ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে কেন বারবার ব্যর্থ হচ্ছে প্রত্যেক সরকার
আমাদের নগরকেন্দ্রিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে একটি যানবাহন নিয়ন্ত্রণের সংকট দেখা দিয়েছে— ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা কি নিষিদ্ধ করা উচিত, নাকি উচিত নয় সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
১৯৯৬-৯৭ সালের কথা। গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফিরোজ আহমেদ তখন কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। একদিন তিনি সরকারি দলের এক সংসদ সদস্যকে একটি মিছিলে অংশ নিতে দেখেন।
ফিরোজ আহমেদ সেই সংসদ সদস্যের বক্তব্য স্মরণ করে বলেন, 'আগের সরকার রিকশা চোরদের একটি চক্র লালন-পালন করত। রিকশাচালকদের প্রতি মাসে ৩০০ টাকা করে দিতে হতো এবং তাদের রিকশার পেছনে একটি সাইনবোর্ড ঝুলানো থাকত, যাতে লেখা থাকত— 'রিকশা চুরি প্রতিরোধ কমিটি'। যারা এই টাকা দিতে অস্বীকার করত, তাদের রিকশা চুরি হয়ে যেত।'
রিকশায় মোটরের সংযোজন হলেও, ৩০ বছর আগে ফিরোজ আহমেদ যে রাজনৈতিক অর্থনীতি পর্যবেক্ষণ করেছিলেন, তা আজও আশ্চর্যজনকভাবে টিকে রয়েছে। সরকার বর্তমানে হিসেব করেছে, বাংলাদেশে প্রায় ৫০ লাখ থেকে ৮০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইলেকট্রিক থ্রি-হুইলার চলাচল করছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসেব অনুযায়ী এই সংখ্যা ৬০ লাখের বেশি, যার মধ্যে ১০ থেকে ১২ লাখ রয়েছে শুধু ঢাকাতেই।
এগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার ঢাকা শহরকে আটটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে ভাগ করে রং-ভিত্তিক জোন ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে। সেই সাথে ভুয়া নিবন্ধন ঠেকাতে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও কিউআর কোড বাধ্যতামূলক করা এবং অননুমোদিত প্রস্তুতকারক ও ৪৮ হাজার অবৈধ চার্জিং স্টেশনের বিরুদ্ধে অভিযানের পরিকল্পনা রয়েছে। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই অবৈধ চার্জিং স্টেশনগুলোর কারণে সরকারের বার্ষিক প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে।
দুর্ঘটনা কমাতে জাতীয় মহাসড়কগুলোতে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হলেও, শহরের রাস্তাগুলোতে এখনও এগুলো অবাধে চলছে। আর লাখ লাখ চালকের জীবিকা সুরক্ষার কথা বিবেচনা করে সরকারের পক্ষে এদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের কোনো ক্র্যাকডাউন বা অভিযানে যাওয়া এখনও অসম্ভাব্য বলেই মনে হয়।
পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকার ২০২৪ সালের মে মাসে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছিল। ১৫ মে তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের কর্তৃপক্ষকে ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধের নির্দেশ দেন। চালকরা সে সময় সড়ক অবরোধ করে সহিংস প্রতিক্রিয়া জানান। ১৯ মে বিক্ষোভের কারণে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকা অচল হয়ে পড়ে। বিক্ষোভকারীরা অন্তত চারটি বাসে ভাঙচুর চালায় এবং কালশীতে একটি পুলিশ বক্সে আগুন ধরিয়ে দেয়। পুলিশ লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাসের সেল নিক্ষেপ করে। এসব সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন আহত হন। এই নিষেধাজ্ঞা মাত্র কয়েক দিন স্থায়ী হয়। ২০ মে ওবায়দুল কাদের ঘোষণা করেন, নিম্ন আয়ের চালকদের কষ্টের কথা বিবেচনা করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকায় এসব যানবাহন চলাচলের অনুমতি দিয়েছেন। তবে মহাসড়কগুলোতে নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা হয়।
