একসময় বৃহত্তর বাড্ডা ছিল কেবলই জলাশয় আর ফসলের মাঠ
প্রায় ৩৫ বছর আগে আলী আকবর ভোর হওয়ার আগেই উত্তর বাড্ডায় তার মুদি দোকান থেকে বের হয়ে নৌকায় করে পুরান ঢাকার সদরঘাটের বাদামতলীর পাইকারি বাজারে যেতেন। সেখান থেকে জ্বালানি তেল কিনতেন তিনি। তেল কেনা এবং ব্যারেলগুলো দোকানে ফিরিয়ে আনতে তার পুরো দিন লেগে যেত।
সেসময়ের কথা মনে থাকলেও আলী ঠিক কবে জন্মেছেন, তা তিনি নিজেও জানেন না। তবে তাকে দেখে মনে হয় তার বয়স ৮০ বছরের কাছাকাছি। এমনকি তার এলাকার মানুষও হয়তো তাকে দেখলে চিনতে পারবেন না। কিন্তু উত্তর বাড্ডায় 'আলীর মোড়' নামে একটি পরিচিত জায়গা রয়েছে, যেটি তার নামেই নামকরণ করা হয়েছে।
তিনি এলাকার কোনো ধনী দানশীল ব্যক্তি হয়ে সেখানকার সম্প্রদায়ের জন্য কিছু করেছেন বিষয়টি কিন্তু এমন নয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের ভাষ্য, বরং তিনি এই এলাকার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিজের মধ্যে ধারণ করে আছেন এবং কয়েক দশকে ঢাকার পূর্ব প্রান্তের এই নিচু প্লাবনভূমির পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়ে আছেন।
আলী বলেন, "তখন এখানে সবই ছিল পানি আর ফসলের মাঠ।" আর এখন তিনি যেখানে বসে আছেন, ঠিক সেখানেই একসময় ছিল বিশাল একটি পুকুর।
আজকের বৃহত্তর বাড্ডা—বৃহত্তর ঢাকার পূর্ব প্রান্তের বিস্তীর্ণ একটি অংশ—আলীর বর্ণনা করা সেই জলাভূমির প্রায় কোনো চিহ্নই আর এখন নেই। কয়েক দশকের মধ্যে এটি রাজধানীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে এবং দ্রুত ঢাকার মূল ভূখণ্ডের দিকে বিস্তৃত হচ্ছে।
দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষের আগমন, বড় বড় অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আবাসন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের দ্রুত সম্প্রসারণ এই প্লাবনভূমিকে ঘনবসতিপূর্ণ 'কংক্রিটের জঙ্গলে' পরিণত করেছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আলিয়া শাহেদ বলেন, ঔপনিবেশিক উন্নয়ন পদ্ধতি বাস্তবায়নের কারণে রাজধানীর অন্যান্য এলাকার মতো এই এলাকাও কয়েক দশক ধরে একটি 'উন্নয়ন ফাঁদে' আটকে আছে।
তিনি আরও বলেন, "এখন এটি কোথাও এগোচ্ছে না।"
বর্তমান বৃহত্তর বাড্ডা কয়েক দশক ধরে জমি দখল, দ্রুত বালু দিয়ে জমি ভরাট এবং অপরিকল্পিত শহরতলির বসতি গড়ে ওঠার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ২০ বছরের ব্যবধানে তোলা স্যাটেলাইট চিত্রের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, এই জায়গা একসময় কেমন ছিল এবং এখন কেমন হয়েছে। অথচ এরপরও প্লাবনভূমিটি ক্রমাগত মুছে ফেলা হয়েছে।
গ্রামীণ প্রান্ত থেকে শহরের অভ্যন্তরে এক উপশহর
বাড্ডার ইতিহাস বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের, যখন এলাকাটি মূলত ঢাকার পৌরসীমার বাইরে অবস্থিত একটি গ্রামীণ অঞ্চল ছিল। স্থপতি আলিয়া শাহেদের মতে, শহরের প্রান্তবর্তী অবস্থানের কারণে এলাকাটি পরিকল্পনার মাধ্যমে গড়ে ওঠার বদলে 'এলোমেলোভাবে' বিকশিত হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় এলাকার বিস্তীর্ণ জলপথ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জন্য ব্যাপক অভিযান চালানো কঠিন করে তুলেছিল।
