চাঁদা না পেয়ে কৃষকের ১২০০ ফলদ গাছ কেটে ফেলার অভিযোগ বন বিভাগের বিরুদ্ধে, তদন্তে প্রশাসন
চাঁদা না দেয়ায় অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের নামে মৌলভীবাজারে এক কৃষকের উৎপাদিত প্রায় ১ হাজার ২০০টি কমলা ও মাল্টার গাছ কেটে ফেলার অভিযোগ উঠেছে বন বিভাগের বিরুদ্ধে। তবে বন বিভাগের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষিত বনের জমি অবৈধভাবে দখল করে কমলার বাগান, বিভিন্ন স্থাপনা এবং একটি পুকুর তৈরি করা হয়েছিল। অভিযানের মাধ্যমে এসব অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করে জমি পুনরায় বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে ভুক্তভোগী কৃষক বলছেন, বন বিভাগের কাছ থেকে অনুমতি নিয়েই তারা কমলা ও মাল্টার চাষ করেছিলেন। আর মাত্র কয়েক মাস পরেই গাছে ফল পরিপক্ব হতো; কিন্তু তার আগেই গাছগুলো কেটে ফেলা হয়েছে।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি বন রেঞ্জের আদমপুর বন বিটের কালিঞ্জি এলাকায় এই ঘটনাটি ঘটেছে। এ নিয়ে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হলে সিলেটের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারকে প্রধান করে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। গত বৃহস্পতিবার কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
এর আগে গত ১৬ জুলাই রাজকান্দি রেঞ্জের অধীন আদমপুর বিটের কালিঞ্জি বসতি এলাকায় বন বিভাগ, উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের যৌথ অভিযানে প্রায় পাঁচ একর সংরক্ষিত বনভূমি দখলমুক্ত করার কথা জানানো হয়।
জানা যায়, প্রায় আট বছর আগে পাহাড়ি ওই এলাকায় কমলা ও মাল্টার চারা রোপণ শুরু করেন সালমা বেগম ও তার স্বামী আলিম উল্লাহ। দীর্ঘ পরিশ্রমের পর সেখানে গড়ে ওঠে একটি বিশাল ফলের বাগান। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, আর মাত্র তিন মাস পর বাগান থেকে প্রায় ২৫ থেকে ২৬ লাখ টাকার কমলা বিক্রি করা সম্ভব হতো। বাগানের গাছগুলোতে ইতিমধ্যেই হাজার হাজার ফল ধরেছিল। কিন্তু ফল পরিপক্ব হওয়ার আগেই উচ্ছেদ অভিযানের নামে কেটে ফেলা হয় প্রায় ১ হাজার ২০০টি গাছ।
বাগানের মালিক আলিম উল্লাহর অভিযোগ, বন বিভাগের লোকজনকে চাঁদা না দেওয়ায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার বাগানটি ধ্বংস করা হয়েছে।
আলিম উল্লাহ বলেন, 'বন বিভাগের অনুমতি নিয়েই ২০১৮ সালে আমরা কমলা ও মাল্টার বাগান করি। আট বছর ধরে শ্রম ও অর্থ বিনিয়োগ করেছি। বাগানে ফলন আসার পরপরই গাছগুলো কেটে ফেলা হয়েছে। বন বিভাগের লোকজনকে চাঁদা না দেওয়ায় এই সর্বনাশ করা হয়েছে।'
একই অভিযোগ সালমা বেগমেরও। তার দাবি, আশপাশে অন্য চাষিদের আরও বাগান থাকলেও সেগুলো উচ্ছেদ না করে শুধুমাত্র তাদের বাগানটিই ধ্বংস করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের আরও অভিযোগ, গাছ কাটার পাশাপাশি বাগানের সেচকাজে ব্যবহৃত জলসেচ যন্ত্রটিও (মেশিন) ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে।
তবে চাঁদা দাবির এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে বন বিভাগ। তাদের দাবি, সংরক্ষিত বনভূমিতে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা বাগান উচ্ছেদের অংশ হিসেবেই নিয়মতান্ত্রিকভাবে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
কমলগঞ্জ রাজকান্দি রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক প্রীতম বড়ুয়া বলেন, 'সংরক্ষিত বনভূমিতে অবৈধ দখল উচ্ছেদের অংশ হিসেবে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। চাঁদা দাবির যে অভিযোগ করা হয়েছে, তা সত্য নয়।'
গত বৃহস্পতিবার তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আশরাফুর রহমান, কমিটির সদস্য সিলেট বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক আব্দুর রহমান এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শাহিনা আক্তার ক্ষতিগ্রস্ত বাগানটি পরিদর্শন করেন।
কমিটির প্রধান আশরাফুর রহমান শনিবার বলেন, 'এখানে কিছু গাছ কাটা হয়েছে। আমরা সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য রেকর্ড করেছি এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করেছি। দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেওয়া হবে।'
তিনি আরও জানান, তদন্তে ঘটনার প্রকৃত কারণ, দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা এবং আইনগত দিকগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হবে।
