ক্যানসার চিকিৎসায় কি সত্যিই নতুন এক অধ্যায় শুরু হচ্ছে?
১৯ আগস্ট ২০২৬। বিশ্বজুড়ে ক্যানসার গবেষকদের জন্য একটি দারুণ সুখবর এল। মডার্না (Moderna) ও মের্ক (Merck) জানিয়েছে, তাদের তৈরি ব্যক্তিকেন্দ্রিক (পার্সোনালাইজড) ক্যানসার ভ্যাকসিন মেলানোমা (ত্বকের এক গুরুতর ক্যানসার) নিয়ে চলমান তৃতীয় পর্যায়ের (ফেজ-৩) ট্রায়ালে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে।
এই খবরটি আমার মনকে একটু বেশিই ছুঁয়ে গেছে। কারণ, ক্যানসার ইমিউনোলজি ও থেরাপিউটিক ক্যানসার ভ্যাকসিন গবেষণার অন্যতম পথিকৃৎ অধ্যাপক কর্নেলিস মেলিফ (Cornelis Melief) ছিলেন আমার পিএইচডি মেন্টর।
আমরা সাধারণত ভ্যাকসিন নিই রোগ হওয়ার আগে, যাতে রোগটি না হতে পারে। কিন্তু এই ভ্যাকসিনটি সম্পূর্ণ অন্য রকম। এটি তৈরি হয় ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার পর, সেই ক্যানসারের চিকিৎসায় সাহায্য করার জন্য। আর সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, এই একই ভ্যাকসিন সবার জন্য কাজ করবে না; বরং এটি প্রতিটি রোগীর জন্য আলাদাভাবে তৈরি করা হয়।
কীভাবে তৈরি হয় এটি? রোগীর টিউমার অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বের করার পর সেটি ল্যাবে নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। তারপর সেই টিউমারের বিশেষ 'আঙুলের ছাপ' বা জেনেটিক বৈশিষ্ট্য খুঁজে বের করে শুধু ওই রোগীর জন্যই তৈরি করা হয় একটি কাস্টমাইজড এমআরএনএ (mRNA) ভ্যাকসিন।
সহজ ভাষায় বললে, ভ্যাকসিনটি শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে (ইমিউন সিস্টেম) ক্যানসার কোষেদের একটি ডিজিটাল আইডি কার্ড তুলে দেয়: 'এই হলো আসল শত্রু। একে চিনে রাখো এবং আক্রমণ করো।'
এর সঙ্গে দেওয়া হয় 'কিট্রুডা' (Keytruda) নামের একটি প্রতিষ্ঠিত ক্যানসার ইমিউনোথেরাপি। এটি মূলত ইমিউন সিস্টেমকে ক্যানসারের বিরুদ্ধে আরও কার্যকরভাবে লড়তে সাহায্য করে।
অর্থাৎ, ভ্যাকসিন শত্রুকে নিখুঁতভাবে চিনিয়ে দেয়, আর কিট্রুডা সেই শত্রুর বিরুদ্ধে ইমিউন সিস্টেমের লড়াই করার সক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।
এই ট্রায়ালে অংশ নিয়েছেন ১,১৩৭ জন উচ্চ-ঝুঁকির মেলানোমা রোগী। তাঁদের ক্যানসার অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু সমস্যা হলো, অস্ত্রোপচারের পরও শরীরে কিছু অদৃশ্য ক্যানসার কোষ লুকিয়ে থাকতে পারে, যা থেকে পরে রোগটি আবার ফিরে আসতে পারে বা শরীরের অন্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
গবেষকেরা দেখতে চেয়েছিলেন: শুধু কিট্রুডা দিলে ফল ভালো হয়, নাকি তার সঙ্গে এই ব্যক্তিকেন্দ্রিক ভ্যাকসিন যোগ করলে আরও ভালো ফল পাওয়া যায়?
