রেডিওথেরাপি মেশিনের তীব্র সংকট, চিকিৎসার জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষায় ক্যান্সার রোগীরা; ভোগান্তি
জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ১৪৯ নম্বর কক্ষের বাইরে বসে ছিল ছয় বছরের শিশু আবু সুফিয়ান। ন্যাড়া মাথা নিচু করে মোবাইল ফোনে কার্টুন দেখছিল সে।
ফরিদপুরের আলফাডাঙা থেকে আসা এই শিশুর জন্য ক্যান্সারের সঙ্গে দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক লড়াইয়ের মাঝে স্ক্রিনের এই আনন্দদায়ক ছবিগুলো ক্ষণিকের স্বস্তি। এরইমধ্যে সে হাড়ের ক্যান্সারের কারণে সাতবার কেমোথেরাপি ও অস্ত্রোপচারের ধকল সামলেছে। রেডিওথেরাপির জন্য দুই মাস অপেক্ষা করার পর তার ৩০টি সেশনের মধ্যে ৫টি সেশন শেষ হয়েছে।
তীব্র মেশিন সংকটের কারণে সুফিয়ানের মতো এরকম হাজারো ক্যান্সার রোগীকে রেডিওথেরাপির জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে। বেসরকারি হাসপাতালের তুলনায় চিকিৎসার খরচ অনেক কম হওয়ায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে এই সমস্যা বেশি দেখা যাচ্ছে।
গত বছরের ডিসেম্বরে ভাঙা পায়ের চিকিৎসা করতে গিয়ে এমআরআই স্ক্যান করা হলে সুফিয়ানের হাঁটুর হাড়ে টিউমার ধরা পড়ে, পরে শণাক্ত হয় হাড়ের ক্যান্সার। সাত দফা কেমোথেরাপির পর সার্জারি করে টিউমার অপসারণ করা হয়। কিন্তু এরপর রেডিওথেরাপির সিরিয়াল পাওয়ার জন্য শুরু হয় নতুন লড়াই।
সুফিয়ানের বাবা আবু তাহের আক্ষেপ করে টিবিএসকে বলেন, 'আরও দুই মাস আগে যদি রেডিওথেরাপিটা পেতাম, তাহলে আরও ভালো হতো। কিন্তু এখানে তো অনেক ভিড়।'
তিনি জানান, প্যাকেজের আওতায় এখন পর্যন্ত ১১ হাজার ৫০০ টাকা জমা দিয়েছেন।
'সরকারি হাসপাতালে খরচ অনেক কম। মেশিন আরও বেশি থাকলে আমাদের মতো সাধারণ রোগীরা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হতো।'
সুফিয়ানের মতো আরও হাজারো রোগী সরকারি হাসপাতালগুলোতে মেশিনের তীব্র সংকটের কারণে রেডিওথেরাপি পেতে হিমশিম খাচ্ছে।
ক্যান্সার ইনস্টিটিউটে সকাল ৮টা থেকেই লিনাক-২ কক্ষের বাইরে ভিড় করতে শুরু করে রোগীরা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, প্রতিদিন নতুন ২০০ থেকে ৩০০ রোগী রেডিওথেরাপির জন্য এখানে আসে। বর্তমানে সাড়ে ৬ হাজার থেকে ৭ হাজার রোগী রেডিওথেরাপির অপেক্ষায় আছে। তাদের অনেকেরই থেরাপি পেতে এক-দেড় বছরের বেশি সময় লাগতে পারে।
জরায়ুমুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত সুনামগঞ্জের গুলজান বেগম এই অপেক্ষার তালিকায় থাকা রোগীদেরই একজন। ২১ সেপ্টেম্বর রেডিওথেরাপির সিরিয়ালের জন্য কাগজপত্র জমা দিলেও তাকে চিকিৎসা শুরুর সেই তারিখ দেওয়া হয়নি। ছয় সপ্তাহ পরে এসে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে তাকে, তখন তারিখ জানানো হবে।
বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৩ থেকে ১৫ লাখ মানুষ ক্যান্সার নিয়ে বেঁচে আছে। প্রতি বছর নতুন করে প্রায় ২ লাখ মানুষের ক্যান্সার শনাক্ত হয়। আর এই রোগে বছরে প্রায় দেড় লাখ মানুষের মৃত্যু হয়।
চাহিদা মেটাতে পারছে না মাত্র দুটি মেশিন
জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক মোস্তফা আজিজ সুমন টিবিএসকে জানান, বর্তমানে হাসপাতালে কার্যকর রয়েছে মাত্র দুটি রেডিওথেরাপি মেশিন, যা রোগীর চাহিদার তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল।
হাসপাতালে আরও তিনটি বাঙ্কার আছে, যেখানে আগে মেশিন বসানো ছিল; কিন্তু সেগুলোর সবই এখন বিকল।
তিনি বলেন, 'যদি সাত থেকে দশটি মেশিন চালু থাকত, তাহলে এখন যে রোগীদের এক থেকে দেড় বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে, সেটা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা যেত।'
প্রতিদিন ২০০-র বেশি নতুন রোগী আসে; কিন্তু যাদের আগে থেকে তারিখ দেওয়া আছে, তাদেরই আগে চিকিৎসা দিতে হয়।
সুমন বলেন, 'আজ যাদের রেডিওথেরাপির সিদ্ধান্ত দেবেন চিকিৎসকরা, তাদের আমরা কোনো তারিখই দিচ্ছি না। বলছি, ছয় সপ্তাহ পরে এসে যোগাযোগ করুন। কারণ দেওয়ার মতো কোনো স্লট আমাদের নেই।'
