তথ্য অধিকার আইন জানেন মাত্র ১০%, ব্যবহারের পদ্ধতি জানা ৮ শতাংশের
দেশের অধিকাংশ নাগরিক তথ্য অধিকার আইনের প্রতি আস্থা রাখলেও এটি ব্যবহার কিংবা আবেদনের সঠিক নিয়ম জানেন খুবই কম মানুষ। দেশে বর্তমানে মাত্র ১০ দশমিক ৫ শতাংশ নাগরিক তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে অবহিত। তবে এই সচেতন অংশটির মধ্যেও আইনটি ব্যবহার করে কীভাবে তথ্যের আবেদন করতে হয়, তা জানেন ৮ শতাংশের কিছু বেশি নাগরিক।
আপিলের ক্ষেত্রেও এ ঘাটতি লক্ষণীয়। তথ্য না পেলে তথ্য কমিশনে আপিল করার সুযোগ রয়েছে—এই বিষয়টি জানেন মাত্র ১৯ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ। অন্যদিকে, দেশের প্রায় ৪৬ শতাংশ নাগরিক মনে করেন, কোনো তথ্যের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে তা নিষ্পত্তি করবেন ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান।
আন্তর্জাতিক তথ্য জানার অধিকার ২০২৬ উপলক্ষে মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ডেইলি স্টার সেন্টারে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে 'বাংলাদেশ তথ্য অধিকার জরিপ ২০২৬'-এর এই তথ্য প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশ রাইট টু ইনফরমেশন (আরটিআই) ফোরামের উদ্যোগে জরিপটি উপস্থাপন করা হয়।
জরিপটিতে ২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত নাগরিকদের তথ্যের চাহিদা, আইন বিষয়ে সচেতনতা, আইন ব্যবহারের অভিজ্ঞতা এবং তথ্য প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের ভূমিকা বিশদভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০১৯ সালে দেশের ৭ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে জানতেন, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ১০ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছে। তবে অগ্রগতি সত্ত্বেও এখনও দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ আইনটি সম্পর্কে পুরোপুরি অজ্ঞ। অঞ্চলভেদে এ হার শহরাঞ্চলে ১২ দশমিক ৪ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলে ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। এছাড়া তরুণদের মধ্যে সচেতনতার হার প্রায় ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ এবং স্নাতক ডিগ্রিধারীদের মধ্যে এটি ৩৮ শতাংশ।
তবে আইনটির বিষয়ে যারা জানেন, তাদের মধ্যে তথ্য পাওয়ার প্রক্রিয়া জানা আছে মাত্র ৮ শতাংশের কিছু বেশি মানুষের। আর তথ্য পাওয়ার নির্ধারিত সময়সীমা সম্পর্কে জানেন ৯ দশমিক ৩ শতাংশ।
অন্যদিকে, দেশের ৯১ শতাংশ নাগরিক তথ্য অধিকার আইনের প্রতি আস্থা পোষণ করলেও ৭২ দশমিক ৪ শতাংশ বিশ্বাস করেন যে আইনটি ব্যবহার করে বাস্তবে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার সুযোগ কম।
তথ্য না চাওয়ার পেছনে হয়রানি বা প্রতিশোধের ভয়কে প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গোলটেবিল বৈঠকে আইসোস্যালের চেয়ারম্যান ড. অনন্যা রায়হান বলেন, 'মানুষের মধ্যে তথ্যের চাহিদা থাকলেও হয়রানি ও প্রতিশোধের ভয় আইনটি ব্যবহারে তাদের নিরুৎসাহিত করছে।' তিনি আরও বলেন, অনগ্রসর ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য ও সীমিত সুযোগের মুখোমুখি হচ্ছে এবং অনেক সময় তারা মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়।
প্রতিবেদনে সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যেও প্রচার ও সচেতনতার ঘাটতির বিষয়টি উঠে এসেছে। জরিপ অনুযায়ী, ৬৫ শতাংশ সরকারি কর্মকর্তা আইনটি বাস্তবায়নের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ও বিস্তারিত তথ্য জানেন না। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মাত্র ৪৯ শতাংশ এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন এবং ৬৪ শতাংশ কর্মকর্তা তাদের কর্মজীবনে একটিও তথ্যের আবেদন পাননি।
এ বিষয়ে ড. অনন্যা রায়হান বলেন, কর্মকর্তাদের সাধারণ ধারণা থাকলেও আইনটি প্রয়োগে সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত বোঝার অভাব রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে তথ্য কমিশন অকার্যকর থাকায় প্রতিকারপ্রার্থী নাগরিকরা বর্তমানে গভীর সংকটে পড়েছেন বলে অনুষ্ঠানে উল্লেখ করা হয়।
এমআরডিআই-এর নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান জানান, বর্তমানে তথ্য কমিশনে ৮৫০টিরও বেশি আপিল ও শুনানির মামলা ঝুলে রয়েছে। নতুন কমিশন গঠিত হলে এই জট দ্রুত নিরসন করা এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নতুন আবেদনগুলো নিষ্পত্তির লক্ষ্যে কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।
অনুষ্ঠানে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, ২০০৯ সালে তথ্য অধিকার আইন পাস হওয়ার পর থেকে তথ্য চাওয়ার ক্ষেত্রে জনগণের আগ্রহ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি। ২০১৯ সালের তুলনায় কিছু পরিবর্তন হলেও তা একেবারেই অপ্রতুল। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো ৬৪ শতাংশ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কখনও কোনো আবেদন পাননি।
তিনি আরও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দুর্নীতি, লুটপাট, অর্থ পাচার কিংবা প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে দেখানোর মতো বড় বড় গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুগুলোতে এই আইনটির প্রয়োগ বা ব্যবহার একেবারেই হয়নি।