প্রাথমিক ফলাফল বলছে, ভ্যাকসিন ও কিট্রুডা একসঙ্গে পাওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে ক্যানসার ফিরে আসা বা শরীরের অন্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি শুধু কিট্রুডা পাওয়া রোগীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
মডার্না ও মের্ক-এর মতে, ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্যানসার ভ্যাকসিন এবং এমআরএনএ-ভিত্তিক ক্যানসার থেরাপির ক্ষেত্রে এমন সফল তৃতীয় পর্যায়ের ফলাফল বিশ্বে এটাই প্রথম।
তবে এখনই আমাদের পুরোপুরি উচ্ছ্বসিত হওয়া যাবে না। পুরো সায়েন্টিফিক ডেটা এখনো প্রকাশিত হয়নি। ঠিক কত শতাংশ বেশি উপকার হয়েছে, তা বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের পরই জানা যাবে। আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই চিকিৎসা রোগীদের শেষ পর্যন্ত আরও বেশি দিন বাঁচাতে পারবে কি না, সেই উত্তর পেতে আরও কিছুটা সময়ের প্রয়োজন।
তাই এটাকে এখনই 'ক্যানসারের স্থায়ী নিরাময়' বলা যাবে না। তবে এটি নিঃসন্দেহে ক্যানসার গবেষণায় এক বিশাল এবং আশাব্যঞ্জক মাইলফলক। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই তথ্যগুলো শুধু ত্বকের একটি নির্দিষ্ট ক্যানসারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, সব ধরনের ক্যানসারের জন্য নয়।
আজ খবরটা পড়ে কয়েক দশক আগে ক্যানসার ইমিউনোলজির দুরবস্থার কথা মনে পড়ে গেল। যখন অধ্যাপক মেলিফ বলতেন, 'মানুষের নিজের ইমিউন সিস্টেমকেই যদি ক্যানসারের বিরুদ্ধে কাজে লাগানো যায়?' তখন বিজ্ঞানের জগতের অনেক ইমিউনোলজিস্টই সেই ধারণাকে খুব একটা গুরুত্ব দিতেন না। তিনি আমাদের বলতেন, সেই সময় এই ধরনের গবেষণার জন্য ফান্ডিং পাওয়া কত কঠিন ছিল! ভালো জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশ করাও ছিল পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ।
আর আজ? ক্যানসার ইমিউনোথেরাপি এখন ক্যানসার চিকিৎসা ও গবেষণার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র।
বিজ্ঞানের জগতেও সময়, ট্রেন্ড আর ফান্ডিংয়ের কত বড় ভূমিকা থাকে, তা কাছ থেকে জানার একটি অভিজ্ঞতা হয়েছিল আমার।
আজকের এই মডার্না-মের্ক ভ্যাকসিন অবশ্যই সরাসরি অধ্যাপক মেলিফের তৈরি নয়, প্রযুক্তিটিও কিছুটা আলাদা। কিন্তু ক্যানসারের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ইমিউন সিস্টেমকে চিনিয়ে দিয়ে তাকে লড়তে শেখানোর যে দীর্ঘ বৈজ্ঞানিক যাত্রা, অধ্যাপক মেলিফের মতো বিজ্ঞানীরাই সেই পথের শক্ত ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিলেন। তাঁর একজন প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে তাই এই খবরটি আমার কাছে শুধুই একটি বৈজ্ঞানিক সংবাদ নয়, ব্যক্তিগত গর্বের বিষয়ও।
আগে আমরা ক্যানসার হলে জিজ্ঞেস করতাম: 'রোগীর কোন ধরনের ক্যানসার হয়েছে?'
এখন বিজ্ঞান আরও এক ধাপ এগিয়ে প্রশ্ন করছে: 'এই নির্দিষ্ট মানুষের ক্যানসারটি আসলে ঠিক কেমন?'
কারণ, একই ধরনের ক্যানসার হলেও দুজন মানুষের ক্যানসার পুরোপুরি এক হয় না। আর এখন সেই ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগিয়েই ক্যানসার ধ্বংসের অস্ত্র তৈরি করা হচ্ছে।
রোগীর নিজের ক্যানসারের তথ্য থেকেই তৈরি হচ্ছে তাকে বাঁচানোর পথ।
ক্যানসারকে পুরোপুরি হারানোর পথ এখনো অনেক দীর্ঘ। তবু ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা, ইমিউনোথেরাপি আর এমআরএনএ প্রযুক্তি যেভাবে আজ এক বিন্দুতে মিলছে, তাতে মনে হয় ক্যানসার চিকিৎসার চিন্তাভাবনায় সত্যিই নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে।
(তথ্যসূত্র: মডার্না ও মের্ক-এর ১৯ আগস্ট ২০২৬-এ প্রকাশিত Phase 3 interim/topline results)
লেখক: ক্যানসার (ইমিউনো) থেরাপি উদ্ভাবনের কাজে জড়িত গবেষক, নেদারল্যান্ডস। সম্প্রতি ফুসফুস ও অগ্ন্যাশয় ক্যানসারের চিকিৎসায় তার অবদান যুগান্তকারী একটি বাইস্পেসিফিক অ্যান্টিবডি থেরাপি (জেনোকিউটিজুম্যাব) যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ (US FDA) অনুমোদন পেয়েছে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: নিবন্ধের বিশ্লেষণটি লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন। অবধারিতভাবে তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর অবস্থান বা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।
