বেনাপোল বন্দর দিয়ে রপ্তানি কমলো প্রায় ২ লাখ টন, সংকটে সিঅ্যান্ডএফ-শ্রমিকেরা
সরকার পরিবর্তনের প্রায় দুই বছর পার হলেও বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ভারতের আরোপিত বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা ও শর্ত প্রত্যাহার হয়নি। এর প্রভাব পড়েছে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে রপ্তানি বাণিজ্যে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় বন্দরটি দিয়ে রপ্তানি কমেছে প্রায় এক লাখ ৮৯ হাজার ৩৫৮ টন।
এতে দেশের রপ্তানি বাণিজ্য ও অর্থনীতি ক্ষতির মুখে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বন্ধ হয়ে গেছে কয়েকটি সিএন্ডএফ এজেন্ট ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠান, বেকার হয়ে পড়েছেন তাদের কর্মচারীরা।
ফলে বেনাপোল ও পেট্রাপোল বন্দর এলাকায় পরিবহন, গুদাম, হ্যান্ডলিং, শ্রমিক ও ব্যবসায় স্থবিরতা ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলেছে দুই দেশের বন্দর এলাকায়।
বেনাপোল বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, ১ জুলাই থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত ১৩ কর্মদিবসে ভারত থেকে দেশে বিভিন্ন ধরনের পণ্য নিয়ে তিন হাজার ৩৮টি ভারতীয় ট্রাক প্রবেশ করলেও, দেশ থেকে ভারতে রপ্তানি হয়েছে মাত্র ৭৫৩ ট্রাক পণ্য।
আগে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন ভারত থেকে প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ ট্রাক পণ্য আমদানি এবং ২৫০ থেকে ৩০০ ট্রাক পণ্য রপ্তানি হতো। এখন আমদানি নেমে এসেছে ২০০ থেকে ৩০০ ট্রাক। একইভাবে রপ্তানি নেমে এসেছে দিনে ১০০ ট্রাকের নিচে।
বন্দরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বেনাপোল বন্দর দিয়ে দেশি পণ্য ভারতে রপ্তানির পরিমাণ ছিল চার লাখ ৫৬ হাজার ৬৭২ টন বিভিন্ন ধরনের পণ্য। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারতে রপ্তানি হয়েছে তিন লাখ ৮১ হাজার ৪৪০ টন পণ্য।
২০২৩-২৪ অর্থবছরের চাইতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসে রপ্তানি কমেছে ৭৫ হাজার ২৩২ টন। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছে এক লাখ ৮৯ হাজার ৩৫৮ মেট্রিক টন। যা গত বছরের তুলনায় কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯২ হাজার ৮২ টনে।
রপ্তানি পণ্যের মধ্যে ছিল পাট, পাটের তৈরি পণ্য, তৈরি পোশাক, কেমিক্যাল, বসুন্ধরা টিস্যু, মেলামাইন, মাছ উল্লেখযোগ্য। কিন্তু দুই দেশের সরকারের বিধিনিষেধের কারণে আগের তুলনায় বর্তমানে তা শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, ভারত-বাংলাদেশের পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞায় দেশের সর্ববৃহৎ বেনাপোল স্থলবন্দরে বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতি ও সংকট তৈরি হয়েছে। বৈশ্বিক মন্দা আর গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর একের পর এক দুইদেশের পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞায় ধস নামে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে।
ভারত থেকে যেমন কমে আসছে আমদানিকৃত পণ্যবাহী ট্রাকের সংখ্যা, তেমনি রপ্তানির ট্রাকও কমে আসছে। এতে গভীর সংকটে পড়েছেন বেনাপোলের কয়েকশো' সিএন্ডএফ এজেন্ট মালিক, কর্মচারী ও বেনাপোল স্থলবন্দরে কর্মরত এক হাজারের বেশি শ্রমিক।
ভারত সরকারের আরোপিত শর্ত ও নিষেধাজ্ঞার কারণেই আমদানি-রপ্তানিতে এমন অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, স্থলপথে যেসব পণ্য আমদানি-রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সেগুলো আবার চালু করা হোক।