জুলাই অভ্যুত্থানের পরও ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। ২০২৪ সালের ১৯ নভেম্বর হাইকোর্ট তিন দিনের মধ্যে ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধের নির্দেশ দেন। চালকগণ আবারও সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন। ২৫ নভেম্বর সরকারের একটি আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে আপিল বিভাগ ওই আদেশের ওপর এক মাসের জন্য 'স্থিতাবস্থা' বজায় রাখার নির্দেশ দেন। ফলে যানবাহনগুলো আবারও রাস্তায় ফিরে আসে।
বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ)-এর কার্যনির্বাহী কমিটির পরিচালক মোহাম্মদ সুবাইল বিন আলম বলেন, 'নিয়ন্ত্রণ কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে, কারণ প্রতিটি পদক্ষেপেই সরাসরি নিষেধাজ্ঞার পথ বেছে নেওয়া হয়েছিল এবং উচ্ছেদকেই নিয়ন্ত্রণ বলে ভুল করা হয়েছিল। যে যানবাহনটি ইতোমধ্যেই একটি বৃহৎ শিল্পে পরিণত হয়েছে, তাকে আপনি চাইলেই এক ঘোষণায় নিষিদ্ধ করতে পারেন না।'
রাষ্ট্র 'লাস্ট-মাইল' পরিবহনকে গুরুত্ব দেয়নি
ব্যাটারিচালিত রিকশার আধিক্য নিয়ে তর্কের সময় সমালোচকরা প্রায়শই ভুলে যান, কেন এগুলো শুরুতেই এতটা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। এগুলো মূলত পরিবহনের শূন্যতা পূরণ করেছিল। পরবর্তীতে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী গ্যারেজ মালিকরা সুযোগটি কাজে লাগান এবং রাস্তায় এসব যানবাহনের প্লাবন ঘটান।
বাসগুলো সরু আবাসিক রাস্তায় ঢোকে না। আবার, মেট্রো স্টেশনগুলো যাত্রীদের সরাসরি বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেয় না। সাধারণত স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতের জন্য সিএনজিচালিত অটোরিকশাগুলো প্রায়শই বেশ ব্যয়বহুল। অন্যদিকে প্যাডেলচালিত রিকশাগুলো এই শহরের গতি ও চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত ধীরগতির। আর ঢাকায় হেঁটে চলাচল করা একটা ভালো বুদ্ধি বলে যারা মনে করেন, তারা নির্ঘাত সকাল ১১টার আগে বা বিকেল ৫টার পরে নিউ মার্কেট, গুলিস্তান, মিরপুর-১০ কিংবা ফার্মগেটের ফুটপাত দিয়ে কখনও হেঁটে দেখেননি।
ব্যাটারিচালিত রিকশা যাত্রীদের দোরগোড়াতেই সহজলভ্য এবং কম খরচে যাতায়াতের সুবিধা দেয়। ফিরোজ আহমেদ বলেন, 'পরিবহনের একটি সামাজিক চাহিদা রয়েছে, আর সেই চাহিদা পূরণের দায়িত্ব কার? সরকার এবং সিটি কর্পোরেশনের। যখন তারা আনুষ্ঠানিক পরিবহন ব্যবস্থা সরবরাহে ব্যর্থ হয়, তখন অনানুষ্ঠানিক রূপের পরিবহন গড়ে ওঠা অনিবার্য।'
আইন প্রয়োগকারী সংস্থা দিয়ে দমন-পীড়ন, 'অটোরিকশা নিষিদ্ধ করো' বলে চিৎকার করা কিংবা চালকদের মুখোমুখি হতে সোহানী শিফার ভারতীয় সিনেমার রাগী নায়িকাসুলভ স্টান্ট—কোনোটি দিয়েই এদের নির্মূল করা যাচ্ছে না।
