আসামি ধরার প্রতিযোগিতায় ভুলের দায় নেবে কে? এক ঘটনা, দুই বাহিনী–ভিন্ন আসামি
গত ২৯ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে শিক্ষক রনজিলা পারভীনের মৃত্যুর ঘটনায় প্রথমে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। আসামিদের রিমান্ডে নেওয়া হয়, পরে পাঠানো হয় কারাগারে। এর দুই সপ্তাহ পরে ডিবি গ্রেপ্তার করে আরও দুজনকে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় রনজিলার ব্যাগ, মোবাইল ফোন ও ঘটনার সময় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল। ডিবির দাবি, আগের তিনজনের সঙ্গে রনজিলার মৃত্যুর ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি।
একই ঘটনায় দুই বাহিনীর ভিন্ন আসামি শনাক্তের এই ঘটনায় এখন সামনে এসেছে ভুল গ্রেপ্তার, তদন্তের দায় এবং ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন।
ভুলভাবে গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের স্বজনদের অভিযোগ, নির্দোষ হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের গ্রেপ্তার, রিমান্ডে নেওয়া ও কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এতে তাঁরা হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। এ ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
মানবাধিকার কর্মী নুর খান বলেন, "আইনগতভাবে তদন্তে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ বা গ্রেপ্তারের সুযোগ আছে। কিন্তু, সমস্যা তৈরি হয় যখন তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই, সংবাদ সম্মেলনে কাউকে অপরাধের সঙ্গে জড়িত হিসেবে জনসমক্ষে উপস্থাপন করা হয় এবং পরে অন্য তদন্তে তাঁর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায় না।"
তাঁর মতে, গ্রেপ্তার শুধু একজন ব্যক্তির স্বাধীনতা কেড়ে নেয় না; তাঁর পরিবার সামাজিকভাবে হেনস্তার শিকার হতে পারে, কর্মজীবন ও অর্থনৈতিক অবস্থায় ক্ষতি হতে পারে। রিমান্ড ও কারাগারে থাকার মানসিক চাপও কম নয়।
দুই সপ্তাহে পাল্টে গেল দৃশ্যপট
গত ২৯ আগস্ট রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে চলন্ত রিকশা থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন বগুড়ার বাগবাড়ী সরকারি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভীন (৫৬)। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার পরদিন ৩০ আগস্ট তৎকালীন র্যাব-২ (বর্তমানে এসআরবি-২) জানায়, ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে পনি ওরফে প্যারা পনি ওরফে পনি গাজী ও সেড্রিক জুলিয়ানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে মোটরসাইকেলের মালিক মো. রাকিব হোসেনসহ মোট তিনজনকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। তাঁদের রিমান্ডেও নেওয়া হয়।
র্যাবের ভাষ্য ছিল, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পর্যাপ্ত প্রমাণ ও তথ্য-উপাত্ত পাওয়ার পর—তদন্তের অংশ হিসেবে তাঁদের সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়েছে। আটকের পর ব্রিফিংয়ে তৎকালীন র্যাব-২-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি নয়মুল হাসান বলেন, "পনির বিরুদ্ধে আগেও বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে।"
৫ সেপ্টেম্বর রিমান্ড শেষে রনজিলার মৃত্যুর ঘটনায় গ্রেপ্তার তিনজনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত। এক মাস ধরে তাঁরা কারাগারে রয়েছেন।
তবে ১৬ সেপ্টেম্বর তদন্তের চিত্র বদলে যায়।
ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগ জানায়, রনজিলার মৃত্যুর ঘটনায় মো. খোকন ও রাজীব মাতুব্বরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ডিবির দাবি, সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে তাঁদের শনাক্ত করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে রনজিলার ব্যাগ, মোবাইল ফোন এবং ঘটনার সময় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে বলেও জানায় ডিবি।
ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার তিনজনের সঙ্গে রনজিলার মৃত্যুর ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। র্যাব যে মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছিল, সেটিও ঘটনার সময় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল নয় বলে জানান তিনি।
রনজিলার স্বামী আব্দুল মতিনও সাংবাদিকদের ডিবির হাতে উদ্ধার হওয়া ভ্যানিটি ব্যাগ ও মোবাইল ফোন নিজের স্ত্রীর বলে নিশ্চিত করেন। গ্রেপ্তার হওয়া খোকনকে ছিনতাইকারী হিসেবে শনাক্তও করেছেন তিনি।
ডিবির হাতে গ্রেপ্তার খোকন ও রাজীব ১৭ সেপ্টেম্বর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
ডিবির হাতে নতুন দুই আসামি গ্রেপ্তারের পর সাবেক র্যাব-২ (এসআরবি-২)-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি নয়মুল হাসান বলেন, "গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তের অংশ হিসেবে ওই তিনজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে পনি পেশাদার অপরাধী," বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
নয়মুল হাসান বলেন, "আমরা আমাদের কাজ করেছি, তারা (ডিবি) তাদের কাজ করেছে। আমরা কেউই চাই না, কোনো নির্দোষ ব্যক্তি শাস্তি পাক। আমাদের এ ধরনের কোনো ইচ্ছা বা উদ্দেশ্য ছিল না।"
তদন্তে আসামিদের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ পাওয়া না গেলে, অভিযোগপত্র থেকে তাঁদের বাদ দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
রাকিব হোসেনের আইনজীবী মেহেদী হাসান আজ বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) টিবিএসকে বলেন, "শুরু থেকেই সিসিটিভি ফুটেজ ও উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেলের সঙ্গে তাঁর মক্কেলের সম্পৃক্ততা ছিল না।" পরে ডিবির হাতে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে রনজিলার ব্যাগ ও ঘটনার সময় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল উদ্ধারের পর তাঁদের দাবিই সত্য প্রমাণিত হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
মেহেদী বলেন, রাকিবের জামিনের জন্য সিএমএম আদালতে আবেদন করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আগামী ৮ নভেম্বর শুনানির দিন ধার্য রয়েছে। এর আগে গত ২০ সেপ্টেম্বর তাঁর জামিন আবেদন নামঞ্জুর হয়েছে।
রনজিলা পারভীনের ঘটনার মতো একই মামলায় দুই বাহিনীর হাতে ভিন্ন ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের ঘটনা নতুন নয়।
২০১০ সালে ঢাকার বংশালে আসামি ধরতে গিয়ে পুলিশের উপপরিদর্শক গৌতম রায় নিহত হওয়ার পর—পুলিশ ও র্যাব পৃথক ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করে। র্যাব আলী হায়দার ও জাকির হোসেনকে গ্রেপ্তার করে তাঁদের হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার দাবি করে। অন্যদিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে আহম্মেদ আলী ওরফে হায়দার ও জাকির হোসেনকে। একই ঘটনায় একই ধরনের নামে চারজন গ্রেপ্তার হওয়ায়, দুই সংস্থার মধ্যে প্রকাশ্য বিরোধ তৈরি হয়।
পরে ডিবির তদন্তে র্যাবের গ্রেপ্তার করা আলী হায়দার ও জাকিরকে অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেওয়া হয়। বিষয়টি দুই বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের বৈঠক পর্যন্ত গড়ায়।
২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াহিদা খানম ও তাঁর বাবার ওপর হামলার ঘটনাতেও শুরুতে র্যাব ও পুলিশের বক্তব্যে পার্থক্য দেখা যায়। র্যাব আসাদুল ইসলাম, নবীরুল ইসলাম ও সান্টু কুমার দাসকে গ্রেপ্তার করে। প্রাথমিকভাবে র্যাব জানায়, চুরির উদ্দেশ্যে ওই হামলা হয়েছে।