বাণিজ্যিক সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে ভারত সরকারের নিষেধাজ্ঞায় ২০২৫ সালের ৮ এপ্রিল থেকে ভারতের আকাশ পথ ব্যবহার করে বাইরের দেশে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানি বন্ধ রয়েছে।
অপরদিকে, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের দাবিতে দেশীয় শিল্প রক্ষার কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশ সরকার স্থলপথে ভারত থেকে সুতা আমদানি নিষিদ্ধ করেছে। পরে একই বছরের ১৭ মে ভারত সরকার আরেকটি নিষেধাজ্ঞায় গার্মেন্টস, তৈরি পোশাক, তুলা, সুতির বর্জ্য, প্লাস্টিক, কাঠের তৈরি আসবাবপত্র ও ফল জাতীয় পণ্য স্থলপথে রপ্তানি বন্ধ করে দেয়।
ওই বছরের ২৬ জুন পাট ও পাট তৈরি পণ্য স্থলপথে রপ্তানি বন্ধ করে ভারত। সবশেষ ১১ আগস্ট নতুন করে বস্ত্র ও পাটজাত চার ধরনের পণ্য স্থলবন্দর ব্যবহার করে আমদানিতে না করেছে ভারত।
এগুলো হলো- পাট কিংবা অন্য কোনো ধরনের উদ্ভিজ্জ তন্তু থেকে উৎপাদিত কাপড়, পাট দিয়ে তৈরি দড়ি, রশি, সুতলি ইত্যাদি অন্য তন্তু দিয়ে তৈরি দড়ি, রশি, সুতলি এবং পাটের বস্তা ও ব্যাগ।
বেনাপোল আমদানি-রপ্তানি সমিতির সহ-সভাপতি আমিনুল হক বলেন, 'দেশে নতুন গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরও ভারত এসব নিষেধাজ্ঞা ও শর্ত প্রত্যাহার করেনি। ফলে বেনাপোল বন্দর দিয়ে রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধরনের ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে।'
বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের দপ্তর সম্পাদক মোস্তাফিজ্জোহা সেলিম বলেন, 'ভারত বাধা হয়ে দাঁড়ালে বিকল্প বাজার খুঁজতে হবে। দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে ভারতের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং একই সঙ্গে বিকল্প বাজার সম্প্রসারণে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছি।'
বেনাপোল ল্যান্ডপোর্ট ইমপোর্টাস অ্যান্ড এক্সপোটার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মতিয়ার রহমান বলেন, 'ভারত-বাংলাদেশ-নেপাল-ভুটান ট্রানজিট সুবিধা কার্যকরভাবে ব্যবহার করে নেপাল ও ভুটানে দেশি পণ্যের রপ্তানি বাড়ানো গেলে বর্তমান বাণিজ্য ঘাটতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। এছাড়া স্থলপথে যে সব পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে সেগুলো পুনরায় চালু করা।'
বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) শামিম হোসেন বলেন, 'এ বন্দর দিয়ে ভারত-বাংলাদেশের সিংহভাগ বাণিজ্য সম্পন্ন হলেও দেশের রাজনৈতিক পালাবদলের পর কমেছে পণ্যবাহী ট্রাক আসা-যাওয়া। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বাণিজ্য কমে গেছে।'
তিনি বলেন, 'বাণিজ্যের পরিমাণ কমে আসায় বন্দর দিয়ে সরকারের রাজস্ব আয়েও প্রভাব পড়েছে। এতে শুধু বাংলাদেশের নয়, ভারতেরও ক্ষতি হচ্ছে।'
তিনি আরও বলেন, 'দুই দেশের পক্ষ থেকে আরোপিত নানা বিধি-নিষেধই বাণিজ্যের এ ধসের মূল কারণ। রপ্তানি বাণিজ্য বাড়াতে দুই দেশের সরকারি পর্যায়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।'
এ ব্যাপারে যশোর চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মিজানুর রহমান খান বলেন, 'কূটনৈতিকভাবে স্থলপথে যে সব পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, সেগুলো পুনরায় চালু করতে সরকারকে উদ্যাগ নিতে হবে। তা না হলে বিকল্প দেশের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণে উদ্যোগ নিতে হবে।'
তিনি আরও বলেন, 'এক্ষেত্রে ভারত-বাংলাদেশ-নেপাল-ভুটান ট্রানজিট সুবিধা কার্যকরভাবে ব্যবহার করে আমাদের দেশে উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি করার সুযোগ রয়েছে।'