ফিরোজ আহমেদ আরও বলেন, 'সরকার যদি স্বল্প দূরত্ব ও নির্দিষ্ট গন্তব্যের যাত্রার জন্য পর্যাপ্ত পরিবহন সরবরাহ না করে, তবে মানুষ অন্য কোনো পথ খুঁজে নেবেই। কেবল আইনি প্রয়োগ বা পুলিশি কড়াকড়ি দিয়ে আপনি এটি বন্ধ করতে পারেন না। প্রথম কাজ হলো বিকল্প ব্যবস্থার বন্দোবস্ত করা।' তিনি আরও বলেন, থাইল্যান্ডের উদাহরণটি এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যেতে পারে। ১০ বা ১৫ বছর আগে ব্যাংককে অনেক বেশি রিকশা ছিল, কিন্তু অন্যান্য পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতির সাথে সাথে সেগুলোর সংখ্যা কমে এসেছে। ফলে এধরনের পরিবহন ব্যবস্থাগুলো ধীরে ধীরে প্রান্তিক পর্যায়ে চলে গেছে।
লাখ লাখ যানবাহন, অথচ কোনো জবাবদিহিমূলক মালিক নেই। অটোরিকশা অর্থনীতি এখন পার্টস আমদানিকারক, অ্যাসেম্বলি ওয়ার্কশপ, মেকানিক, যানবাহনের মালিক, ফ্ল্যাট অপারেটর, গ্যারেজ, চার্জিং ব্যবসা, চালক, স্থানীয় নেতা এবং প্রভাবশালী বা চাদাঁবাজি বলয়ের এক দীর্ঘ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। অথচ নিয়ন্ত্রণমূলক বা আইনি প্রস্তাবনাগুলো সাধারণত শুরু হয় এই নেটওয়ার্কের একদম শেষ প্রান্তে থাকা চালককে দিয়ে।
যেহেতু যানবাহনগুলোর সাধারণত কোনো বিআরটিএ নিবন্ধন, সনাক্তকরণ নম্বর বা নির্ভরযোগ্য মালিকানার নথি নেই, তাই পুলিশ প্রচলিত ট্রাফিক জরিমানা ইস্যু করতে পারে না। কর্তৃপক্ষ এগুলো বাজেয়াপ্ত করতে পারে, তবে লাখ লাখ যানবাহনের এই বহরের জন্য তাদের পর্যাপ্ত ডাম্পিং স্পেস নেই। আজ হয়তো একজন চালককে সরিয়ে দেওয়া হলো, কিন্তু কালকেই তার জায়গায় অন্য একজন চলে আসে।
এমনকি লাইসেন্স প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ কে হবে, তা নিয়েও বিতর্ক রয়ে গেছে। বিআরটিএ জানিয়েছে, এই দায়িত্ব তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে সিটি করপোরেশনগুলো রিকশার লাইসেন্স দেওয়ার এখতিয়ার দাবি করছে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ২০২৫ সালে একটি 'ইলেকট্রিক থ্রি-হুইলার ম্যানেজমেন্ট পলিসি' বা 'ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা'র খসড়া তৈরি করে। তবে বিআরটিএ-র আপত্তির মুখে পরবর্তীতে স্থানীয় সরকার বিভাগ আলাদা নির্দেশিকা তৈরি করে।
সুবাইল বিন আলম বলেন, 'এই সমন্বয়হীনতা যেন বিশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্যই তৈরি করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত এই ব্যর্থতা কারিগরি কোনো বিষয় নয়, বরং রাজনৈতিক—এটি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং কায়েমি স্বার্থের বিষয়।'
সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখন আর মোটেই সামান্য নয়। যাত্রী ও অন্যান্য সড়ক ব্যবহারকারীরা আকস্মিক বাঁক, উল্টো পথে গাড়ি চালানো, অতিরিক্ত গতি, অপর্যাপ্ত আলো এবং বোঝাই অবস্থায় ব্রেক ফেল করার মতো সাধারণ ঝুঁকিগুলোর বিষয়ে অবগত। অনেক প্যাডেল রিকশায় ফ্রেম, ব্রেকিং সিস্টেম বা ভারসাম্যের কেন্দ্র পুনর্নির্ধারণ না করেই মোটর বসানো হয়েছে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মতে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে, যার ফলে ৯ হাজার ১১১ জনের মৃত্যু হয় এবং ১৪ হাজার ৮১২ জন আহত হন। এর মধ্যে ১৩.৫৪ শতাংশ দুর্ঘটনার সাথে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা যুক্ত ছিল। বুয়েটের প্রকৌশলীরা ইতোমধ্যেই একটি মানসম্মত মডেল তৈরি করেছেন, যাতে হাইড্রোলিক ও পার্কিং ব্রেক, সূচক বা ইন্ডিকেটর, আয়না, স্বয়ংক্রিয় অর্ধেক-দরজা, চালকের জন্য একটি সুরক্ষিত বসার স্থান এবং একটি যান শনাক্তকরণ নম্বর রয়েছে। যানটির প্রস্তাবিত গতিসীমা ঘণ্টায় ২৭ থেকে ৩০ কিলোমিটার, যার ব্রেকিং দূরত্ব ১০ মিটারের কম।
