সোনাদিয়ায় ১০ হাজার একর প্যারাবন উজাড় করে লবণের মাঠ-চিংড়িঘের, দখলে রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী
কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার পশ্চিমে সোনাদিয়া দ্বীপ। লাল কাঁকড়া, কাছিম ও বিরল প্রজাতির পাখির আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত এই দ্বীপকে 'প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা' (ইসিএ) ঘোষণা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর।
আইন অনুযায়ী, সোনাদিয়ার মাটি, পানি ও প্রাকৃতিক পরিবেশে কোনো ধরনের পরিবর্তন বা বাণিজ্যিক রূপান্তর নিষিদ্ধ। তবে গত কয়েক বছরে এই দ্বীপে ১০ হাজার একর প্যারাবন (ম্যানগ্রোভ বন) উজাড় করা হয়েছে।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার ইকোট্যুরিজম পার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে এক হাজার এক টাকার বিনিময়ে সোনাদিয়ার ৯ হাজার ৪৬৬ দশমিক ৯৩ একর বনভূমি বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) কাছে বরাদ্দ দিয়েছিল। এর বেশিরভাগ অংশই ছিল প্যারাবন।
২০১৭ সালের মে মাসে বেজা উপকূলীয় বন বিভাগের কাছ থেকে জমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করে। কিন্তু এরপর সেখানে ইকোট্যুরিজম প্রকল্পের দৃশ্যমান কোনো কাজ হয়নি। বর্তমানে সেই প্যারাবনেরও আর অস্তিত্ব নেই। ১০ হাজার একর প্যারাবনের বাইন, কেওড়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ উধাও হয়ে গেছে। নীরব সাক্ষী কেবল প্যারাবনের শুকনো শেকড় আর ডাল-পালা।
সম্প্রতি দ্বীপটিতে সরেজমিনে এ চিত্র দেখা গেছে। মহেশখালীর ঘটিভাঙ্গা ঘাট থেকে পূর্ব ও পশ্চিমমুখী খাল ধরে সোনাদিয়ার দিকে এগোলে দুই পাশে চোখে পড়ে মাটির তৈরি দীর্ঘ বাঁধ। সেই বাঁধের ওপারেই হাজার হাজার একর প্যারাবন ধ্বংস করে গড়ে তোলা হয়েছে অন্তত ১০০টি ঘের। এক সময় যেখানে কেওড়া, বাইন ও গর্জনের মতো গাছ ছিল, সেখানে এখন সারি সারি ঘের।
স্থানীয়রা জানান, শুষ্ক মৌসুমে এসব জমিতে লবণ উৎপাদন করা হয়। বর্ষা এলে চিংড়ির ঘের করা হয়। জমি দখলের জন্য কোথাও কোথাও এখনো বাইন ও কেওড়া গাছ কাটা হচ্ছে। কিছু এলাকায় বনভূমি পরিষ্কার করতে গাছপালা পুড়িয়ে দেওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।
ঘটিভাঙ্গা এলাকায় প্যারাবনে গত ৪ জুন আগুনের খবর পাওয়া যায়। স্থানীয়দের দাবি, দখলদাররা কেরোসিন ঢেলে পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগিয়েছে, যাতে দ্রুত বন পরিষ্কার করে জমি দখল করা যায়। তাদের অভিযোগ, প্যারাবন উজারকারীরা সশস্ত্র পাহারা বসিয়ে কাজ চালাচ্ছে। সাধারণ মানুষ সেখানে যেতে পারছে না।
কক্সবাজারের পরিবেশবাদী সংগঠন ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির (ইয়েস) চেয়াম্যান অ্যাডভোকেট মুজিবুল হক জানান, প্যারাবন শুধু গাছের সমষ্টি নয়; এটি উপকূল রক্ষার প্রাকৃতিক দেয়াল। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও সামুদ্রিক ঢেউয়ের আঘাত থেকে উপকূলীয় জনপদকে রক্ষা করতে প্যারাবনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বন ধ্বংস হলে উপকূল আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তিনি বলেন, কেওড়া ও বাইন গাছ উপকূলীয় মাটি ধরে রাখতে সাহায্য করে। এগুলো কেটে ফেললে ভূমিক্ষয় বাড়ে, খাল ও নদীতে পলি জমার ধরন বদলে যায় এবং জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, কাঁকড়া, পাখি ও জলজ প্রাণীর আবাসস্থলও ধ্বংস হয়ে যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঝুঁকিপূর্ণ বাংলাদেশের উপকূলে এমন বন উজাড় দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, বন কেটে লবণের মাঠ বা চিংড়ির ঘের তৈরির সঙ্গে প্রভাবশালী বিভিন্ন মহলের লোকজন জড়িত। রাজনৈতিক পরিচয়ে ভিন্নতা থাকলেও এ বিষয়ে তাদের মধ্যে এক ধরনের সমঝোতা রয়েছে।
