মিরসরাইয়ে বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজ শেষের আগেই প্রায় ১৩০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ, সম্ভাবনা ২.৯ বিলিয়ন ডলারের
বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) তথ্যমতে, প্রকল্প উন্নয়নের কাজ শেষ হওয়ার আগেই জুলাই মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত ১৩০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এসেছে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে অবস্থিত বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে। এরই সময়ে অঞ্চলটির চালু শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ৫২.৮২ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। আর এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে ৫ হাজার ৭৪ জন বাংলাদেশি নাগরিকের।
বেপজার কর্মকর্তারা জানান, দেশের শিল্পায়ন, পণ্য বহুমুখীকরণ ও কর্মসংস্থানে নতুন সম্ভাবনার সূচনা করেছে এই অর্থনৈতিক অঞ্চল। প্রচলিত তৈরি পোশাক খাতের পাশাপাশি জুতা, ড্রোনের মতো উচ্চ প্রযুক্তির পণ্য, ওষুধ সামগ্রী বা অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (এপিআই) এবং পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক নানা বৈচিত্র্যময় পণ্য উৎপাদনের বিশাল কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে এই শিল্পাঞ্চল।
ইজারা, বিনিয়োগ ও প্রকল্প সমাপ্তি
১৬ জুলাই চীনের হুয়ারুন টেক্স কোম্পানি লিমিটেড বেপজা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে জমি ইজারা চুক্তিতে সই করেছে। কোম্পানিটি বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে একটি টেক্সটাইল প্ল্যান্ট স্থাপনে ৩০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে।
বেপজার তথ্য অনুযায়ী, এ চুক্তির মধ্য দিয়ে দেশি-বিদেশি মোট ৬৩টি প্রতিষ্ঠান এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের জন্য ইজারা চুক্তি সম্পন্ন করেছে। তাদের প্রস্তাবিত মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ১.৪৯ বিলিয়ন ডলার।
ইতিমধ্যে ১২টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছে। এছাড়া আরও ৩টি প্রতিষ্ঠান পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু করেছে, যারা দ্রুতই মূল রপ্তানি প্রক্রিয়ায় যুক্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে মোট ৫৩৯টি শিল্প প্লট ও দুটি ছয়তলা কারখানা ভবন রয়েছে। এর মধ্যে ৩৬০টি প্লট ও একটি কারখানা ভবন ৫৯টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এখানকার বেশিরভাগ প্লটই ইজারা দেওয়া হয়ে গেছে। পাইপলাইনে রয়েছে আরও বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান, যার মধ্যে ৩৫ থেকে ৪০টি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের জন্য নিবিড় যোগাযোগ করছে।
গত জুনে মিরসরাইয়ে বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। ২০১৮ সালে ১ হাজার ৩০২ কোটি ৯১ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে এর কাজ শুরু হয়। তিন বছর মেয়াদ বাড়ানোর পর শেষপর্যন্ত বরাদ্দ বাজেটের চেয়ে ১৬৩ কোটি টাকা কম ব্যয়ে প্রকল্পটির কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
বেপজার কর্মকর্তারা জানান, অর্থনৈতিক অঞ্চলটি পুরোপুরি চালু হলে এখানে প্রায় ২.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। সবগুলো প্রতিষ্ঠান যখন তাদের পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতা অর্জন করবে, তখন এই অঞ্চল থেকে বার্ষিক ৪-৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় সম্ভব হবে। একইসাথে এটি প্রায় ৫ লাখ বাংলাদেশি নাগরিকের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে ।
শীর্ষ রপ্তানিকারক ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী প্রতিষ্ঠান
এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে রপ্তানি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি উভয় ক্ষেত্রেই এককভাবে শীর্ষ স্থান দখল করে নিয়েছে কাইজি লঞ্জারি বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠানটি এই অঞ্চলে ১৮.৯১ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। ইতিমধ্যে তারা ৩৪.৫৬ মিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে। এই কারখানায় ৩ হাজার ৬৫১ জন বাংলাদেশির কর্মসংস্থানের হয়েছে, যা এ অর্থনৈতিক অঞ্চলের মোট কর্মসংস্থানের অর্ধেকেরও বেশি।
এই অঞ্চল থেকে প্রথম রপ্তানি শুরু করা প্রতিষ্ঠান কেপিএসটি শুজ (বিডি) ৫.৬৩ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যে ৯.১ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ফুটওয়্যার অ্যাকসেসরিজ রপ্তানি করেছে। প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে ২২০ জন কর্মী কাজ করছেন।
অন্যদিকে মিংদা (বাংলাদেশ) নিউ ম্যাটেরিয়াল কোম্পানি ৪.৪৮ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে ২.৭ মিলিয়ন ডলার মূল্যের টেক্সটাইল, ব্যাগ ও হাসপাতালের সরঞ্জাম রপ্তানি করেছে। প্রতিষ্ঠানটি ১৪৭ জনের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে।
ফেংকুন কম্পোজিট ম্যাটেরিয়াল কোম্পানি ২.২১ মিলিয়ন ডলারের অপেক্ষাকৃত কম বিনিয়োগ নিয়ে চমৎকার দক্ষতা দেখিয়েছে। তারা ইতিমধ্যেই বিনিয়োগের অঙ্ককে ছাড়িয়ে ৩.০৯ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে এবং ৪৬ জনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে।