অতএব, প্রকৌশলগত সমস্যাটি অন্য কথায় সমাধানযোগ্য। সমস্যাটি মূলত এর শাসনব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনায়। প্রতিটি যানবাহনের নেপথ্যেই জড়িয়ে আছে বিদ্যুৎ চুরির প্রশ্ন। পরিবহন খাতের এই বিশৃঙ্খলা গ্যারেজগুলোর ভেতরে একটি অপ্রকাশ্য বা সমান্তরাল অর্থনীতিকে লুকিয়ে রাখছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, দেশে বৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা মাত্র প্রায় ৩ হাজার ৩০০টি, যেখানে কেবল ঢাকাতেই ৪৮ হাজারেরও বেশি অনানুষ্ঠানিক বা অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে। তার হিসাব অনুযায়ী, এই অবৈধ চার্জিংয়ের কারণে সরকার বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
এই যানবাহনগুলো বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৫ শতাংশ বা তারও বেশি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আবাসিক সংযোগ থেকে একসঙ্গে কয়েকটি গাড়িতে চার্জ দেওয়া হলে ট্রান্সফরমার এবং বণ্টন লাইনের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে, অন্যদিকে বাণিজ্যিক পরিচালকরা ভর্তুকিযুক্ত আবাসিক হারের সুযোগ নেন কিংবা মিটার পুরোপুরি বাইপাস করেন।
'ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালিসিস'-এর বাংলাদেশ বিষয়ক প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, 'পর্যাপ্ত চার্জিং সুবিধা থাকলে এবং ব্যবহারকারীরা ঠিকমতো বিদ্যুতের বিল পরিশোধ করলে এই চাপ সামলানো সম্ভব। যেসব স্থানে পর্যাপ্ত সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা বসানো আছে, সেখানে অতিরিক্ত চাহিদার কিছু অংশ তা দিয়ে মেটানো যেতে পারে।'
তবে চার্জিং পরিবেশগত ক্ষতির কেবল একটি অংশ। বেশিরভাগ যানবাহনই তুলনামূলকভাবে সস্তা সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারি ব্যবহার করে, যেগুলোর মেয়াদ বেশ কম। অনানুষ্ঠানিক উপায়ে এসব ব্যাটারি ভাঙা এবং পুনর্ব্যবহারের ফলে শ্রমিকরা—যাদের মধ্যে অনেক সময় শিশুরাও থাকে—এবং আশেপাশের বাসিন্দারা সীসা দূষণের ঝুঁকিতে পড়েন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সীসার স্পর্শে আসার ক্ষেত্রে কোনো 'নিরাপদ মাত্রা' নেই।
শফিকুল আলম আরও বলেন, 'সরকারকে এটিও নিশ্চিত করতে হবে যেন ব্যবহৃত ব্যাটারি এবং চার্জিং সিস্টেমগুলো উপযুক্ত মান ও নিরাপত্তা বজায় রাখে। একটি সঠিক লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া চালুর মাধ্যমে একে নিয়ন্ত্রণে আনা যেতে পারে।' তিনি জানান, 'এমন যেকোনো নীতি যা চালকদের নিবন্ধন দেয় কিন্তু গ্যারেজ, চার্জিং পরিচালনাকারী এবং ব্যাটারি পুনর্ব্যবহারকারীদের অস্পর্শিত রেখে দেয়, তা দৃশ্যমান যানবাহনটিকে বৈধতা দেবে ঠিকই, কিন্তু অদৃশ্য অর্থ বা কালো টাকাকেই সুরক্ষা দেবে।'
কেন এই বিশৃঙ্খলা লাভজনক?