পরে পুলিশ ইউএনও কার্যালয়ের সাবেক মালি রবিউল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে। রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি তখন জানান, "রবিউল হামলায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।" পরবর্তী তদন্তে রবিউলকে একমাত্র আসামি করে অভিযোগপত্র দেওয়া হয় এবং ২০২১ সালে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।
২০১৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ কে এম শফিউল ইসলাম হত্যার ঘটনাতেও– র্যাব ও পুলিশের বক্তব্যে বড় পার্থক্য দেখা যায়।
র্যাব ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে দাবি করেছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত এক নারীর সঙ্গে 'অসৌজন্যমূলক' আচরণকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ড ঘটে এবং আবদুস সামাদ পিন্টু ছিলেন মূল পরিকল্পনাকারী।
অন্যদিকে পুলিশ তখন হত্যাকাণ্ডে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়ার কথা জানায়, এবং আনসার আল ইসলাম বাংলাদেশ-২-এর সদস্যসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের কথা বলে। পরদিনই র্যাব ও পুলিশের বক্তব্যের এই পার্থক্য সংবাদে আসে। পরে পুলিশের অবস্থান আবার বদলায় এবং র্যাবের দেওয়া ব্যক্তিগত আক্রোশের তথ্যকে সামনে রেখে তদন্ত এগোনোর কথা জানানো হয়।
ভুল গ্রেপ্তারের দায় কোথায়?
শিক্ষক রনজিলা পারভীনের মৃত্যুর ঘটনায় গ্রেপ্তার রাকিবের স্ত্রী সুমাইয়া ইসলাম টিবিএসকে বলেন, "নির্দোষ হওয়ার পরও তাঁর স্বামীকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে এবং কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এ কারণে তিনি ও তাঁর পরিবার যে হেনস্তা ও ভোগান্তির শিকার হয়েছেন, তার প্রতিকার চান।"
একই ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া পনি গাজীর ভাই রনি গাজী বলেন, তাঁর ভাইয়ের নামে আগের কিছু মামলা রয়েছে। সেগুলো বিচারের আওতায় নেওয়া হলে তাঁদের আপত্তি নেই। তবে রনজিলা পারভীনের ছিনতাই ও মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর ভাই জড়িত না থেকেও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট র্যাব (বর্তমানে এসআরবি) কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান তিনি।
নুর খান টিবিএসকে আরও বলেন, অতীতে এমন ভুল গ্রেপ্তারের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, নির্দোষ ব্যক্তিরা কোনো ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন কি না, কিংবা ভুল তথ্য দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করার জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি হয়েছে কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর প্রায়ই পাওয়া যায় না।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ২৫০ ধারায় মিথ্যা মামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে আদালত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ করতে পারেন। কোনো পুলিশ কর্মকর্তা আমলযোগ্য নয়, এমন মামলায় মিথ্যা প্রতিবেদন দিলে– তাঁর বিরুদ্ধেও এই ধারায় ক্ষতিপূরণের আদেশ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে জানান তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক টিবিএসকে বলেন, একটি বাহিনী যখন কাউকে অপরাধী হিসেবে সামনে আনে, পরে অন্য বাহিনী যখন বলে তিনি জড়িত নন, তখন রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সত্যটি পরিষ্কার করার দায়িত্ব তৈরি হয়।
তাঁর মতে, এমন ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পরিবারের সামাজিক, মানসিক ও আর্থিক ক্ষতির বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। অতীতেও বিভিন্ন ঘটনায় আসামি নিয়ে পুলিশ ও র্যাবের মধ্যে টানাপোড়েন দেখা গেছে।
রনজিলা পারভীনের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আলোচিত কোনো ঘটনার পর দ্রুত ক্রেডিট নেওয়ার চেয়ে প্রমাণ-উপাত্ত নিশ্চিত করে, প্রকৃত অপরাধীকে গ্রেপ্তারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া বেশি জরুরি ছিল বলে মন্তব্য করেন এই শিক্ষক।