আলী আকবর স্মরণ করে বলেন, "যতদূর শুনেছি, সাতারকুল আর ভাটারার মতো জায়গায় যুদ্ধ হয়েছিল। কোনো কোনো দিন পাকিস্তানি সেনারা নৌকায় করে আসত। সামাইদ গ্রামে কয়েকজন মানুষ নিহত হওয়ার কথাও শুনেছি।"
বাড্ডার প্রাথমিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির পেছনেও বাস্তুচ্যুতির ভূমিকা ছিল। প্রায় ১৯৬১ সালে ঢাকা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ পরিকল্পিত গুলশান মডেল টাউন প্রকল্পের জন্য জমি নির্বাচন করে। সচ্ছল বাসিন্দারা সেখানে বসতি স্থাপন করতে শুরু করলে এলাকার অনেক আদি বাসিন্দাকে আশপাশের বিভিন্ন এলাকায়, যার মধ্যে বাড্ডা ও নতুন বাজারও ছিল, সরিয়ে নেওয়া হয়।
১৯৫০ থেকে ১৯৬০-এর দশকের মধ্যে প্রগতি সরণি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত এলাকার বড় একটি অংশই ছিল জঙ্গল, জলপথ ও কৃষিজমি, যা আনুষ্ঠানিক পৌর নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল।
আলী স্মরণ করে বলেন, "আমি যখন অল্প পরিমাণ মালপত্র আনতাম, তখন সেগুলো মাথায় করে নিয়ে যেতাম। নৌকায় করে পানি পার হয়ে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে হেঁটে উত্তর বাড্ডায় পৌঁছাতাম।"
তার ধারণা, প্রগতি সরণির বয়স মাত্র ৪৫ বছরের মতো এবং সড়কটির পূর্ব দিকে আধুনিক স্থাপনাগুলোর বেশিরভাগই গত তিন দশকের মধ্যে গড়ে উঠেছে।
প্রশাসনিকভাবে বর্তমান বাড্ডা ব্রিটিশ আমলে কেরানীগঞ্জের অধীনে ছিল। পাকিস্তান আমলে এটি তেজগাঁও থানার অধীন হয় এবং পরে গুলশান থানার আওতায় আসে। ঢাকা মহানগর পুলিশ সম্প্রসারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এখানকার প্রশাসনিক এখতিয়ার কয়েকটি থানায় ভাগ করা হয়। ১৯৯৮ সালের ৯ ডিসেম্বর বাড্ডা থানা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন এর আয়তন ছিল ৩৬ দশমিক ৮৪ বর্গকিলোমিটার। পরে ২০০৫ সালে খিলক্ষেত থানা আলাদা করে গঠন করা হয়।
হাতিরঝিল-বেগুনবাড়ী পুনঃউন্নয়ন প্রকল্পের পর বাড্ডার বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। প্রকল্পটি ২০০৭ সালে অনুমোদিত হয়। ২০০৮ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে এর নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে এটি জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়।
এই প্রকল্পের ফলে বাড্ডা বিচ্ছিন্ন পূর্ব প্রান্তের একটি এলাকা থেকে ঢাকার সঙ্গে অনেক বেশি সংযুক্ত অভ্যন্তরীণ উপশহরে পরিণত হয়।
এসব বড় অবকাঠামো উন্নয়নের পর বাড্ডায় জমির মূল্য বেড়ে যায়। এর ফলে তুলনামূলক সস্তা ও আধা-গ্রামীণ আবাসিক এলাকা থেকে বাড্ডা একটি পরিচিত মধ্যবিত্ত নগর বসতিতে পরিণত হয়।
এরপর প্রগতি সরণি এবং গুলশান-বাড্ডা সংযোগ সড়ককে ঘিরে বাণিজ্যিক কার্যক্রম কেন্দ্রীভূত হতে থাকে। অন্যদিকে ভেতরের অংশ এখনো মূলত আবাসিক এলাকা হিসেবে উন্নয়নের পর্যায়ে রয়েছে।
২০২৪ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন আফতাবনগর ও আশপাশের এলাকার মধ্যে যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করতে রামপুরা খালের ওপর তিনটি সেতু নির্মাণ শুরু করে। দীর্ঘদিনের যানজট কমানোই ছিল এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য।
