অটোরিকশার অবৈধ চার্জিংয়ে বছরে ৪,০০০ কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অবৈধ চার্জিংয়ের কারণে সরকার বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার বিশাল অংকের রাজস্ব হারাচ্ছে। দেশে বর্তমানে ৫০ থেকে ৮০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার চলাচল করলেও এগুলোর জন্য বৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে মাত্র ৩ হাজার ৩০০টি। শুধুমাত্র ঢাকাতেই অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা ৪৮ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ এসব তথ্য জানান। সংরক্ষিত মহিলা আসন-৪-এর সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানুর দেওয়া 'নিয়ন্ত্রণহীন অটোরিকশা চলাচল প্রসঙ্গে' নোটিশের জবাবে মন্ত্রী সংসদকে এসব তথ্য অবহিত করেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ।
বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক চাপ ও অবৈধ সংযোগ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, গত এক দশকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইক দেশের পরিবহন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এগুলোর অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা ও সড়ক নিরাপত্তার ওপর চাপ তৈরি করেছে। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, দেশে চলাচলরত ৫০ থেকে ৮০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার চার্জ দিতে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ বা তারও বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে।
বিপুল সংখ্যক যান একসঙ্গে চার্জ দেওয়ায় স্থানীয় বিতরণ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। আবাসিক সংযোগের বাণিজ্যিক ব্যবহার এবং ট্রান্সফরমারের ওপর বাড়তি লোড তৈরির ফলে বিদ্যুৎ বিভ্রাটও বাড়ছে। এমপি রেহানা আক্তার রানু জানান, প্রতিদিন অটোরিকশা চার্জিংয়ে প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে, যা লোডশেডিংয়ের অন্যতম কারণ। বিদ্যুতের খুঁটি থেকে অবৈধ সংযোগ নেওয়ায় এই বিপুল পরিমাণ অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে না।
ঢাকায় ৪৮ হাজার অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট
মন্ত্রী জানান, সারাদেশে মাত্র ৩ হাজার ৩০০টি বৈধ চার্জিং পয়েন্ট থাকলেও শুধু ঢাকাতেই অনানুষ্ঠানিক বা অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে ৪৮ হাজারের বেশি। এসব পয়েন্টে অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলেই বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে।
তবে অটোরিকশার ওপর নির্ভরশীল বিপুল মানুষের জীবিকার কথা বিবেচনা করে বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া এসব যান জব্দ বা চালকদের হয়রানি না করার আহ্বান জানান এমপি রেহানা আক্তার রানু।
দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি
সংসদে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে মোট ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯১১ জন নিহত এবং ১৪ হাজার ৮১২ জন আহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনার ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ ক্ষেত্রেই জড়িত ছিল ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। অনিবন্ধিত যান, অপ্রশিক্ষিত চালক, ত্রুটিপূর্ণ নকশা, ব্রেক ও আলোর স্বল্পতা এবং মহাসড়কে ধীরগতির এই যানগুলো চলাচলের কারণেই দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
অটোরিকশায় ব্যবহৃত লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির অনিরাপদ পুনব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারি ব্যবস্থাপনার ফলে সিসা দূষণসহ মাটি ও পানি দূষিত হচ্ছে। এর ফলে শিশু শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে এবং কৃষি ও পোলট্রি শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সরকার নতুন নীতিমালায় পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি ব্যবহারের বিষয়টি বাধ্যতামূলক করতে যাচ্ছে।
নজরদারিতে ২০০ নতুন এআই ক্যামেরা
ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে রাজধানীর ১৭টি সিগন্যালে বর্তমানে ৫০টি এআই-ভিত্তিক (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) ক্যামেরা সচল রয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় রমনা ও তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগে আরও ২০০টি এআই ক্যামেরা স্থাপনের কাজ চলছে। পর্যায়ক্রমে পুরো ঢাকা শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলো এই প্রযুক্তির আওতায় আসবে বলে জানান মন্ত্রী।
আসছে নতুন নীতিমালা ও নিবন্ধন
অটোরিকশাকে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোর আওতায় আনতে সরকার নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করছে। মন্ত্রী জানান, এর আওতায় অনুমোদিত অটোরিকশায় নাম্বার প্লেট ও কিউআর কোড থাকবে। চালকদের নিবন্ধিত করে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে লাইসেন্স দেওয়া হবে। একটি নিবন্ধন নম্বর দিয়ে একাধিক গাড়ি চালানো বন্ধে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা রাখা হবে।
এমপি রেহানা আক্তার রানু অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে চার্জিং ব্যবস্থা এবং বিআরটিএ-র নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করাসহ অঞ্চলভিত্তিক চলাচলের প্রস্তাব দেন। জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশ্বস্ত করেন যে, মানুষের কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত না করে পরিবেশ রক্ষা এবং ট্রাফিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করাই সরকারের মূল লক্ষ্য।
