জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি: পরিবহন খরচ বাড়ায় ঊর্ধ্বমুখী নিত্যপণ্যের বাজার, বেড়েছে সবজি-মাছ-ডিমের দাম
হাইলাইটস:
● এক সপ্তাহে সবজির দাম কেজিতে বেড়েছে ১০-৩০ টাকা
● ডজনপ্রতি ফার্মের মুরগীর ডিমের দাম এখন ১৬০-১৭০ টাকা
● পরিবহন খরচ বাড়ায় কমেছে মুরগি সরবরাহ
● পাইকারিতে মাছের দাম কেজিতে বেড়েছে ৫-১০ টাকা
● বাজারে ময়দার দাম বেড়েছে আরও
● লিটারে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে প্যাকেটজাত দুধের দাম
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় রাজধানীতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। সবজি, ডিম, মাছ ও মুরগিসহ প্রায় প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
এক সপ্তাহের ব্যবধানে বিভিন্ন সবজির দাম কেজিপ্রতি ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। অন্যদিকে ফার্মের ডিমের দাম বেড়ে ডজনপ্রতি ১৬০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। পাশাপাশি মাছ ও মুরগির বাজারও ঊর্ধ্বমুখী, যা সীমিত আয়ের মানুষের ওপর প্রচণ্ড মানসিক ও আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, তেলের দাম বাড়ার আগেই নিত্যপণ্যের বাজার চড়া ছিল। এখন যাতায়াত ও পরিবহন খরচ নতুন করে বৃদ্ধি পাওয়ায় পণ্যের দাম আরও বেড়েছে।
মানিকগঞ্জ থেকে সবজি এনে কারওয়ান বাজারে বিক্রি করা ব্যবসায়ী রহমত মিয়া বলেন, 'দাম তো আগে থেকেই বেশি ছিল। এখন তেলের দাম বাড়ার কারণে আরও বাড়ছে। আজ মানিকগঞ্জ থেকে সবজি আনতে গিয়েই আমাকে পিকআপের ভাড়া বাবদ ৪০০ টাকা বেশি গুণতে হয়েছে।'
গতকাল নিউ মার্কেট, হাতিরপুল ও কারওয়ান বাজারের পাইকারি ও খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় সব ধরনের নিত্যপণ্যের দামই আগের চেয়ে বেড়েছে।
বাজারে প্রতি কেজি শিম বিক্রি হচ্ছে ১৭০ থেকে ২০০ টাকায়, যা গত সপ্তাহেও ছিল ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা। টমেটো ও বেগুনের দাম কেজিপ্রতি ৮০-১০০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০০-১২০ টাকায়। দেশি শসার দাম ৫০-৬০ টাকা থেকে একলাফে ৮০ টাকায় উঠেছে। এছাড়া করলা ও পটল ৬০ টাকা থেকে বেড়ে ৮০ টাকা এবং ধুন্দুল ১০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৭০-৮০ টাকায়।
একইভাবে বরবটি ৭০-৮০ টাকা ও ঝিঙে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ছিল ৬০ টাকা। কাঁচা মরিচের দাম বেড়ে ১০০-১২০ টাকা হয়েছে। লাউ প্রতি পিস ৭০-৮০ টাকা ও গাজর ১২০-১৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
মসলা জাতীয় পণ্যের মধ্যে পেঁয়াজ ৪৫ টাকা, দেশি রসুন ১২০ টাকা, আমদানি করা রসুনের কেজি ১৮০ টাকা এবং আদা ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
হাতিরপুলে বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী মনির বলেন, 'এখন তো মনে হচ্ছে না খেয়ে থাকতে হবে। সেভাবে আয় বাড়েনি, কিন্তু বাজারে এলেই দাম বেড়ে যাচ্ছে। এভাবে চললে সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়বে।'
১৬০ টাকা পার ডিমের ডজন, কমেছে মুরগির সরবরাহ
গত সপ্তাহে অধিকাংশ বাজারে ডিমের ডজন ১৫০ থেকে ১৬০ টাকার মধ্যে থাকলেও পরিবহন ভাড়া বাড়ার অজুহাতে চলতি সপ্তাহে ডজনপ্রতি আরও ১০ টাকা বাড়ানো হয়েছে।