এ ঘটনায় বন বিভাগের পক্ষ থেকে মামলাও করা হয়েছে ইতোমধ্যে। মামলার এজাহারে দেখা গেছে, স্থানীয় জামায়াত নেতা ছৈয়দুল হক সিকদারকে এই মামলার ৮ নম্বর আসামি করা হয়েছে। তিনি মামলার ৭ নম্বর আসামি মহেশখালী উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল করিমের ভগ্নিপতি।
চিংড়ির ঘেরের কর্মীরা জানান, এখানে উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আজিজুল করিম জয়ের দুটি ঘের রয়েছে। তিনি মামলার আসামি সাজেদুল করিমের ছোট ভাই। তবে আজিজুল করিম জয়ের সঙ্গে ফোনে কথা হলে তিনি সেখানে তার কোনো ঘের থাকার কথা অস্বীকার করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাজেদুল করিমের চাচাতো ভাই জাহাঙ্গীরের একাধিক ঘের রয়েছে সেখানে। তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মী ছিলেন। সাজেদুলের আরেক চাচাতো ভাই রহমতুল্লাহর আলাদা ঘের রয়েছে সেখানে।
মামলার ৬ নম্বর আসামি মো. শমসের আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি আশেক উল্লাহ রফিকের আপন ফুফাতো ভাই। শমসেরের ঘেরের পাশেই বড় আরেকটি ঘের রয়েছে।
মামলার ১১ নম্বর আসামি কাইছার সিকদার বর্তমান উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু বক্কর ছিদ্দিক এবং সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা মকছুদ মিয়ার ছোট ভাই। ৫ ও ৯ নম্বর আসামি মোস্তফা আনোয়ার ও মহসিন আনোয়ার উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মরহুম আনোয়ার পাশা চৌধুরীর ছেলে। ১৩ নম্বর আসামি শাহেদ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদিনের ছোট ভাই।
স্থানীয় কয়েকজন জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে অভিযোগ- তারা প্রভাব খাটিয়ে প্যারাবন কেটে লবণের মাঠ তৈরি করছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন যুবলীগের সহ-সাধারণ সম্পাদক ও কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ কামাল, সদস্য ছিদ্দিক রিমন, জয়নাল ও একরামসহ অনেকেই।
পরিবেশকর্মী রুহুল আমিন বলেন, এই মামলায় যারা আছেন বা যারা প্যারাবন কাটছেন, তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন দলের লোকেরা জড়িত। এই মামলায় আরো অনেক রাঘববোয়াল বাদ পড়েছে। আর যাদের নামে মামলা হয়েছে, তাদের অনেকেই ইতোমধ্যে হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
বন বিভাগের মহেশখারী গোরকঘাটা রেঞ্জ কর্মকর্তা মনোয়ার হোসেন বলেন,আসলে এগুলো বেজার হাতে থাকাকালীনই বেশিরভাগ প্যারাবন কাটা হয়। বন বিভাগকে ৫ হাজার একর জায়গা দিলেও এখনও আমাদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। ঘের কেটে দেওয়ার পক্ষে এখনো স্পষ্ট কোনো ম্যাসেজ নেই।
তিনি আরও বলেন, এই ঘেরগুলো কেটে দেওয়ার পরও একটা বছর অপেক্ষা করতে হবে। কারণ, বাঁধ দেওয়ার কারণে এখানে যে পরিমাণ পলি জমছে, প্রপারলি সমুদ্রের জোয়ার-ভাটা না হলে যতই বনায়ন করা হোক না কেন, তা কার্যকর হবে না।
মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরান মাহমুদ ডালিম জানান, আগেও অভিযান চালানো হয়েছে, নতুন ঘটনাগুলো খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, সোনাদিয়ার প্যারাবন নিধনের ঘটনায় এ পর্যন্ত ৫৩ দখলদারের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হবে। তবে এখনো কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি।
