ঈদের আগে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে অনলাইন পশুর হাট
ঈদুল আজহা সামনে রেখে কোরবানির পশু কিনতে ঢাকার ক্রেতারা ক্রমেই অনলাইন প্ল্যাটফর্মের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে প্রচলিত পশুর হাটে গিয়ে কেনাকাটার পরিবর্তে এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পশু দেখা, আগাম বুকিং ও হোম ডেলিভারির প্রবণতা বাড়ছে।
রাজধানীর মিরপুর-১০ এলাকার বাসিন্দা জিয়াউল হক একসময় হাট থেকে গরু কিনতেন। তবে গত ৭-৮ বছর ধরে তিনি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে গরু কিনছেন। ময়মনসিংহের ভালুকার একটি বিশ্বস্ত খামার থেকে প্রতি বছর গরু কেনেন তিনি। এবারও আগেভাগেই গরু বুকিং দিয়ে রেখেছেন।
তিনি টিবিএসকে বলেন, "আমি কিংবা আমার ভাইয়েরা কেউ গরু চিনে না। হাট থেকে গরু কিনলে ঝুঁকি থাকে। বাসায় আনার পর মারা যাওয়ার ঘটনাও প্রায়ই দেখা যায়। তাই বিশ্বস্ত জায়গা থেকে কেনার চেষ্টা করি। হাটে গেলে দরদাম করতে হয়, আবার বাসায় এনে লালন-পালনের ঝামেলাও আছে। এজন্য এখন ফেসবুকে খামারের পেজে গরুর ছবি দেখে অর্ডার করি। ঈদের আগের দিন সেটি বাসায় পৌঁছে দেয়।"
শহরের ক্রেতারা ঝুঁকছেন অনলাইনে
বিভিন্ন খামারি ও বিক্রয় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, করোনাভাইরাস মহামারির পর থেকে অনলাইনে কোরবানির পশু কেনাবেচা বেড়েছে। মূলত ঢাকার বাসিন্দারা হাটে যাওয়া এবং পশু লালন-পালনের ঝামেলা এড়াতে অনলাইনের প্রতি আগ্রহী হচ্ছেন।
অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ওয়েবসাইট, বিক্রয়কেন্দ্র বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পশু পছন্দ করে বুকিং দিচ্ছেন ক্রেতারা। পরে কোরবানির ঈদের দিন বা আগের দিন বিক্রেতারা সেগুলো ডেলিভারি দিচ্ছেন। আবার কিছু প্ল্যাটফর্ম মাংস প্রসেস করে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার সেবাও দিচ্ছে।
এ বছর দেশি গরুর লাইভ ওয়েট প্রতি কেজির দাম অনলাইনে ৫২০ থেকে ৬১০ টাকা চাওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে শাহীওয়াল বা ফ্রিজিয়ান গরুর লাইভ ওয়েট প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩৮০ থেকে ৪৫০ টাকায়। যদিও গত বছরের তুলনায় এবার প্রতি কেজিতে ৪০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে।
বাড়ছে অনলাইন কোরবানির সেবা
দেশে কোরবানির জন্য পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সেবা চালু করা প্রথম প্রতিষ্ঠান বেঙ্গল মিট। ২০১৪ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি পশু কেনা থেকে শুরু করে মাংস প্রসেসিং ও হোম ডেলিভারি সেবা দিয়ে আসছে। এবার ২৮ এপ্রিল থেকে তাদের অনলাইন হাট শুরু হয়েছে।
বেঙ্গল মিটের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এবার তাদের কাছে কোরবানির জন্য প্রায় ৫০০ গরু ও ২০০ ছাগল প্রস্তুত রয়েছে। এরই মধ্যে প্রায় ৩৫০টি গরু এবং সব ছাগল বিক্রি হয়ে গেছে।
বেঙ্গল মিটের মার্কেটিং প্রধান শেখ ইমরান আজিজ টিবিএসকে বলেন, "যারা আমাদের কাছ থেকে গরু বা খাসি নিচ্ছেন, তাদের বেশিরভাগই নিয়মিত গ্রাহক। তবে নতুন অনেক গ্রাহকও যুক্ত হচ্ছেন। আমাদের বেশিরভাগ গ্রাহক ঢাকাকেন্দ্রিক, এছাড়া চট্টগ্রাম ও সিলেটেরও কিছু গ্রাহক রয়েছেন।"
তিনি বলেন, "আমাদের কাছ থেকে শুধু গরু বা খাসি কেনার সুযোগ রয়েছে। আবার ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধির তত্ত্বাবধানে পূর্ণ শরিয়াহ মেনে কোরবানি দিয়ে মাংস গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে গরুর একক কিংবা ভাগে কোরবানির যেকোনো অপশন বেছে নেওয়া যায়।"
প্রতিনিয়ত অনলাইনে কোরবানির পশু কেনাবেচা বাড়ছে জানিয়ে শেখ ইমরান আজিজ বলেন, "বাংলাদেশে অনলাইন বাজার এখনো তুলনামূলক ছোট। তারপরও গ্রাহকের চাহিদা প্রতিদিন বাড়ছে। সেই অনুযায়ী আমরা সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছি। গত বছর আমাদের ৪০০ গরু ও ২০০ খাসি ছিল, এবার তা আরও বেড়েছে।"
অনলাইন প্ল্যাটফর্ম gorurhaat.com-এ পশু বিক্রি করছেন পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার চৌবাড়িয়া হারোপাড়ার খামারি সাগর আহমেদ। ২০১৭ সাল থেকে তিনি অনলাইনে পশু বিক্রি করছেন।
