পুলিশের যানবাহনে নাশকতার শঙ্কা: সারা দেশে বিশেষ সতর্কতা জারি সদর দপ্তরের
দেশের সব ইউনিটের পুলিশের যানবাহনকে লক্ষ্য করে সম্ভাব্য নাশকতার আশঙ্কায় বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। বাহিনীর অভ্যন্তরীণ এক নির্দেশনায় জিপ, পিকআপ ও বাসসহ পুলিশের ব্যবহৃত সব ধরনের যানবাহনের নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
যদিও সম্ভাব্য এই হুমকির পেছনে নির্দিষ্ট কোনো সংগঠনের নাম উল্লেখ করা হয়নি, তবে নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বলছেন—সাম্প্রতিক বোমাতঙ্ক, সীমান্তপারের গোয়েন্দা তথ্য এবং ৫ ও ১৫ আগস্টকে ঘিরে সম্ভাব্য অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা থেকেই এই আগাম সতর্কতা।
গত ১ আগস্ট পুলিশ সদর দপ্তরের অপারেশনস কন্ট্রোল শাখা থেকে দেশের সব ইউনিটে একটি জরুরি বার্তা পাঠানো হয়। সেখানে বলা হয়, উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্য বা দুষ্কৃতিকারীরা পুলিশের যানবাহনের ওপর হামলা চালাতে পারে। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় দায়িত্ব পালনকালে বা পার্কিং অবস্থায় থাকা সরকারি যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নির্দেশনায় আরও বলা হয়, কোনো যানবাহন সাময়িকভাবে থামানোর প্রয়োজন হলে তা অবশ্যই নিরাপদ স্থানে রাখতে হবে এবং সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখতে হবে। চালক বা দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য ছাড়া কোনো অবস্থাতেই গাড়ি ফেলে রাখা যাবে না।
রাজধানীসহ সারা দেশে কড়া নজরদারি
সতর্কবার্তা জারির পর রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়ানো হয়েছে। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ ৪৮টি স্থানে অস্থায়ী চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। এ ছাড়া দেশের প্রায় ৮০০টি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা কী পয়েন্ট ইনস্টলেশনের (কেপিআই) নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। রোববার সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে সন্দেহভাজন যানবাহনে পুলিশকে তল্লাশি করতে দেখা গেছে।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, 'এটি বিশেষ কোনো সতর্কতা নয়; নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে নিয়মিতভাবেই এ ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হয়।' তিনি সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানান।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, পুলিশের গাড়িতে হামলার বিষয়ে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো গোয়েন্দা তথ্য নেই। তবে সাম্প্রতিক বোমাতঙ্ক ও সন্দেহজনক বস্তু উদ্ধারের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে একে একটি 'রিমাইন্ডার' বা সতর্কতামূলক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট একাধিক গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, গত কয়েক দিনে বিদেশি অংশীদারদের কাছ থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্যে সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
এই সতর্কতার পেছনে পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক একটি গ্রেপ্তারের ঘটনার যোগসূত্র থাকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। গত ৩১ জুলাই ভারতের বর্ধমানে হামিম ওরফে হামিদ মণ্ডল নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করে বেঙ্গল এসটিএফ। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দাবি, তিনি পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন জয়েশ-ই-মোহাম্মদের সক্রিয় সদস্য এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ওপর হামলার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামিমের ডিজিটাল ডিভাইস থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর ওপর নজরদারির তথ্যও উদ্ধার করা হয়েছে। এই ঘটনায় জড়িত আরেকজন সন্দেহভাজন পলাতক রয়েছেন, যার সঙ্গে বাংলাদেশের উগ্রবাদী নেটওয়ার্কের যোগাযোগ থাকতে পারে বলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা খতিয়ে দেখছেন। তদন্তে উঠে এসেছে যে, আইএসআই-এর মদতে একটি নেটওয়ার্ক গঠন করে বিজেপি ও আরএসএস নেতাদের খবরাখবর সংগ্রহের পরিকল্পনা ছিল হামিমের।
আগস্ট ঘিরে বিশেষ নিরাপত্তা
আগস্ট মাসকে ঘিরে নাশকতার বাড়তি ঝুঁকি দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিশেষ করে ৫ আগস্টকে কেন্দ্র করে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর সম্ভাব্য কর্মসূচি বা ঝটিকা মিছিলের ওপর কড়া নজর রাখা হচ্ছে। এ ছাড়া ১৫ আগস্টের নিরাপত্তা নিয়েও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সতর্ক রয়েছে। তবে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক জানিয়েছেন, ৫ আগস্ট ঘিরে সুনির্দিষ্ট কোনো নাশকতার তথ্য নেই, তবে বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
এদিকে, গত নয় দিনে রাজধানী ও আশুলিয়ায় ধারাবাহিক কয়েকটি বোমা ও বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনা পুলিশের এই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। গত ২৪ জুলাই মতিঝিলে একটি দূরনিয়ন্ত্রিত আইইডি (বিস্ফোরক ডিভাইস) উদ্ধার করা হয়। এরপর আশুলিয়ায় প্রেশার কুকার আকৃতির বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার করে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট। মিরপুর-১০ ও ফার্মগেটেও সন্দেহজনক বস্তু ঘিরে আতঙ্ক ছড়ালেও সেখানে কোনো বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া সাম্প্রতিক অভিযানে অস্ত্র, ককটেল ও পেট্রোলবোমা উদ্ধারের ঘটনাগুলোকেও সামগ্রিক নিরাপত্তার হুমকিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
রোববার রাজশাহীতে এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, 'সাম্প্রতিক বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের প্রতিটি ঘটনা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের হার তুলনামূলক কম। তবুও সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।'
