জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় লবণ উৎপাদন ব্যাহত, পাইকারিতে দাম বেড়েছে ৫০ শতাংশ
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত অনিয়মিত আবহাওয়ার কারণে বাংলাদেশের লবণশিল্প ক্রমেই ব্যাহত হচ্ছে। অতিবৃষ্টি, দীর্ঘ সময় ধরে মেঘাচ্ছন্ন আবহাওয়া এবং অতিরিক্ত তাপ দেশের উপকূলীয় লবণ মাঠগুলোতে উৎপাদনকে প্রভাবিত করছে।
শুষ্ক মৌসুমে লবণ চাষ তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বাতাসের অবস্থার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এপ্রিল থেকে মে মাসের তীব্র তাপ কৃষকদের চার থেকে নয় দিনের মধ্যে লবণ সংগ্রহ করতে সহায়তা করে।
২০২৬ অর্থবছরে এর প্রভাব ছিল বিশেষভাবে গুরুতর। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ওই অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে লবণ উৎপাদন ২৮% কম হয়েছে। উৎপাদনের এই ঘাটতির কারণে এক বছরের ব্যবধানে পাইকারি কাঁচা লবণের দাম ৫০% বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) ১ লাখ ৫০ হাজার টন কাঁচা লবণ আমদানির সুপারিশ করেছে।
উৎপাদনে ওঠানামা
বিসিকের ৬৬ বছরের তথ্য অনুযায়ী, একসময় দেশে অভ্যন্তরীণ চাহিদার চেয়ে নিয়মিত বেশি লবণ উৎপাদন হতো।
১৯৭২ অর্থবছরে ৩ লাখ ৮৮ হাজার টন চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছিল ৬ লাখ ৩৭ হাজার টন, যা লক্ষ্যমাত্রার ১৬৪.১৮%। ওই সময় ২০ হাজার ২২৫ জন কৃষক ২৬ হাজার ২৮৮ একর জমিতে লবণ চাষ করে একরপ্রতি ২৪.২৪ টন উৎপাদন করেছিলেন।
লবণ চাষের আওতায় সবচেয়ে বেশি জমি ছিল ২০০৬ অর্থবছরে। ওই বছর ৭০ হাজার ৫০ একর জমিতে ১৫ লাখ ৭৫ হাজার টন লবণ উৎপাদিত হয়, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ লাখ ৭০ হাজার টন।
তবে পরবর্তী সময়ে খাতটি লোকসান এবং চাষযোগ্য জমি কমে যাওয়ার মুখে পড়ে। দেশের প্রধান লবণ উৎপাদনকারী অঞ্চল কক্সবাজারের মহেশখালী ও আশপাশের এলাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্র, গভীর সমুদ্রবন্দর ও জ্বালানি স্থাপনাসহ বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প গড়ে ওঠে।
শুধু মহেশখালীতেই অবকাঠামো উন্নয়নের কারণে প্রায় ৪ হাজার একর লবণ উৎপাদনকারী জমি হারিয়ে গেছে। লবণচাষির সংখ্যা ২০০৬ অর্থবছরের ৪৪ হাজার ৫৭৪ জন থেকে ২০২১ অর্থবছরে ২৭ হাজার ৬৯৭ জনে নেমে আসে।
২০২৪ অর্থবছরে খাতটি বড় ধরনের পুনরুদ্ধার করে। ওই বছর ৬৮ হাজার ৫০৫ একর জমিতে ২৫ লাখ ২৮ হাজার টন চাহিদার বিপরীতে ২৪ লাখ ৩৮ হাজার টন লবণ উৎপাদন হয়। উৎপাদনশীলতা একরপ্রতি ৩৫.৫৯ টনে পৌঁছায়, যা ৬২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ উৎপাদন।
তবে এরপর থেকে উৎপাদন কমেছে।
২০২৫ অর্থবছরে ৬৯ হাজার ১৯৮ একর জমিতে কৃষকেরা ২২ লাখ ৫১ হাজার টন লবণ উৎপাদন করেন। এ সময় উৎপাদনশীলতা কমে একরপ্রতি ৩২.৫৪ টনে দাঁড়ায়।
২০২৬ অর্থবছরে ৬৭ হাজার ৭৫৭ একর জমিতে উৎপাদন আরও কমে ১৯ লাখ ৪৫ হাজার টনে দাঁড়ায়। উৎপাদনশীলতা কমে একরপ্রতি ২৮.৭০ টনে নেমে আসে। আর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের হার দাঁড়ায় মাত্র ৭১.৬৩%।
বিসিকের লবণশিল্প উন্নয়ন কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক জাফর ইকবাল ভূঁইয়া বলেন, 'বিসিক চাষযোগ্য জমি সম্প্রসারণ এবং লবণশিল্পের উন্নয়নে কাজ করছে।'
তিনি বলেন, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বাঁশখালীর ১২টি লবণকেন্দ্রের মাধ্যমে বিসিক কৃষকদের প্রশিক্ষণ, ঋণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং অন্যান্য সহযোগিতা দিয়ে থাকে।
বিসিকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ অর্থবছরের লবণ উৎপাদন মৌসুম ২০৩ দিন স্থায়ী হয়। মৌসুমটি শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর এবং শেষ হয় ২০২৬ সালের ২৫ মে।
প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে কৃষকেরা মাঠে কাজ করতে পারেননি।
২৬ এপ্রিলের পর পরিস্থিতি বিশেষভাবে ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। ওই সময় টানা ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের লবণ মাঠগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ সময়, কারণ অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে সাধারণত চার থেকে নয় দিনের মধ্যে লবণ সংগ্রহ করা যায়। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সময় লাগে প্রায় ১৪ দিন।
