‘হুমকি দিয়ে লাভ নেই, আমরা কি জোর করে ক্ষমতায় এসেছি?’: রিজভী
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবার পর গত ২০ আগস্ট বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নির্বাচিত হন রুহুল কবির রিজভী। পাশাপাশি তিনি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। ২৩ আগস্ট রোববার প্রথমবারের মত মহাসচিব হিসেবে নয়াপল্টনে পদার্পণের দুই সপ্তাহের মাথায় ৬ সেপ্টেম্বর সেখানেই দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের মুখোমুখি হন তিনি। সমসাময়িক বিষয়ে রুহুল কবির রিজভীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ প্রতিনিধি রাশেদ নিজাম।
টিবিএস:বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাস নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
রুহুল কবির রিজভী: নির্বাচনের আগে বিভিন্ন দফাওয়ারি সরকার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কখনো ২৭ দফা, কখনো ৩১ দফা, নির্বাচনের ঠিক আগে বিএনপির ইশতেহার এবং তার আগে ম্যাডামের (বেগম খালেদা জিয়া) 'ভিশন ২০৩০'-এর যে পরিকল্পনা, সেগুলো নিয়েই তিনি (তারেক রহমান) কিছু কর্মসূচি ও পরিকল্পনা তৈরি করেছিলেন। সেই অনুযায়ী তিনি কাজে নেমেছেন।
সামগ্রিক পরিকল্পনা বা পাঁচ বছরের পরিকল্পনার সেই টার্গেট তারা (সরকার) ছয় মাসে অনেকখানি পূরণ করেছেন, কাছাকাছি গেছেন বা অতিক্রম করেও গেছেন।
বৃক্ষরোপণের ক্ষেত্রে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের অঙ্গীকার আছে। ছয় মাসে আড়াই কোটি হওয়ার কথা, সেখানে তিন কোটির মতো হয়ে গেছে। তো এখানে কোনো দিক থেকেই সরকারের যে গতিশীলতা বা সরকারপ্রধানের যে নেতৃত্বের গতিশীলতা, কোথাও আমরা কোনো শ্লথ গতি দেখিনি। কোথাও আমরা কোনো পিছিয়ে পড়া দেখিনি। কোথাও কোনো দুর্বলতা দেখিনি।
প্রশ্নটা উঠছে জ্বালানি-গ্যাস নিয়ে। এটা তো সরকারের সৃষ্ট কোনো ঘটনা বা সরকারের বিভিন্ন অনিয়মের কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে, তা নয়। সংকট তৈরি হয়েছে গ্লোবাল কারণে, যুদ্ধের কারণে। টার্মিনালের যে কারিগরি ত্রুটি, সেটার কারণেও মূলত সমস্যা হচ্ছে।
আমাদের মূল জ্বালানি যেখান থেকে আসে, সেই জায়গা থেকে আসতে পারছে না। যুদ্ধ হচ্ছে, বোমা পড়ছে, সমুদ্রের মধ্যে মাইন বিছানো আছে। তো সেক্ষেত্রে দ্রুত এলএনজি, মানে জ্বালানিগুলো নিয়ে আসলেই তো হবে না। সেটা তো আবার এখানে প্রক্রিয়াজাত করতে হবে। ন্যাশনাল গ্রিডে দেওয়ার জন্য আমাদের টার্মিনালে রিগ্যাসিফিকেশন করতে হবে। তো সেখানে আবার কারিগরি ত্রুটি দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যে মেরামত হয়েছে। এই সময়টুকু তো দিতে হবে।
যদি এটা বুঝতাম যে সরকারের কোনো ভুলনীতির কারণে এই সংকটটা হয়েছে, তা তো হয়নি। কিন্তু এটাকে মোকাবিলা করার জন্য সরকারের উদ্যোগগুলোও তো আপনাকে বলতে হবে। সরকার আরও বাড়তি ৪০ হাজার কোটি টাকা এখানে বরাদ্দ দিয়েছে, যাতে দ্রুত জ্বালানি নিয়ে আসা যায়, গ্যাস নিয়ে আসা যায়, এলএনজি নিয়ে আসা যায়, ডিজেল নিয়ে আসা যায়। এবং দ্রুততার জন্য মিয়ানমার, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে সরকার কথা বলেছে। কথা বলা হচ্ছে, আমাদের মন্ত্রীরা সেখানে যাচ্ছেন। সরকার এই সংকট মোকাবেলার আন্তরিক।
