ামী লীগের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হলেও বর্তমানে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা বর্তমান ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতাদের হাতে চলে গেছে।
সক্রিয় গ্যাংয়ের শীর্ষে মিরপুর, সহিংসতায় মোহাম্মদপুর
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, অপরাধী চক্র উপস্থিতির দিক থেকে মিরপুর বিভাগ সবচেয়ে এগিয়ে, যেখানে ৩২টি গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এরপরই রয়েছে তেজগাঁও বিভাগ (৩০টি)। বাকি গ্যাংগুলো ওয়ারী (১৩টি), গুলশান (১১টি), লালবাগ (১০টি), উত্তরা (১০টি), মতিঝিল (১০টি) এবং রমনা (৬টি) বিভাগে ছড়িয়ে আছে।
সংখ্যার দিক থেকে মিরপুর শীর্ষে থাকলেও, তেজগাঁও বিভাগের মোহাম্মদপুর জোনই সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংঘাতের ক্ষেত্র হিসেবে উঠে এসেছে।
২০২৪ সালের আগস্ট থেকে শুধু মোহাম্মদপুরেই গ্যাং-সংশ্লিষ্ট সংঘর্ষে অন্তত ২৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এই ক্রমবর্ধমান রক্তপাত রুখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাউন্টার-অপারেশন জোরদার করেছে। তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান জানান, অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে আগে সপ্তাহে এক বা দু'বার ব্লক রেইড দেওয়া হলেও, এখন তা প্রায় এক দিন পরপরই দেওয়া হচ্ছে।
ডিএমপির মিরপুর বিভাগের ৩২টি গ্যাংয়ের মধ্যে ১৪টি কেবল পল্লবী থানা এলাকাতেই সক্রিয়। এছাড়া দারুস সালাম এলাকায় রয়েছে ৬টি গ্যাং। পুলিশের গোয়েন্দা সূত্র জানায়, মিরপুরে বর্তমানে 'মামুন বাহিনী' এবং 'ফাইভ স্টার গ্রুপ' নামের দুটি নতুন চক্র সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তারা পল্লবী, রূপনগর এবং ভাসানটেকে জমি ও ব্যবসা দখল, নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, ফুটপাত, বাজার, বস্তি, পোশাক কারখানা এবং ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ব্যাপক চাঁদাবাজি চালাচ্ছে। মিরপুরের ডিসি হাসান মোহাম্মদ নাসের রিকাবদার জানিয়েছেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ অভিযান চলছে এবং গ্যাং ও চাঁদাবাজি দমনে পুলিশকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কঠোর হওয়ার ঘোষণা সরকারের
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির শীর্ষ কর্মকর্তাদের দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, 'একজন অপরাধীর একমাত্র পরিচয় হলো সে একজন অপরাধী।' তিনি কমিউনিটি পুলিশিংয়ের সহায়তায় কঠোর মাদকবিরোধী অভিযানের আহ্বান জানান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও একই সুরে কথা বলেছেন। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে তিনি বলেন, 'সন্ত্রাসীরা যেখানেই লুকিয়ে থাকুক না কেন, তাদের সমূলে উৎপাটন করা হবে। দেশের কোথাও কোনো সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী বা চাঁদাবাজ আশ্রয় পাবে না।' তিনি আরও যোগ করেন, 'রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, যে অপরাধ করবে বা অপরাধীদের প্রশ্রয় দেবে—তাকে অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে।'
গত ২৯ সেপ্টেম্বর পুলিশ সদর দপ্তরে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা এই নির্দেশনার ওপর জোর দেন। ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, 'মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়ে আমাদের জিরো টলারেন্স নীতি রয়েছে। তবে শুধু পুলিশের পক্ষে এই সমস্যা নির্মূল করা সম্ভব নয়; জনগণের সহযোগিতাও একান্ত প্রয়োজন। আমরা ঢাকাকে একটি নিরাপদ ও সন্ত্রাসমুক্ত নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।'
এদিকে অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মো. সাইদুর রহমান কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন, এই কিশোর গ্যাংগুলোর নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের ওপর বিশেষ মনোযোগ দিতে এবং তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে।
