সীতাকুণ্ডে গ্যাস লিকেজ হওয়া সেই জাহাজের আরও ৩ ট্যাংকে বিষাক্ত গ্যাস শনাক্ত
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডের সেই জাহাজের আরও তিনটি ব্যালাস্ট ট্যাংকে বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস এবং কালো স্লাজ শনাক্ত করা হয়েছে। গত শুক্রবার এই ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসের প্রতিক্রিয়ায় ৯ জন শ্রমিক নিহত হওয়ার পর মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) তদন্ত দল ও বিশেষজ্ঞ কমিটির যৌথ পরিদর্শনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
পরিদর্শনকালে তদন্ত দল জাহাজের মোট আটটি ব্যালাস্ট ট্যাংকের ওপরের ও নিচের স্তরের পানির নমুনা সংগ্রহ করে। এর মধ্যে তিনটি ট্যাংকে ঘন কালো স্লাজ পাওয়া গেছে। পরিদর্শনে জাহাজের খোলা জায়গায় কোনো হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের অস্তিত্ব পাওয়া না গেলেও, নমুনা সংগ্রহের সময় পানি নাড়াচাড়া করায় তিনটি ট্যাংকের ভেতরে ৮ থেকে ১৮ পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন) গ্যাসের উপস্থিতি রেকর্ড করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসটি পানির সঙ্গে মিশ্রিত অবস্থায় রয়েছে। পানি স্থির থাকলে এই গ্যাস বের হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকলেও, পানি ও স্লাজ অপসারণের সময় এটি আবার ছড়িয়ে পড়তে পারে। সংগৃহীত নমুনাগুলো পরীক্ষার জন্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। এই পরীক্ষার মাধ্যমেই স্লাজের প্রকৃতি এবং পানিতে থাকা ক্ষতিকর রাসায়নিকের সঠিক মাত্রা জানা যাবে।
তদন্ত দলের সদস্য ও পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক জমির উদ্দিন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'সারাদিন ধরে জাহাজটি কয়েকবার পরিদর্শন করা হয়েছে। বর্তমানে জাহাজের খোলা জায়গায় কোনো গ্যাস নেই। তবে নমুনা সংগ্রহের সময় তিনটি ট্যাংকে হাইড্রোজেন সালফাইড পাওয়া গেছে। পানিতে স্লাজ বা তলানিও দেখা গেছে। নমুনাগুলো বুয়েট এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষার পর আমরা তলানির প্রকৃতি এবং পানিতে হাইড্রোজেন সালফাইডের পরিমাণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারব।'
তদন্ত দলের আরেক সদস্য ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, 'ল্যাব রিপোর্ট পাওয়ার পর 'প্রান্তিক মেরিন' নামে একটি প্রতিষ্ঠান ট্যাংকগুলো থেকে পানি ও স্লাজ অপসারণ এবং গ্যাস-মুক্ত করার একটি পরিকল্পনা জমা দেবে। বিশেষজ্ঞ কমিটি সেই পরিকল্পনা পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে যে ওই প্রতিষ্ঠানকে কাজটি দেওয়া হবে কি না।'
বর্তমানে জাহাজের উপরিভাগ নিরাপদ মনে করা হলেও ব্যালাস্ট ট্যাংকের ভেতরে স্লাজ ও গ্যাসের উপস্থিতির কারণে জাহাজে সব ধরনের কাজ স্থগিত রাখা হয়েছে। এদিকে, তদন্ত কর্মকর্তারা গত তিন দিনে শিপব্রেকিং ইয়ার্ডের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার জবানবন্দি নিয়েছেন। তদন্ত কমিটির এক কর্মকর্তা জানান, তদন্ত কাজ প্রায় গুছিয়ে আনা হয়েছে। ল্যাব রিপোর্ট হাতে পেলেই বিষাক্ত গ্যাস ও স্লাজ তৈরির প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, গত শুক্রবার ওই জাহাজের ব্যালাস্ট ট্যাংক থেকে পানি অপসারণের সময় বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিক নিহত এবং অন্তত ৬ জন আহত হন। বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্পের ইতিহাসে এটিই প্রথম কোনো বিষাক্ত গ্যাস লিকেজের ঘটনা। এই ঘটনা তদন্তে বর্তমানে চারটি পৃথক কমিটি কাজ করছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন একটি, শিল্প মন্ত্রণালয় ১১ সদস্যের একটি তদন্ত ও ৮ সদস্যের কারিগরি কমিটি এবং বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইকেলার্স অ্যাসোসিয়েশন ৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে।
