রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কার্যকর না করে সেগুলো দলীয়করণের পথেই হাঁটছে সরকার: টিআইবি
জাতীয় নির্বাচনের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও কার্যকর না করে সরকার উল্টো দলীয়করণের দিকে নিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলো ঐতিহাসিকভাবেই প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় নিয়ন্ত্রণে আনার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিল, যা গণতন্ত্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে তুলেছে। বর্তমান সরকারও একই পথে হাঁটছে।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস উপলক্ষে ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত 'গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও জবাবদিহিমূলক সরকার ব্যবস্থা' শীর্ষক এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
ড. ইফতেখারুজ্জামান সরকারের এই অবস্থানের সুনির্দিষ্ট উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে একজন ঋণখেলাপীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রশাসক বসানো হয়েছে।
তিনি প্রতিষ্ঠানের বর্তমান পরিস্থিতির বিবরণ দিয়ে বলেন, 'জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলুপ্ত করা হয়েছে। কোনো তথ্য কমিশন নেই। এমনকি দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) গত ছয় মাস ধরে অকার্যকর করে রাখা হয়েছে।'
তিনি আরও অভিযোগ করেন, 'শুধু তাই নয়, এসব প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ করার লক্ষ্যে যে আইনগুলো প্রণয়ন করা উচিত, তার পরিপূরক হিসেবে একটি সুসংবদ্ধ কাঠামোর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।'
আলোচনা সভায় উপস্থিত আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার মুহাম্মদ নওশাদ জমির বলেন, দলগুলো ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন পদে তাদের নিজস্ব লোক নিয়োগ দিতেই পারে, তবে সে ক্ষেত্রে অবশ্যই মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এই নীতি বেসরকারি খাত, গণমাধ্যমসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রয়োগ হওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শ করা হচ্ছে এবং আইন পাসের পরও তা সংশোধনের সুযোগ রয়েছে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হয়রানির অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে কোনো ভুলত্রুটি হলে তা কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের নজরে আসার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বিএনপি সরকারের মেয়াদ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে উপদেষ্টা দাবি করেন, প্রথম সাত মাসে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও অভূতপূর্ব মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, '১৭ বছরের ফ্যাসিবাদের জঞ্জাল একবারে উপড়ে ফেলা কঠিন।'
উপদেষ্টার এই বক্তব্যের জবাবে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, 'মানবাধিকার লঙ্ঘনের যে দাবি করা হচ্ছে, টিআইবির কাছে থাকা তথ্য তা সমর্থন করে না। টিআইবির সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বাধা বা হয়রানির অন্তত ৫২টি ঘটনা ঘটেছে এবং প্রধানত সন্ত্রাসবিরোধী আইনে অন্তত ৫৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।'
তিনি আরও তথ্য তুলে ধরে জানান, এই সময়ে নারী ও শিশুর ওপর ১,৭০০টিরও বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ৫০৩টি ধর্ষণের ঘটনা রয়েছে। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতনের ৫১টি ঘটনা, ৭ জনের মৃত্যু এবং বাহিনীর সম্পৃক্ততায় ১টি গুমের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়ার পেছনে যৌক্তিক কারণ থাকলেও পুলিশ বাহিনী এখনও নৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) বরিশাল জেলা সমন্বয়ক মনীষা চক্রবর্তী মনীষা চক্রবর্তী এবং সাবেক এনসিপি নেত্রী তাসনিম জারা উপস্থিত ছিলেন।