এ বছর তার খামারে কোরবানির উপযোগী ৯০টি দেশি ষাঁড় ও ৮টি বিদেশি ষাঁড় ছিল। এর মধ্যে সব দেশি ষাঁড় বিক্রি হয়ে গেছে। গত বছর তিনি প্রায় ৫০টি পশু বিক্রি করতে পেরেছিলেন।
সাগর আহমেদ টিবিএসকে বলেন, "আমি খুব বেশি প্রচার করিনি। যারা আগে আমাদের কাছ থেকে ভালো গরু পেয়েছেন, তারাই নিজেদের পরিচিতদের কাছে প্রচার করেছেন। করোনাকাল থেকে অনলাইনে চাহিদা বাড়ছে। ঢাকা থেকে অনেক অর্ডার আসে। আমরা ঈদের আগের দিন গ্রাহকের কাছে গরু পৌঁছে দিই।"
খাদ্য ও শ্রমিক ব্যয় বৃদ্ধির কারণে খামারিরা সংকটে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন সাগর আহমেদ। তিনি বলেন, "গবাদিপশুর খাদ্যের দাম প্রতি মণে প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ বেড়েছে। শ্রমিক খরচও বাড়ছে। কিন্তু সে অনুযায়ী গরুর দাম বাড়েনি। ফলে যারা সৎভাবে ব্যবসা করতে চান, তারা টিকে থাকতে পারছেন না।"
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর দেশে কোরবানির পশুর সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছে ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি। এর বিপরীতে প্রস্তুত রয়েছে ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি পশু।
এর মধ্যে গরু-মহিষ রয়েছে ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি, ছাগল-ভেড়া ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি এবং অন্যান্য প্রজাতির পশু ৫ হাজার ৬৫৫টি।
তবে খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনলাইনে কোরবানির পশু কেনাবেচার পরিমাণ এখনো মোট বাজারের তুলনায় খুবই কম। তবে যথাযথ নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে এ খাতে মানুষের আগ্রহ আরও বাড়বে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নজরদারি জোরদারের দাবি
খামারিরা এ খাতে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন। বিশেষ করে হরমোন প্রয়োগ করে গরু মোটাতাজাকরণ এবং ওজন কারসাজির মতো অনিয়ম বন্ধে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কঠোর নজরদারি দাবি করেছেন তারা, যাতে ক্রেতা ও প্রকৃত খামারিরা সুরক্ষা পান।
এদিকে Bikroy.com প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অনেক খামারি ও ব্যবসায়ী গরু বিক্রি করছেন। এর মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠান অ্যাসিউরেন্স ফার্মস। প্রতিষ্ঠানটির খামার ময়মনসিংহের ভালুকায় হলেও ঢাকায় তারা ডেইরি পণ্য বিক্রি করে থাকে।
প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র এক্সিকিউটিভ (অপারেশন) রাকিবুল ইসলাম টিবিএসকে জানান, ২০২৪ সাল থেকে তারা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পশু বিক্রি করছেন। এ বছর তাদের স্টকে ২৫০টি গরু রয়েছে। এর মধ্যে ১০০টির বেশি ইতোমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, "আমরা অনলাইনে বুকিং নিয়ে ঈদ পর্যন্ত গরু লালন-পালন করি। অনেকেই আগে কিনতে চান না, কারণ তখন লালন-পালনের ঝামেলা থাকে। আমরা ঈদের দিন কিংবা আগের দিন ঢাকায় বিনামূল্যে ডেলিভারি দিই। হাটে যাওয়ার ঝামেলাও নেই। গুলশান, বনানী ও বারিধারা এলাকায় বেশি সাড়া পাওয়া যায়।"
বর্তমানে ফার্মটিতে ৩০০ কেজির কম ওজনের দেশি গরু প্রতি কেজি লাইভ ওয়েটে ৫২০ টাকা, ৩০০-৪০০ কেজির গরু ৫৫০ টাকা এবং এর চেয়ে বড় গরু ৫৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
রাকিবুল ইসলাম বলেন, "গতবার ১০০টি গরুর মধ্যে ৮০টি বিক্রি হয়েছিল। তার আগেরবার ৬০টির মধ্যে ৫৩টি বিক্রি করতে পেরেছিলাম। মানুষের আগ্রহ আগের তুলনায় বাড়ছে।"
সার্বিক বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. শাহজামান খান টিবিএসকে বলেন, "হরমোন দিয়ে গরু মোটাতাজা করা যায়—এ ধারণা বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল। হরমোন প্রয়োগ করলে কিডনি বিকল হয়ে গরু মারা যাবে।"
তিনি বলেন, "আমরা সার্বক্ষণিক বাজার মনিটরিং করছি। ২৩ তারিখ থেকে হাট বসলে সেখানে আমাদের মেডিকেল টিম থাকবে। এছাড়া যেকোনো সময় মাঠপর্যায়ে আমাদের কর্মকর্তারা কাজ করছেন।"