আগের মৌসুমগুলোতেও আবহাওয়াজনিত কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ২০২২ অর্থবছরে ২০১ দিনের মধ্যে ১৪ দিন, ২০২৩ অর্থবছরে ২০২ দিনের মধ্যে ১৯ দিন, ২০২৪ অর্থবছরে ১৮৪ দিনের মধ্যে ১৯ দিন এবং ২০২৫ অর্থবছরে ১৮৭ দিনের মধ্যে ১৬ দিন উৎপাদন বন্ধ ছিল।
মহেশখালীর লবণচাষি সৈয়দ মোস্তফা সাদিক রিজভী টিবিএসকে বলেন, সর্বশেষ মৌসুমে তিনি দুই একর জমি থেকে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মণ লবণ উৎপাদন করেছেন।
তিনি বলেন, 'তাপমাত্রা অনুকূলে থাকা সত্ত্বেও বৃষ্টির কারণে আমাদের ১৫-২০ দিন আগেই লবণ সংগ্রহ করতে হয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, 'আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ওই সময়ে আমরা প্রতি কানি জমিতে ১০০-১৫০ মণ লবণ উৎপাদন করতে পারতাম।'
কাঁচা লবণের দাম বেড়েছে ৫০%
উৎপাদন ঘাটতির কারণে কাঁচা লবণের দাম বেড়েছে।
বিসিকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি মণ বা ৪০ কেজি কাঁচা লবণ ৩৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক বছর আগে দাম ছিল ২৫৩ টাকা।
অর্থাৎ প্রতি মণে দাম ১২৭ টাকা বা ৫০% বেড়েছে।
বাংলাদেশ সল্ট মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নুরুল কবির বলেন, 'প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে এ বছর উৎপাদন কমেছে, ফলে সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে।'
তিনি এই সংবাদপত্রকে বলেন, 'ঘাটতি ও চাহিদার কারণে মৌসুমের শেষ দিকে লবণের দাম বেড়েছে। সরকার লবণ আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। আমরা আশা করছি, পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকবে।'
বিসিকের হিসাবে, বছরে লবণের চাহিদা ২২-২৫ লাখ টন। কাঁচা লবণ প্রক্রিয়াজাত ও আয়োডিনযুক্ত করার সময় ১৭%-২০% পর্যন্ত লবণ নষ্ট হয়।
আয়োডিনযুক্ত ভোজ্য লবণের চাহিদা বছরে ৮ লাখ টনের বেশি। আর শিল্প খাতে চাহিদা প্রায় ১০ লাখ টন।
শিল্প খাতে ব্যবহারের জন্য বছরে প্রায় ৫ লাখ টন সালফেট ও শুকনো সোডিয়াম সালফেট আমদানি করা হয়। তৈরি পোশাক, বস্ত্র, ডিটারজেন্ট ও কাচ উৎপাদনসহ বিভিন্ন শিল্পে এগুলো ব্যবহার করা হয়।
বাংলাদেশে প্রায় ১২০ ধরনের পণ্য উৎপাদনে বিভিন্ন ধরনের লবণ প্রয়োজন হয়। দেশের চামড়াশিল্পেও স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত লবণ ব্যবহার করা হয়।
ঘাটতি ঠেকাতে আমদানির পরিকল্পনা
দেশে মাসে প্রায় ২ লাখ টন লবণ ব্যবহৃত হয়।
১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুরোনো ও নতুন মজুতসহ মোট কাঁচা লবণের মজুত ছিল ৫ লাখ ২৬ হাজার টন। আর মিলগুলোতে ছিল প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টন।
বিসিক কর্মকর্তারা বলেন, নতুন উৎপাদন মৌসুম পুরোপুরি শুরু না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান মজুত দিয়ে চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে না।
সরবরাহ বজায় রাখতে প্রয়োজন অনুযায়ী বাংলাদেশ বহু বছর ধরে কাঁচা লবণ আমদানি করে আসছে। শিল্প খাতের জন্য আমদানি বাদ দিলে, সর্বশেষ ২০২৪ অর্থবছরে দেশে ১ লাখ ৫০ হাজার টন কাঁচা লবণ আমদানি করা হয়েছিল।
বিসিক কর্মকর্তারা বলেন, লবণের দাম বাড়তে শুরু করলে এবং মজুত নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিলে সাধারণত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের দিকে আমদানির ঘোষণা দেওয়া হয়। এ ধরনের ঘোষণা মিল মালিকদের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানো থেকেও নিরুৎসাহিত করে।
চলতি মাসে একটি বৈঠকের পর বিসিকের চাহিদা ও মজুতের পূর্বাভাসের ভিত্তিতে শিল্প মন্ত্রণালয় ১ লাখ ৫০ হাজার টন লবণ আমদানির সুপারিশ করেছে। প্রস্তাবটি এখন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
বিসিকের লবণ সেলের প্রধান ও করপোরেশনের মহাব্যবস্থাপক সরওয়ার আলম বলেন, নভেম্বরে লবণ চাষ শুরু হলেও মৌসুমের শুরুতে উৎপাদন এখনও খুবই কম।
তিনি টিবিএসকে বলেন, 'আমাদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বিদ্যমান মজুত নভেম্বর পর্যন্ত চলবে। তবে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকেই ঘাটতি দেখা দেবে।'
তিনি বলেন, 'মৌসুমের শুরুতে চাহিদা বেশি থাকলে কৃষকেরা মাঠ থেকে অপরিপক্ব লবণ সংগ্রহ করতে পারেন। এতে মান কমে যায় এবং প্রক্রিয়াজাতকরণে নষ্টের পরিমাণ বাড়ে।'
তিনি আরও বলেন, 'আমদানির সুপারিশ করার সময় এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।'
