রুপির পতন ঠেকাতে বিশেষ আমানত কর্মসূচিতে ভারতের প্রায় ১ হাজার কোটি ডলার সংগ্রহ
প্রবাসী ভারতীয়দের জন্য ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক—রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই) বিশেষ আমানত কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় এক হাজার কোটি ডলারের তহবিল আকর্ষণ করতে পেরেছে। এই বিষয়ে অবগত দুটি সূত্র বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছে, এই পদক্ষেপটি দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে এবং রুপির মান ধরে রাখার প্রচেষ্টাকে বড় ধরনের সহায়তা জোগাচ্ছে।
আরবিআই গত ৫ জুনের মুদ্রানীতি সভায় অনিবাসী ভারতীয়দের (এনআরআই) কাছ থেকে সংগৃহীত আমানতের বিপরীতে একটি 'জিরো-কস্ট' বা শূন্য-ব্যয় বৈদেশিক মুদ্রা অদল-বদল (সোয়াপ) সুবিধা ঘোষণা করে। এর ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এ ধরনের আমানতের ওপর উচ্চ মুনাফা বা রিটার্ন দেওয়ার সুযোগ পায়।
পরবর্তীতে গত ২৩ জুনের একটি স্পষ্টীকরণে, ব্যাংকগুলোকে এই আমানতের বিপরীতে ঋণ দেওয়ার এবং সেগুলোর ওপর লিয়েন (স্বত্বাধিকার) আরোপের অনুমতি দেওয়া হয়। এর ফলে লিভারেজ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়, যা এই কর্মসূচিকে প্রবাসীদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
এই স্পষ্টীকরণের পর গত সপ্তাহে তহবিল আসার গতি আরও বেড়েছে বলে প্রথম সূত্রটি জানিয়েছে। তিনি আরও জানান যে, এই প্রবাহের বেশিরভাগই সম্ভবত 'ব্যাক-এন্ডেড' বা মেয়াদের শেষের দিকে আসবে, কারণ ব্যাংকগুলোর আমানত সংগ্রহের জন্য আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার আনুষ্ঠানিক অনুমতি না থাকায় উভয় সূত্র বা কর্মকর্তাই নিজেদের নাম প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য রয়টার্সের পক্ষ থেকে পাঠানো ইমেইলের তাৎক্ষণিক কোনো জবাব দেয়নি আরবিআই।
এপর্যন্ত সংগৃহীত এই তহবিল— এই কর্মসূচির অধীনে প্রত্যাশিত মোট তহবিলের একটি ভগ্নাংশ মাত্র। অর্থনীতিবিদ এবং ব্যাংকারদের প্রাক্কলন অনুযায়ী, এর মাধ্যমে ৩ থেকে ৬ হাজার কোটি ডলার পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রার আমানত আকর্ষণ করা সম্ভব হতে পারে, যা চলতি অর্থবছরে ভারতের সম্ভাব্য ব্যালেন্স অব পেমেন্টস (লেনদেন ভারসাম্য) ঘাটতি কমিয়ে আনতে বড় ভূমিকা রাখবে।
এই তহবিল প্রবাহ ভারতীয় রুপির জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণিত হতে পারে। বিশ্ববাজারে তেলের ক্রমবর্ধমান দাম এবং চলতি বছরের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক– ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার বাড়াতে পারে—এমন পূর্বাভাসের কারণে রুপি বর্তমানে নতুন করে অবমূল্যায়নের চাপের মুখে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘাতের কারণে ব্রেন্ট ক্রুড বা অপরিশোধিত তেলের দাম সাম্প্রতিক সর্বনিম্ন স্তর থেকে ২০ শতাংশের বেশি বেড়ে গেছে, যা ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্য অর্থনীতির জন্য নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
