টানা বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলের লবণ মাঠ, ঈদের আগে সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ
আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশের লবণের বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। টানা ভারী বর্ষণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং কোরবানিকে কেন্দ্র করে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় লবণের দাম বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে পশুর চামড়া সংরক্ষণ খাতে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আবহাওয়ার পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ঈদের সময় সরবরাহ চেইনে আরও চাপ তৈরি হতে পারে।
চলতি মৌসুমে দেশে লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ২৭ লাখ ১৫ হাজার টন। তবে ১২ মে পর্যন্ত উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১৭ লাখ ৯২ হাজার টন। সংশ্লিষ্টদের মতে, ২৬ এপ্রিলের পর থেকে টানা ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের লবণ মাঠ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উৎপাদন কমে গেছে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের ৬৯ হাজার একরের বেশি জমিতে ৪১ হাজারেরও বেশি চাষী লবণ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। উৎপাদন মৌসুম ১৫ মে পর্যন্ত চললেও আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।
লবণের বাজার অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে শ্রমিকদের জীবনেও। চট্টগ্রামের লবণ শ্রমিক মো. আব্দুর রহমান বলেন, "আগে ঈদের সময় প্রচুর লবণ আসত, কাজও বেশি থাকত। এখন লবণ কম আসায় আয়-রোজগারও কমে গেছে।"
জিলানি সল্ট ইন্ডাস্ট্রির স্বত্বাধিকারী মো. সুমন বলেন, "ভারী বর্ষণে অনেক কৃষকের লবণের মাঠ নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে পর্যাপ্ত লবণ বাজারে আসছে না। এর সঙ্গে ঈদকে কেন্দ্র করে বাড়তি চাহিদা যোগ হওয়ায় দামও বেড়েছে।"
কোরবানির সময় পশুর চামড়া সংরক্ষণে লবণের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। কাঁচা চামড়ার আর্দ্রতা কমিয়ে ট্যানারিতে পৌঁছানো পর্যন্ত সংরক্ষণযোগ্য রাখতে লবণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গত বছরের কোরবানিতে দেশে ৯১ লাখের বেশি পশু কোরবানি হয়েছিল। এর মধ্যে গরু-মহিষ ছিল ৪৭ লাখের বেশি। ফলে বিপুল পরিমাণ চামড়া সংরক্ষণে প্রয়োজন হয়েছিল বড় পরিমাণ লবণের।
এবার আসন্ন কোরবানিতে দেশে ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি পশুর চাহিদা রয়েছে বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। ফলে চামড়া সংরক্ষণে লবণের চাহিদাও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) বলছে, চাহিদা অনুযায়ী দেশে লবণের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। বিসিক সল্ট সেলের প্রধান সারোয়ার আলম জানান, এ বছর চামড়া সংরক্ষণের জন্য লবণের চাহিদা রয়েছে ৮৭ হাজার ১৪২ মেট্রিক টন। বর্তমানে দেশে প্রায় দেড় লাখ মেট্রিক টনের বেশি লবণ মজুদ রয়েছে।
চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের উপকূলীয় লবণ মাঠ থেকে সংগ্রহ করা কাঁচা লবণ প্রথমে কারখানায় আনা হয়। এরপর শুকানো, পরিষ্কার, ক্রাশিং ও রিফাইনিংসহ বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে বাজারজাত করা হয়। এসব লবণের বড় একটি অংশ ব্যবহার হয় পশুর চামড়া সংরক্ষণে।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম চামড়া আড়তদার সমিতির নেতারা জানান, একসময় এ খাতে ২০০ থেকে ২৫০ জন আড়তদার সক্রিয় থাকলেও এখন সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৩০ থেকে ৩৫ জনে। লোকসান ও মূলধন সংকটে অনেকে ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম ও আশপাশের এলাকায় এবার প্রায় ৪ লাখ পশুর চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে আড়তদাররা বলছেন, লবণের দাম বৃদ্ধি, শ্রমিক ব্যয় এবং ট্যানারি মালিকদের বকেয়া পাওনার কারণে তারা পুঁজি সংকটে রয়েছেন। বর্তমানে একটি গরুর চামড়া সংরক্ষণে গড়ে প্রায় ৫০০ টাকা খরচ হচ্ছে।
চামড়া নষ্ট হওয়া ঠেকাতে সরকারও প্রস্তুতি নিয়েছে। গত বছরের মতো এবারও বিনামূল্যে লবণ সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিসিক দেশের ২৭০টি নিবন্ধিত মিলের মাধ্যমে ১০ হাজার ৮৯২টি মাদরাসা, এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে ৯ হাজার ৮১৯ মেট্রিক টন লবণ বিনামূল্যে বিতরণ করবে। যার ক্রয়মূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা।
বিসিক চট্টগ্রাম জেলার ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার এস এম আলমগীর কাদেরী জানান, উৎপাদন, সরবরাহ ও মজুদের পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার শিগগিরই লবণের নির্ধারিত দাম ঠিক করবে। একই সঙ্গে বাজার তদারকি ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে কাজ করবে বিসিক।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোরবানির মৌসুমে লবণ শুধু একটি সাধারণ পণ্য নয়; এটি দেশের চামড়া শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তাই লবণের সহজলভ্যতা ও স্থিতিশীল দাম নিশ্চিত করা না গেলে চামড়া সংরক্ষণ ব্যবস্থাও চাপের মুখে পড়তে পারে।