টিবিএস: জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ৫ সেপ্টেম্বর লং মার্চ করেছে। চলমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটসহ জনজীবনের বিভিন্ন সংকটের জন্য তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের ব্যর্থতাকেই দায়ী করা হয়েছে।
রুহুল কবির রিজভী: ( জামায়াতের উদ্দেশে) একটা হুটহাট একটা কর্মসূচি দিয়ে দিলেন। আপনাদের প্ল্যান কী, বলেন। এটা নিরসন করতে গেলে আপনারা কী করতেন? সেটা পার্লামেন্টে আপনারা কথা বলেন যে, 'আমরা করলে এই করতাম'। সেটা যদি গ্রহণযোগ্য বিষয় হতো, নিশ্চয়ই সরকার এই কথাগুলো শুনত।
আমি মনে করি যে অপোজিশন পার্টি সমালোচনা করবে, কর্মসূচি করবে; তাতে আপত্তি নেই। কর্মসূচি করলে করতে পারেন। কিন্তু সেখানে নেতাদের যে বক্তব্য, রাষ্ট্র এবং সমাজকে অস্থিতিশীল করে দেওয়ার একটা ইঙ্গিত এর মধ্যে পাওয়া যায়। এখানে যারা সমাজে ঘৃণা ছড়াচ্ছে, যারা সমাজের মধ্যে মিথ্যাচার করছে, ব্যক্তির বিরুদ্ধে অশ্লীল কথা বলে যে ধরনের কলঙ্ক লেপনের চেষ্টা করা হচ্ছে, সেগুলোকে সমর্থন দেওয়া হচ্ছে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে।
তখনই আমাদের কাছে মনে হয় যে এখানে কোনো দুরভিসন্ধি কাজ করছে। দুরভিসন্ধি না হলে যে এই ধরনের একজন ছেলে গাজীপুরে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে অশ্লীল কথা বলেছে—একটা হচ্ছে, সমালোচনা: 'প্রধানমন্ত্রী এটা করলে ভালো করতেন', 'প্রধানমন্ত্রী এটা কেন করছেন', 'প্রধানমন্ত্রী এই খাতে এই মুহূর্তে বরাদ্দ বেশি দিলে পরে এটা ভালো হতো'—আপনারা তো এই সমালোচনাগুলো করছেন না।
আপনারা সমালোচনা করছেন, ব্যক্তিগত আক্রমণ করছেন, অশ্লীল কথাগুলো বলছেন। এটা তো একটা সামাজিক অপরাধের মধ্যে পড়ে এবং সেটা আইনের আওতায় আসবে।
কিন্তু বিরোধী দল তাকে সমর্থন দিয়েছে, তাকে আশ্রয় দিয়েছে। এটাই হলো দুর্ভাগ্য।
টিবিএস: ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা নিজেদের প্রথম লংমার্চ কর্মসূচিতে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে সরকার পতনের 'এক দফার' ইঙ্গিত দিয়েছেন। দাবি বাস্তবায়নে সরকারকে 'বাধ্য' করবেন—এমন অঙ্গীকারের কথাও বলেছেন।
রুহুল কবির রিজভী: আল্টিমেটাম! রাজনীতিকেরা অনেক কথা বলেন। তো আমি এটাকে খুব বড় হিসেবে দেখছি না। এই আল্টিমেটামটা কী হতে পারে? আল্টিমেটাম দিয়েছে, সরকার এটা শুনল। তো এটা দিয়ে তো কোনো ফলপ্রসু কিছু হবে না।
আসলে কার্যকর কাজ করতে হবে। গণতন্ত্রে বিরোধীদলী সরকারের একটা অংশ। তো সরকারকে পরামর্শ দিয়ে যৌথভাবে সংকট মোকাবিলায় কোনো পরামর্শ থাকলে, সেটা তারা করবেন। সেটা তো তারা দেন না। বরং যারা গালাগালি করছেন, তাদেরকে সমর্থন দিচ্ছেন এবং মূল সংকটকে এড়িয়ে তারা ঢালাও সমালোচনা করছেন এবং হুমকির মাধ্যমে সমালোচনা করছেন। এটাই আপত্তিকর।
তারা সমালোচনা করতে পারে। কিন্তু হুমকি দিয়ে 'উল্টে দিব', 'পাল্টে দিব', 'কীভাবে একজনকে নামিয়েছি', 'এটা নামাতে বেশি সময় লাগবে না'—এ ধরনের কথা কেন?