আরবিআইয়ের এই বিশেষ পদক্ষেপের পর রুপির মান শক্তিশালী হয়ে প্রতি মার্কিন ডলারে প্রায় ৯৪ রুপিতে উঠলেও, গত মঙ্গলবার তা আবারও দুর্বল হয়ে ৯৬-এর ঘর ছাড়িয়ে যায়। বর্তমানে প্রতি ডলারে প্রায় ৯৬.১৪ রুপিতে নেমে যাওয়া—এই মুদ্রাটি এখন তার ইতিহাসের সর্বকালের সর্বনিম্ন স্তর ৯৬.৯৬ রুপি থেকে মাত্র ১ শতাংশেরও কম দূরত্বে অবস্থান করছে।
শুরুর দিকের কিছু চ্যালেঞ্জ
তবে প্রবাসী ভারতীয়দের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহের ক্ষেত্রে ব্যাংকাররা কিছু চ্যালেঞ্জের কথাও তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, আরবিআই-এর ২৩ জুনের স্পষ্টীকরণ লিভারেজড আমানত কাঠামোর পথ সুগম করার পর ডলার ধার করার খরচ ২৫ থেকে ৪০ বেসিস পয়েন্ট বেড়ে গেছে।
অর্থায়নের এই উচ্চ ব্যয় সরাসরি ব্যাংকগুলোর আমানতকারীদের দেওয়া রিটার্ন বা মুনাফাকে কমিয়ে দেয়, যা সম্ভাব্যভাবে এই কর্মসূচির আকর্ষণ হ্রাস করতে পারে।
একজন ব্যাংকার জানিয়েছেন, ঋণদাতারা বৈশ্বিক বা বিদেশী অর্থায়ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন; বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও জাপানের ব্যাংকগুলো দেশ-নির্দিষ্ট ঝুঁকির সীমার কারণে নতুন তহবিল জোগানে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছে।
ওই ব্যাংকার বলেন, "ধারণা করা হয়েছিল যে মধ্যপ্রাচ্য এই কর্মসূচির জন্য পুঁজির অন্যতম বড় উৎস হবে।" তবে এখন মনে হচ্ছে, সিঙ্গাপুর বা হংকংয়ে বসবাসরত অনিবাসীরাই এতে মূল নেতৃত্ব দেবেন বলে তিনি যোগ করেন।
ভারতের মাঝারি সারির দুটি ব্যাংকের দুজন নির্বাহী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সমস্যাটি কেবল উচ্চ ব্যয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং অতিরিক্ত খরচের কারণে তারা কার্যত বাজার প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়েছেন।
এ ছাড়া, বিদেশ থেকে অর্জিত সুদের আয়ের ওপর কর বা ট্যাক্স ধার্যের বিষয়টি একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে রয়েছে, বিশেষ করে যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী অনিবাসীদের জন্য।
যদিও এই ধরনের আমানত থেকে অর্জিত সুদ ভারতে সম্পূর্ণ করমুক্ত, তবে উভয় দেশই (যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র) এই আয়কে করযোগ্য বলে গণ্য করে, যা প্রবাসীদের কর-পরবর্তী প্রকৃত রিটার্ন বা মুনাফা অনেকটাই কমিয়ে দেয়।
আরবিআইয়ের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক
আরও তিনজন ব্যাংকার রয়টার্সকে জানিয়েছেন, আরবিআইয়ের গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রা আজ মঙ্গলবার সরকারি ও বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর জ্যেষ্ঠ নির্বাহীদের সঙ্গে একটি বৈঠক করছেন, যেখানে এই স্কিম বা কর্মসূচির সামগ্রিক অগ্রগতি ও উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এর আগে গত সোমবার ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয় এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে একটি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকে ঋণদাতারা জানান যে, এই কর্মসূচির প্রতি প্রবাসীদের ব্যাপক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে সিঙ্গাপুর ও হংকংয়ে বসবাসরত ভারতীয়দের কাছ থেকে জোরালো সাড়াও পাওয়া যাচ্ছে।