কংক্রিটের নিচে চাপা পড়া প্লাবনভূমি
সবকিছুর শুরু কোথায়, তা বুঝতে হলে যেতে হবে বালু নদীর তীরে। গাজীপুরের টঙ্গীর কাছে বেলায় বিল ও আশপাশের জলাভূমি থেকে বালু নদীর উৎপত্তি। এটি গাজীপুর ও ঢাকার পূর্ব প্রান্ত দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নারায়ণগঞ্জে গিয়ে শীতলক্ষ্যা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে।
আলিয়া শাহেদ বলেন, "ভৌগোলিকভাবে বাড্ডা মূলত জলাভূমি, প্লাবনভূমি এবং নিচু জমি নিয়ে গঠিত ছিল, যা ঢাকার বৃহত্তর পূর্বাঞ্চলীয় প্লাবনভূমির সঙ্গে যুক্ত। ভূমির গঠনগত দিক থেকে এই জমিকে অবশ্যই 'জমি ও পানি'—এই দুইয়ের সমন্বয় হিসেবে থাকতে হবে, শুধু জমি হিসেবে নয়।"
তাহলে কেন এটি 'জমি ও পানি'—এই দুইয়ের সমন্বয় হিসেবে থাকা প্রয়োজন?
আলিয়া ব্যাখ্যা করেন, এর উত্তর বাংলাদেশের বদ্বীপভূমির ভূমিরূপগত বৈশিষ্ট্যের মধ্যে নিহিত।
বর্ষাকালে বিপুল পরিমাণ পানি নদীপথে নিচের দিকে প্রবাহিত হয়ে বালু ও শীতলক্ষ্যার মতো নদীর প্লাবনভূমিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরে মেঘনার মতো বৃহত্তর জলপ্রবাহ ব্যবস্থায় গিয়ে মিশে যায়।
এই প্লাবনভূমিগুলো প্রাকৃতিকভাবে পানি ধারণ ও প্রবাহিত হওয়ার জায়গা হিসেবে কাজ করে। ফলে অতিরিক্ত পানি ধীরে ধীরে বদ্বীপের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। বৃহত্তর বাড্ডাও এমনই একটি ভূদৃশ্যের অংশ।
আলিয়া বলেন, পূর্ব থেকে পশ্চিমে ঢাকার বিভিন্ন অংশ একসময় আটটি বড় জলাভূমির মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এর মধ্যে বেগুনবাড়ী ও রামপুরার মতো খালও ছিল।
তবে এসব জলাভূমির বেশিরভাগই পরে 'উন্নয়নের' স্তরের নিচে চাপা পড়ে গেছে।
বালু নদীর দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে নতুন নতুন বসতি গড়ে উঠেছে। আর এর পশ্চিমে অবস্থিত বৃহত্তর বাড্ডা।
এই এলাকার মধ্যে বর্তমান বাড্ডা, শাহজাদপুর, সাতারকুল, বেরাইদ, মেরুল, আফতাবনগর এবং আশপাশের এলাকাগুলো অন্তর্ভুক্ত।
বাড্ডা নামের উৎপত্তি নিয়ে নিশ্চিত তথ্য কম। একটি মৌখিক বর্ণনা অবশ্য, যদিও তা ব্যাপকভাবে নথিভুক্ত নয়, এই নামের সঙ্গে যাযাবর বেদে সম্প্রদায়ের সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করা হয়। এই বর্ণনা অনুযায়ী, 'বাইদ্দা' নামটি ধীরে ধীরে 'বাড্ডা'তে রূপ নেয়।
আরেকটি সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন আলিয়া। তার মতে, নামটি ভূমিরূপগত শব্দ 'বাইদ' থেকে আসতে পারে। 'বাইদ' বলতে মধুপুর ও ভাওয়াল ভূভাগে উঁচু 'চালা' জমির পাশে থাকা দীর্ঘ, সরু নিচু জমি বা জলাভূমিকে বোঝায়।
বাড্ডাসহ ঢাকার পূর্বাঞ্চলে এ ধরনের 'বাইদ' ভূমি সদৃশ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তাই বন্যা এই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই অনিবার্য একটি ঘটনা।
বৃহত্তর ঢাকায় ১৯৫৪, ১৯৫৫, ১৯৬৮, ১৯৭১, ১৯৭৪, ১৯৮৭, ১৯৮৮, ১৯৯৮, ২০০৪ এবং ২০০৭ সালে বড় ধরনের বন্যা হয়েছে।