হাতিরপুল বাজারে সোনালী মুরগির কেজি ৩৩০ টাকা এবং ব্রয়লার ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
নয়াবাজার ও কাপ্তান বাজার থেকে মুরগী সংগ্রহকারী ব্যবসায়ী শাহীন বলেন, 'পিকআপের ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় আমাদেরও বেশি দামে মুরগি কিনতে হচ্ছে।' উৎপাদনে বাড়তি খরচ ও সরবরাহ কম থাকাকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ী সুমন বেপারী জানান, চাহিদার তুলনায় খামারগুলো থেকে মুরগির সরবরাহ অনেক কমে গেছে। ১,০০০ মুরগির অর্ডার দিলে মিলছে মাত্র ৩০০টির মতো। তদুপরি এক দিনেই মুরগিতে চার টাকা করে দাম বাড়িয়েছেন পাইকাররা।
বেড়েছে মাছের দামও
হাতিরপুল বাজারে আকারভেদে ইলিশ বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১,০০০ থেকে ১,৬০০ টাকায়। মাঝারি ও বড় রুই ৩৮০ থেকে ৪৫০ টাকা, কাতলা ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, তেলাপিয়া ২৪০ থেকে ২৮০ টাকা, পাঙ্গাশ ২০০ থেকে ২২০ টাকা এবং চাষের চিংড়ি ৭০০ থেকে ১,১০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, মূলত আড়তদার ও পাইকারি পর্যায়ে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে খুচরা বাজারে মাছের দাম বেড়েছে।
কারওয়ান বাজারের মাছ ব্যবসায়ীরা জানান, ট্রাকভাড়া বেড়ে যাওয়ায় মাছের ধরনভেদে কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে।
আটা-ময়দা, চাল ও দুধের দাম আরও চড়া
সরকারি প্রতিষ্ঠান টিসিবির হিসাবে, গত এক মাসে প্যাকেটজাত আটার দাম ৪ শতাংশ এবং ময়দার দাম ১৭ শতাংশ বেড়েছে।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, বর্তমানে প্যাকেটজাত আটা ৭০ টাকা ও ময়দা ৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে, যা গত সপ্তাহেও যথাক্রমে ৬০ টাকা ও ৭০ টাকা ছিল।
নিউ মার্কেটের বিক্রেতা মিরাজ বলেন, 'গত মাসেই আটায় কেজিপ্রতি ১০ টাকা বেড়েছিল। এখন পরিবহন খরচ বাড়ায় ডিলাররা আবার দাম বাড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছেন।'
চাল ব্যবসায়ী সিকদার আহমেদ জানান, গত বুধবার থেকে ট্রাকপ্রতি ভাড়া প্রায় ৪ হাজার টাকা বেড়ে যাওয়ায় চালের ওপর প্রভাব পড়ছে।
এদিকে গত দেড় মাসে প্যাকেটজাত তরল দুধের দাম দু দফায় লিটারে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। মিল্ক ভিটা, আড়ং, প্রাণ ও ফার্ম ফ্রেশ এখন প্রতি লিটার দুধ ১২০ টাকা ও আধা লিটার ৬০ টাকায় বিক্রি করছে। খামারি ও প্রক্রিয়াজাতকারীরা জানান, পরিবহন, দুধ সংগ্রহ, গোখাদ্য, গ্যাস ও বিদ্যুতের খরচ বেড়ে যাওয়ায় এই দাম বৃদ্ধি অনিবার্য ছিল।
বোতলজাত সয়াবিন তেলের সংকট
বাজারে এক ও দুই লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এছাড়া পাঁচ লিটারের বোতলের সরবরাহও আগের চেয়ে কমেছে।
চলতি মাসের শুরুতে কোম্পানিগুলো বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৫ টাকা বাড়িয়ে ২০৪ টাকা নির্ধারণ করে। দাম বাড়ার আগে টানা দুই মাস তেলের সরবরাহ কম ছিল। মূল্যবৃদ্ধির পর কিছুদিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও এখন নতুন করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ খুচরা বিক্রেতাদের।
তারা জানান, কোম্পানিগুলো বাজারজাত কম করায় ও ডিলাররা আবার দাম বাড়ার আভাস দেওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
