ফেরদৌস স্টিলে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু: পানি রাখার ব্যালাস্ট ট্যাংকে বিষাক্ত গ্যাস কোথা থেকে এলো
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিতে যে ব্যালাস্ট ট্যাংকে বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস জমে নয় শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে, সেটি মূলত জাহাজের ভারসাম্য, ড্রাফট ও স্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণের জন্য সমুদ্রের পানি ধারণ করে। সাধারণভাবে এই ট্যাংকে জ্বালানি, এলএনজি বা অন্য কোনো বাণিজ্যিক পণ্য থাকার কথা নয়। ফলে সেখানে প্রাণঘাতী মাত্রায় হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি তদন্তকারীদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, বাংলাদেশে জাহাজ রিসাইক্লিং শিল্পে ব্যালাস্ট ট্যাংক থেকে গ্যাস লিক হয়ে প্রাণহানির এমন ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি।
গত শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ফেরদৌস স্টিলের ইয়ার্ডে একটি এলএনজি ট্যাংকার ভাঙার সময় শ্রমিকরা ব্যালাস্ট ট্যাংকের নিচের অংশে ছিদ্র করে ভেতরের পানি বের করার কাজ করছিলেন। এ সময় ট্যাংকের ভেতরে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাস বেরিয়ে এলে নয় শ্রমিক মারা যান এবং আরও ছয়জন আহত হন। ঘটনার প্রায় চার ঘণ্টা পর বিস্ফোরক অধিদপ্তর ট্যাংকের মুখের কাছে ১০.৮ পিপিএম হাইড্রোজেন সালফাইড শনাক্ত করে। পরে ফায়ার সার্ভিসের হ্যাজমাট দল প্রথম দফায় মিথেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড ও অ্যামোনিয়ার উপস্থিতি পেলেও হাইড্রোজেন সালফাইড শনাক্ত করতে পারেনি।
তবে শনিবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে ভাটার সময় ট্যাংকের কাছে হাইড্রোজেন সালফাইডের মাত্রা ৫০ থেকে ৮০ পিপিএম পাওয়া যায়। গত রোববার সকালেও উচ্চমাত্রার গ্যাস শনাক্ত হওয়ায় তদন্তকারীদের ট্যাংকের কাছে যাওয়া সম্ভব হয়নি। চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক শাহ ইমরান বলেন, 'গ্যাস নির্গমন অব্যাহত থাকলে তদন্ত কমিটির পক্ষে নিরাপদে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা সম্ভব নয়।'
এরপর জাহাজটি ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয় এবং গ্যাস ও ট্যাংকের ভেতরে জমে থাকা স্লাজ অপসারণের জন্য বিশেষজ্ঞ দল আনার সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। ট্যাংক পরিষ্কার করে লিখিতভাবে নিরাপদ ঘোষণা করার পর ফায়ার সার্ভিস আবার পরীক্ষা করবে। এরপরই জাহাজটিকে চূড়ান্তভাবে নিরাপদ ঘোষণা করা হবে।
ব্যালাস্ট ট্যাংক কী?
জাহাজের ওজন, ড্রাফট, ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যালাস্ট ট্যাংকে সমুদ্রের পানি রাখা হয়। কার্গো ট্যাংকের মতো এতে সাধারণত তেল, এলএনজি বা অন্য কোনো বাণিজ্যিক পণ্য বহন করা হয় না। চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের গবেষণা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফ উদ্দিন বলেন, 'ব্যালাস্ট ট্যাংকে হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি বিশেষভাবে অস্বাভাবিক। কারণ, গ্যাস-ফ্রি সার্টিফিকেট দেওয়ার সময় সাধারণত যেসব স্থানে বিপজ্জনক গ্যাস বা কার্গোর অবশিষ্টাংশ থাকার সম্ভাবনা থাকে, সেসব স্থানই বেশি গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষা করা হয়।'
জাহাজ ভাঙার কাজে প্রায় চার দশকের অভিজ্ঞতা থাকা বিচিং মাস্টার ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে ব্যালাস্ট ট্যাংক থেকে গ্যাস নির্গত হয়ে প্রাণহানির ঘটনা তিনি আগে দেখেননি। তার মতে, জাহাজ ইয়ার্ডে পৌঁছানোর পর ব্যালাস্ট ট্যাংকসহ সব বদ্ধ জায়গার হ্যাচ ও ঢাকনা খুলে দেওয়া উচিত, যাতে ভেতরে কোনো গ্যাস থাকলে তা বেরিয়ে যেতে পারে এবং তাজা বাতাস ঢুকতে পারে।
ফেরদৌস স্টিলের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই জাহাজের আটটি ব্যালাস্ট ট্যাংকের মধ্যে তিনটি একই পদ্ধতিতে আগেই ভাঙা হয়েছিল। সেগুলোতে গ্যাস-সংক্রান্ত কোনো সমস্যা হয়নি। ফলে দুর্ঘটনার শিকার ট্যাংকটিতে কী ধরনের পরিবর্তন হয়েছিল, সেটিই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
কীভাবে তৈরি হতে পারে হাইড্রোজেন সালফাইড?