১৯৮৮ সালের বন্যায় ঢাকার প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। এতে ২ হাজারের বেশি মানুষ মারা যায় এবং বন্যা প্রায় তিন মাস স্থায়ী হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার বন্যা কর্মপরিকল্পনার আওতায় বিভিন্ন সমীক্ষা শুরু করে। ঢাকাকে বন্যা কর্মপরিকল্পনার ৮-ক এবং ৮-খ—এই দুই ভাগে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে ৮-ক-এর আওতায় ছিল পূর্ব ঢাকা।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, "ঢাকাকে বন্যা থেকে রক্ষা করতে এই দুই কর্মপরিকল্পনার আওতায় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জেনারেল এরশাদ শহরের চারপাশে দুটি বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন। এর একটি শহরের পশ্চিম দিকে, যা বর্তমানে বেড়িবাঁধ নামে পরিচিত, আর অন্যটি পূর্ব দিকে বালু নদীকে ঘিরে নির্মাণের কথা ছিল।"
আশরাফুল আরও বলেন, এই দুটি বাঁধ নির্মাণের পেছনে ধারণাটি ছিল, উভয়টি নির্মাণ শেষ হলে ঢাকা একটি বন্যামুক্ত শহরে পরিণত হবে।
কয়েক বছর পর তুরাগ নদীর তীরে নির্মিত পশ্চিম পাশের বাঁধ সফলতা পায়।
আশরাফুল বলেন, "তবে এরপরও ১৯৯৫ সালে ঢাকা মহানগর উন্নয়ন পরিকল্পনার অধীনে যখন মহাপরিকল্পনা তৈরি করা হয়, তখনও তাতে পূর্বাঞ্চলীয় বাঁধ নির্মাণের বিষয়টি রাখা হয়েছিল। পরিকল্পনা ছিল, একসময় এই বাঁধ নির্মাণ করা হবে এবং সেটি সম্পন্ন হলে পূর্ব ঢাকা ভবিষ্যতের একটি বন্যামুক্ত নগর এলাকায় পরিণত হবে।"
শেষ পর্যন্ত প্রস্তাবিত পূর্বাঞ্চলীয় বাঁধ আর নির্মাণ করা হয়নি এবং কার্যকর কোনো বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি।
ফলে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, এর পরিণতিতে ঢাকার এই অংশে বন্যা নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
এমনকি সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও বর্ষাকালে বন্যার কারণে এই এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
২০২৫ সালে প্রকাশিত 'পূর্ব ঢাকার বন্যায় বালু নদীর জলভূমিরূপগত প্রভাব' শীর্ষক এক গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে, প্রবল বর্ষণের সময় এই এলাকার প্রায় ৯২ থেকে ৯৯ শতাংশই পানিতে তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।
আবাসন ব্যবসা যেভাবে প্লাবনভূমির চেহারা বদলে দিল
অভিবাসন যদি বাড্ডার জনসংখ্যার চিত্র বদলে দিয়ে থাকে, তাহলে এর ভূমির চেহারা বদলে দিয়েছে আবাসন শিল্প।
১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে বৃহত্তর ঢাকা উন্নয়নের উপযোগী জমির সংকটে পড়তে শুরু করে।
তখন ধীরে ধীরে নজর চলে যায় ইতোমধ্যে ঘনবসতিপূর্ণ পশ্চিমাঞ্চল থেকে পূর্ব প্রান্তের বিস্তীর্ণ নিচু জমির দিকে।
প্রস্তাবিত পূর্বাঞ্চলীয় বাঁধ কখনো নির্মিত না হলেও, একসময় এলাকাটি বন্যামুক্ত হবে—এমন প্রত্যাশা রাতারাতি জমির বাজারকে বদলে দেয়।
আশরাফুল ইসলাম বলেন, "পূর্বাঞ্চলে অন্য পাশের তুলনায় বসতি তুলনামূলক কম ছিল। তাই এটিকে শহরের ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।"
তিনি বলেন, "ব্যক্তি পর্যায়ে জমি কেনার পাশাপাশি বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলোও সেখানে জমি কিনতে এবং আবাসন প্রকল্প গড়ে তুলতে শুরু করে।"