তাহলে প্রশ্ন জাগে, একটি কার্যকর ব্যবস্থা কেন গড়ে ওঠেনি? এর উত্তরটা খুব ব্যবহারিক। অনানুষ্ঠানিকতা বা অবৈধ সুযোগ-সুবিধা সর্বস্তরে লাভ বণ্টন করে। মালিকরা কর এবং আইনি বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে যান। গ্যারেজগুলো মিটারহীন বা নামমাত্র মূল্যের বিদ্যুৎ থেকে মুনাফা তোলে। আর স্থানীয় মধ্যস্বত্বভোগীরা যাতায়াতের সুযোগ, রুট সুবিধা এবং সুরক্ষার নামে চাঁদা আদায় করে।
ঠিক এ কারণেই, জুলাই অভ্যুত্থানের পরপরই যে অটোরিকশা গ্যারেজে মাত্র ১০-১৫টি রিকশা থাকত, সেখানে এখন প্রায় ১০০টি রিকশা রাখা হচ্ছে। শফিকুল আলম বলেন, 'অনানুষ্ঠানিকতা জিইয়ে রাখার পেছনে একটি প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থও রয়েছে। যখনই একটি বড় অনানুষ্ঠানিক খাত গড়ে ওঠে, তখন অবৈধ ব্যবসা ও চক্রগুলোর জন্য আশ্রয়ের বিনিময়ে টাকা তোলার সুযোগ তৈরি হয়।'
তিনি আরও বলেন, 'এই বিশৃঙ্খলা বজায় রাখার বড় সমস্যা হলো, এটি স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতার জন্ম দেয়। কার্যকর সিগন্যাল এবং নির্দিষ্ট নিয়মের পরিবর্তে যখন ট্রাফিক ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ ম্যানুয়ালি বা হাতে করা হয়, তখন কোন গাড়ি চলবে আর কোনটি থামবে—সে বিষয়ে ট্রাফিক পুলিশদের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা চলে আসে।' তার মতে, ট্রাফিক সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো সম্পূর্ণ পুলিশের ওপর ছেড়ে না দিয়ে ট্রাফিক সংক্রান্ত নিয়ম তৈরি ও পর্যালোচনায় সাধারণ নাগরিক, ট্রাফিক প্রকৌশলী এবং পরিবহন বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, 'আপনি একটি অনানুষ্ঠানিক খাতকে যত কার্যকরভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবেন, এসব অবৈধ চক্রের সুযোগ তত কমে আসবে।' শফিকুল আলম জানান, স্বচ্ছ কাঠামো ও সঠিক তদারকি না থাকলে, বিপুল অর্থের লেনদেন জড়িত থাকার কারণে এই খাতটি রাজনৈতিক ছত্রছায়ার কাছে জিম্মি হয়েই থাকবে।
সরকারের সামনে এখন আসল চ্যালেঞ্জ এটাই। সঠিক শাসনব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে লাখ লাখ যানবাহন, গ্যারেজ ও শ্রমিককে একটি শৃঙ্খল ও নিরাপদ কাঠামোর অধীনে আনা সম্ভব। অথবা, পূর্ববর্তী সরকারগুলোর মতো আরেকটি নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেওয়া যেতে পারে—যা নতুন প্রতিবাদের জন্ম দেবে, সরকারকে ফের পিছু হটতে বাধ্য করবে এবং সমালোচকরা লাখ লাখ যানবাহনের এই অর্থনীতিকে অবৈধ বলতে থাকবে, কারণ এটিকে স্বীকৃতি দেওয়া মানেই একে শাসন করার দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে।