তিনি জানান, সকাল ৮টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত চালিয়েও দুটি মেশিনে সর্বোচ্চ ২৫০ রোগীর চিকিৎসা দেওয়া যায়। কিন্তু এই ২৫০ রোগী ছয় সপ্তাহ ধরে চিকিৎসা নেন। কোর্স শেষ হওয়ার পরই নতুন রোগী ঢোকানো সম্ভব।
তিনি আরও জানান, দেশে এখন যত ক্যান্সার রোগী আছে, সেই হিসাবে প্রায় ৩০০ রেডিওথেরাপি মেশিন প্রয়োজন। অথচ সরকারি হাসপাতালগুলোতে মেশিন আছে মাত্র পাঁচটি, আর বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে আছে প্রায় ৩০টি।
ঢাকা মেডিকেল ও বিএমইউ-তে একই সংকট
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেডিওথেরাপি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আলীয়া শাহনাজ বলেন, হাসপাতালে তিনটি বাঙ্কার থাকলেও মেশিন রয়েছে মাত্র একটি। ওই একটি মেশিন দিয়ে সব সব ধরনের রেডিওথেরাপি দেওয়া যায় না।
একই চিত্র বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়েও (বিএমইউ)। বিএমইউতে প্রতিদিন নতুন রোগী আসে ২০০ থেকে ৩০০ জন। কিন্তু একটিমাত্র রেডিওথেরাপি মেশিনে দৈনিক মাত্র ৭০ জন রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া যাচ্ছে। ফলে হাসপাতালটিতে চিকিৎসার জন্য রোগীদের প্রায় ছয় মাসের অপেক্ষমান তালিকায় থাকতে হচ্ছে।
বিএমইউর ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ মো. আকরাম হোসেন টিবিএসকে বলেন, তাদের তিনটি রেডিওথেরাপি বাঙ্কারের মধ্যে দুটিই খালি পড়ে আছে।
এদিকে রোগীদের যদি তিন-চার মাস রেডিওথেরাপির জন্য অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে অনেক ক্ষেত্রে ক্যান্সারের মাত্রা আরও জটিল হয়ে যেতে পারে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে দুটি নতুন লিনিয়ার এক্সিলারেটর (লিনাক) কেনার জন্য অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রথমটি কেনার প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে; এরপর দ্বিতীয়টি কেনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সরকারি হাসপাতালের জন্য নতুন দুটি মেশিনের পরিকল্পনা
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (প্রশাসন) জাহিদ রায়হান টিবিএসকে বলেন, ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের জন্য একটি নতুন লিনিয়ার অ্যাক্সিলারেটর (লিনাক) কেনা সম্পন্ন হয়েছে এবং বাঙ্কারে স্থাপনের কাজ চলছে।
'মেশিনটি কেনা হয়ে গেছে। সব প্রক্রিয়া শেষ। আশা করছি আগামী জানুয়ারির মধ্যে এটি কার্যক্রম শুরু করবে,' বলেন তিনি।
জাহিদ রায়হান আরও জানান, আরও একটি নতুন রেডিওথেরাপি মেশিন কেনার প্রক্রিয়া চলছে। সেটি কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের ক্যান্সার সেবার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেডিওথেরাপি মেশিন দিয়ে সব ধরনের রেডিওথেরাপি দেওয়া সম্ভব হয় না। সেখানে আরেকটি মেশিন প্রয়োজন। বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে।
জাহিদ রায়হান বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেখা গেছে, ফরিদপুর ও খুলনাসহ বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বাক্সবন্দী অবস্থায় পড়ে থেকে লিনাক মেশিন নষ্ট হয়ে গেছে।
'সরকারি যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় নৈতিকতার অভাব বড় সমস্যা। আমরা চেষ্টা করছি এসব সমস্যা সমাধানের,' বলেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, অতীতে সরকারি খাতে ক্যান্সার চিকিৎসার সক্ষমতা যথাযথভাবে গড়ে না ওঠায় রোগীদের বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল বেসরকারি চিকিৎসার ওপর নির্ভরশীল হতে হয়েছে।
সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে রেডিওথেরাপির খরচের পার্থক্য বিশাল। ক্যান্সার ইনস্টিটিউটে চিকিৎসার একটি সম্পূর্ণ কোর্সে খরচ হয় ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা; অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে এই খরচ প্রায় ২ লাখ টাকা।