১৯৯০-এর দশকের শুরু থেকে ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেড, ইউনাইটেড গ্রুপ, স্বদেশ প্রপার্টিজ লিমিটেডসহ বিভিন্ন আবাসন প্রতিষ্ঠান বৃহত্তর বাড্ডা ও আশপাশের এলাকায় বিস্তীর্ণ জলাভূমি ও কৃষিজমি কিনতে শুরু করে।
তবে এই পরিবর্তন মোটেও সমন্বিতভাবে ঘটেনি।
প্রতিটি আবাসন প্রতিষ্ঠান স্বাধীনভাবে জমি কিনেছে এবং নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী উন্নয়নকাজ চালিয়েছে।
আশরাফুল বলেন, "একটি প্রতিষ্ঠান এক জায়গা ভরাট করেছে, আরেকটি অন্য জায়গা ভরাট করেছে। মাঝখানের সব জমি তারা কিনতে না পারায় অনেক জায়গা অনুন্নত থেকে গেছে। সেসব জায়গায় পানি জমতে থাকে এবং ধীরে ধীরে সেগুলো বিচ্ছিন্ন জলাভূমিতে পরিণত হয়।"
প্রথম দিকের আবাসন প্রকল্পগুলো নগর পরিকল্পনার মানদণ্ডের ঘাটতিও স্পষ্ট করে দেয়।
আশরাফুল বলেন, ১৯৯০ সালের দিকে যখন উন্নয়ন শুরু হয়, তখন বেসরকারি আবাসন উন্নয়নের জন্য আনুষ্ঠানিক কোনো বিধিবিধান ছিল না।
প্রাথমিক পর্যায়ে মূলত মৌজা মানচিত্রের ওপর ভিত্তি করে অনুমোদন দেওয়া হতো এবং আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলোকে পর্যাপ্ত জনসুবিধা নিশ্চিত করতে হতো না।
তিনি বলেন, "ইস্টার্ন হাউজিংয়ের প্রথম দিকের প্রকল্পগুলোর দিকে তাকালে দেখবেন, সেখানে জনসাধারণের জন্য নাগরিক সুবিধা খুবই কম।"
২০০৪ সালের বেসরকারি আবাসন প্রকল্প ভূমি উন্নয়ন বিধিমালা প্রণয়নের পর পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে।
এই বিধিমালায় আবাসন প্রকল্পে সড়ক, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা, খোলা জায়গা এবং অন্যান্য নাগরিক সুবিধা রাখার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়।
পরবর্তীতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার মাধ্যমে তদারকি আরও জোরদার করে এবং পরিকল্পনার মানদণ্ড মেনে চলাকে প্রকল্প অনুমোদনের শর্ত হিসেবে নির্ধারণ করে।
তবে আশরাফুল মনে করেন, ঢাকার উন্নয়নের জন্য বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো অপরিহার্য।
তিনি বলেন, "বেসরকারি উদ্যোক্তাদের ছাড়া রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা সরকার—কেউই শহরের আবাসনের চাহিদা পূরণ করতে পারবে না। তবে তাদের নিয়ন্ত্রণহীনভাবে কাজ করতে দেওয়া যাবে না।"
এই ব্যবধান দূর করতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ 'ভূমি পুনর্বিন্যাস' পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, নেপাল ও থাইল্যান্ডে ইতোমধ্যে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।
এই পদ্ধতিতে জমির মালিকেরা তাদের জমি বিক্রি না করে এর একটি অংশ সড়ক, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা ও জনসাধারণের অন্যান্য সুবিধার জন্য দিয়ে থাকেন।
আশরাফুলের বিশ্বাস, অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা প্রস্তাবিত ভূমি পুনর্বিন্যাস বিধিমালা একটি 'গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক' হয়ে উঠতে পারে।
এর মাধ্যমে জমির মালিকেরা উন্নয়নের সুফল পাওয়ার পাশাপাশি জমি উন্নয়নকারীরাও একটি সুস্পষ্ট নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মধ্যে কাজ করার সুযোগ পাবেন।