আমরা কি জোর করে ক্ষমতায় এসেছি? আমরা কি ক্ষমতায় এসে ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছি নাকি? যে সমস্ত কথা বলার পরিসর বন্ধ, কেউ রাজনৈতিক সংগঠন করতে পারবে না, মিছিল করতে পারবে না, কোনো কাজ করতে পারবে না, সেটা তো আমরা করিনি। সেটা তো ঠিকই চলছে। নাহলে আপনি (জামায়াত) লং মার্চ করলেন কী করে? আমরা যখন কোনো রোডমার্চ করেছি বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে, পদে পদে আক্রমণ করত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ। তো কালকে যে ওনারা করে গেলেন চট্টগ্রাম পর্যন্ত, কেউ কি বিএনপির কোনো লোক তাদের ওপর চড়াও হয়েছে? আক্রমণ করেছে? তা তো করেনি।
গণতন্ত্রের যে ভঙ্গি, গণতন্ত্রকে একটি খাতে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে উদ্যোগগুলো, এ কাজটা তো বিএনপি করছে। এবং সবাইকে নিয়ে তিনি (তারেক রহমান) করতে চান, সবাইকে নিয়েই তিনি এগিয়ে যেতে চাচ্ছেন।
তো আপনারা সেই ব্যাপারে সহযোগিতা করুন। আর সহযোগিতা না করে সরকার যে ইতিবাচক কাজগুলো করছে, সেই সরকারের বিরুদ্ধে, বা জনপ্রিয় সরকারের বিরুদ্ধে, আল্টিমেটাম দিয়ে অথবা আপনি তার বিরুদ্ধে কুৎসা করে ভাবমূর্তি নষ্ট করতে পারবেন না। বরং এই যে কুৎসা রটনাকারীকে সমর্থন দিয়েছেন, এটাতে আমার মনে হয় যে বিরোধী দলের যে সমস্ত নেতৃবৃন্দ এই সমর্থন দিচ্ছেন, তাদের ভাবমূর্তি অনেকটা হলেও নষ্ট হয়েছে।
টিবিএস: বিদ্যুতের দাম বাড়া নিয়েও মানুষের মাঝে ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে। সরকারের মধ্যে কোনো আলোচনা আছে কি না।
রুহুল কবির রিজভী: ইলেকট্রিসিটি তো নির্ভর করছে জ্বালানির ওপর। গ্যাস আনলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাস দিলে তারপর সেই, চুলাটা জ্বলবে। তো সেটার ব্যাপারে তো আমি আপনাকে আগেই বললাম।
আর ইলেকট্রিসিটি আমাদের জাতীয় জীবনের অপরিহার্য অংশ। এবং আপনি দেখবেন অনেক অলটারনেটিভ বেরিয়ে যাবে, বেরিয়ে যাচ্ছে। রিনিউয়েবল, যে সৌরবিদ্যুৎ, সেটার কিন্তু প্রসার হচ্ছে। এটার যদি আরও দ্রুত প্রসার ঘটে, যে বাড়তি উৎপাদন করবে তাদের কাছ থেকে কিনে নেবে সরকার। প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ভর্তুকি দিয়ে। যিনি উৎপাদন করবেন, তাকে দেওয়া হবে ১০ টাকা সরকার পক্ষ থেকে।
তো এই যে স্কিমগুলো, এই যে একটার পর একটা পদক্ষেপ, কে নিতে পারে? একটা জবাবদিহিমূলক সরকার দিতে পারে। সেটাই তারেক রহমানের সরকার, বিএনপি সরকার। সেটাই করছে।
টিবিএস: চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত একটি হিসেবে দেখা গেছে, রাজনৈতিক সহিংসতায় আহত-নিহত হওয়া সংখ্যার বড় অংশই বিএনপির নেতাকর্মী। নিজ দলের সংঘাত ছাড়াও বিরোধী দলের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়াচ্ছে বিএনপির লোকজন। দল থেকে কীভাবে সামাল দিচ্ছেন আপনারা।
রুহুল কবির রিজভী: দেখুন, ১৭ বছরে তো কোনো শান্তিপূর্ণ স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ছিল না। রাজনৈতিক কোনো পরিবেশ ছিল না। কাউকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে ক্রসফায়ার দেওয়া হয়েছে। কাউকে বাজার করে ফেরার সময় তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অনেকদিন নিখোঁজ রাখার পর তারপরে ঘোষণা হচ্ছে। অনেককে গুপ্তহত্যা করে মেরে ফেলা হয়েছে।
কারও বাড়িঘর দখল করে নেওয়া হয়েছে, কারও পুকুরের মাছ মেরে নিয়ে যেত। কেউ কিছু বলতে পারত না। যুবলীগ-ছাত্রলীগের ছেলেরা গোয়ালের গরু থেকে শুরু করে ছাগল সব ধরে নিয়ে যেত।
এই যে একটা পরিবেশ, এই পরিবেশ থেকে মানুষের একটা পরিত্রাণ হয়েছে। সেখানে কিছু উচ্ছৃঙ্খল কাজ কেউ কেউ করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে তো পদক্ষেপ নিয়েছে দল। বিএনপি পদক্ষেপ নিয়েছে। শক্ত হাতে পদক্ষেপ নিয়েছে। দুই-আড়াই হাজার মানুষকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এর চেয়ে আরও কী করবে? এবং এই যে শক্ত অবস্থানটা, আরও উত্তরোত্তর ক্রমবর্ধমানভাবে এটা বেড়ে যাবে। সরকারের মাত্র ছয় মাস গেছে। এখনো সাড়ে চার বছর বাকি আছে। এর মধ্যে দেখবেন যে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। আমরা যেকোনো ধরনের সহিসংতার জন্য জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছি। যে-ই জড়িত হবে, শাস্তি পাবেই।