হাইড্রোজেন সালফাইড সাধারণত অক্সিজেনস্বল্প পরিবেশে জৈব পদার্থ পচে গেলে তৈরি হতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে অপর্যাপ্ত বায়ু চলাচল থাকা কোনো বদ্ধ স্থানে স্লাজ, পলি বা পচনশীল পদার্থ জমে থাকলে এমন গ্যাস তৈরির পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমানের মতে, ট্যাংকের ভেতরে স্লাজ, পলি বা অন্য কোনো পচনশীল পদার্থ ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা জরুরি।
এলএনজি, এলপিজি ও রাসায়নিকবাহী জাহাজ রিসাইক্লিংয়ের আগে বিশেষ প্রক্রিয়ায় পরিষ্কার করা হয়। এ সময় তৈরি হওয়া বর্জ্য বা দূষিত পানি সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না করা হলে তা পরবর্তী সময়ে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে ট্যাংকের ভেতরে হাইড্রোজেন সালফাইড কীভাবে তৈরি হয়েছে, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়। পচনশীল পদার্থ জমে থাকার বিষয়টি তদন্তের একটি সম্ভাব্য কারণ মাত্র। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, জোয়ার-ভাটার সঙ্গে গ্যাসের মাত্রা কেন পরিবর্তিত হচ্ছে। পানির উচ্চতা বা চাপের পরিবর্তনের কারণে ট্যাংকের ভেতরে আটকে থাকা গ্যাস বাইরে বেরিয়ে আসছে কি না, সেটিও তদন্তকারীদের দেখতে হবে।
গ্যাস-ফ্রি সার্টিফিকেট কি যথেষ্ট?
দুর্ঘটনা কবলিত জাহাজটি রিসাইক্লিংয়ের আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাস-ফ্রি সার্টিফিকেট পাওয়ার অর্থ এই নয় যে কোনো বদ্ধ স্থান অনির্দিষ্টকাল নিরাপদ থাকবে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকা ট্যাংকে কাজ শুরুর ঠিক আগে এবং কাজ চলাকালীন গ্যাসের মাত্রা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরীর মতে, জাহাজ ইয়ার্ডে পৌঁছানোর পরই ব্যালাস্ট ট্যাংক ও অন্যান্য বদ্ধ স্থান খুলে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা করা উচিত।
তদন্তে আরও যেসব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে
শিল্প মন্ত্রণালয় গ্যাসের উৎস ও প্রকৃতি শনাক্ত করতে এবং ঝুঁকি দূর করার সুপারিশ দিতে তিন সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল গঠন করেছে। দলের সদস্যরা হলেন বুয়েটের অধ্যাপক ড. মো. ইসার আফরাত খান, বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির পরিচালক ক্যাপ্টেন মো. শোয়েব আহমেদ এবং বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক মোহাম্মদ মেহেদী ইসলাম খান।
তদন্তকারীদের জাহাজটির ক্লিনিং সার্টিফিকেট, ট্যাংক পরিষ্কার ও ব্যালাস্ট পানির রেকর্ড, স্লাজ অপসারণের নথি এবং পরিদর্শন প্রতিবেদন পরীক্ষা করতে হবে। এছাড়া ভাটার সময় হাইড্রোজেন সালফাইডের মাত্রা কেন বেড়ে গেল, কাজ চলাকালীন গ্যাস পর্যবেক্ষণ অব্যাহত ছিল কি না এবং শ্রমিকদের পর্যাপ্ত শ্বাস-সুরক্ষা সরঞ্জাম দেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের অংশ। প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান বলেন, দীর্ঘ সময় স্থির পানি বা অবশিষ্ট পদার্থ পড়ে থাকলে ব্যালাস্ট ট্যাংক পরিষ্কার ও বায়ু চলাচলের বর্তমান পদ্ধতি যথেষ্ট কি না, সেটিও মূল্যায়ন করা দরকার। তদন্তের ফলেই শেষ পর্যন্ত জানা যাবে, এই দুর্ঘটনা ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত কোনো ঘটনা, নাকি জাহাজ পরিষ্কার, সার্টিফিকেশন, বায়ু চলাচল, গ্যাস পরীক্ষা কিংবা কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তায় কোনো ঘাটতির ফল।