ফুটওয়্যার ও গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ খাতের অন্যতম দুটি প্রতিষ্ঠান জিবিন টেকনোলজি (বিডি), তাইশেং (বাংলাদেশ) ওয়েবিং কোম্পানি, ভারনন অ্যান্ড অলিভার ফার্নিচার ও গুডউডও (ঢাকা) ফুটওয়্যার অ্যাকসেসরিজ, আসবাব ও চিকিৎসা সামগ্রী উৎপাদন এবং কয়েকশো বাড়তি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে অবদান রাখছে।
বিভিন্ন দেশ থেকে আসন্ন বিনিয়োগ
ইজারা নেওয়া ৬২টি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ প্রস্তাব বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উদ্যোক্তারা বিপুল বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগের প্রস্তাব নিয়ে এসেছে চীন।
চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম শীর্ষ বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান আলপেন বানিয়ান গার্মেন্টস বিডি, যাদের প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ ১০৮.৯৯ মিলিয়ন ডলার। এছাড়া অন্যান্য চীনা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে টেক্সটাইল ও হাসপাতাল খাতে মিংদা (বাংলাদেশ) নিউ ম্যাটেরিয়াল ৭৬.৪১ মিলিয়ন ডলার, পোশাক খাতে কাইজি লঞ্জারি বাংলাদেশ ৬০.৮৫ মিলিয়ন ডলার ও জুতা উৎপাদন খাতে তাই মা শুজ (বিডি) ৫৫.০৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে।
বিনিয়োগের দৌড়ে বেশ এগিয়ে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়াও। দেশি-বিদেশি যৌথ ও একক বিনিয়োগের ভিড়ে দক্ষিণ কোরিয়ার একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পার্ক হ্যান্ডব্যাগ বড় অঙ্কের বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। সব ধরনের হ্যান্ডব্যাগ, ব্যাকপ্যাক ও পোশাক তৈরির লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮০ মিলিয়ন ডলার।
হংকং (চীন) থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি এসেছে। এর মধ্যে ক্যাম্পভ্যালি চট্টগ্রাম ক্যাম্পিং সরঞ্জাম ও পোশাক তৈরির জন্য ৫৪ মিলিয়ন ডলার এবং হংকং ও ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসের যৌথ উদ্যোগ নোভা ইন্টিমা লিমিটেড নারীদের পোশাক তৈরিতে ২৮.০৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে।
শ্রীলঙ্কার ইউনিভোগ গার্মেন্টস বড় পরিসরে তৈরি পোশাক উৎপাদনের জন্য ৩৬.৪৯ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে।
উচ্চ প্রযুক্তির আগমন
বেপজা জানিয়েছে, হাইটেক ও অপ্রচলিত খাতের চারটি প্রতিষ্ঠান এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ করছে।
বিনোদনমূলক খেলনা ড্রোন, মাছ ধরার বিশেষায়িত ড্রোন এবং হালকা ওজনের পণ্য সরবরাহকারী ড্রোন তৈরির জন্য চীনা মালিকানাধীন অ্যারোসিন্থ লিমিটেড ৩.৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে।
এই প্রকল্প বাংলাদেশের রপ্তানি ঝুড়িকে বৈচিত্র্যময় করবে এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন খাতকে আরও শক্তিশালী করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ওষুধ খাতের জন্য সংবেদনশীল ও আমদানিনির্ভর কাঁচামাল দেশে উৎপাদনের লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছে চীনা প্রতিষ্ঠান ক্রিসেন্ট হাই টেক কোম্পানি। তারা ৭,৬ মিলিয়ন ডলারের প্রস্তাবিত বিনিয়োগ নিয়ে অর্থনৈতিক অঞ্চলে লিজ চুক্তি করেছে। প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক মানের জীবন রক্ষাকারী ওষুধের প্রধান কাঁচামাল উৎপাদন করবে। এই উদ্যোগ দেশের ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল আমদানির নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোকে বড় ধরনের সহায়তা দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইলেকট্রনিকস ও জ্বালানি খাতের একটি অন্যতম প্রধান উপাদান বিশেষায়িত ব্যাটারি প্লেট উৎপাদনের জন্য ১২.২৪ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব নিয়ে এসেছে চীনা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ প্রথমা পাওয়ার সাপ্লাই লিমিটেড।
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় বিনিয়োগ নিয়ে আন্তর্জাতিক আউটডোর ও অ্যাডভেঞ্চার লাইফস্টাইলের বিশাল বাজার ধরতে ১৫ মিলিয়ন ডলারের বহুমুখী বিনিয়োগের প্রস্তাব নিয়ে এসেছে বেএক্সপ ইন্টারন্যাশনাল।
পরিমাণের চেয়ে মানের ওপর জোর: বেপজার কৌশল
বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জিং পরিবেশ সত্ত্বেও বেপজার বিনিয়োগ প্রবাহ ইতিবাচক রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক (বিনিয়োগ উন্নয়ন) মো. তানভীর হোসেন।
তিনি বলেন, বেপজা শুধু বিনিয়োগের পরিমাণ নয়, মানসম্পন্ন বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্ব দিচ্ছে।বেপজা এখন ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প গড়ে তোলার দিকে জোর দিচ্ছে। 'যখন একটি জুতা কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন আমরা সোলা, ফিতা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক উপাদানের প্রস্তুতকারকদেরও আকৃষ্ট করার চেষ্টা করি, যাতে একটি পূর্ণাঙ্গ সরবরাহ চেইন গড়ে ওঠে এবং উৎপাদন খরচ কমে আসে,' বলেন তিনি।
তৈরি পোশাকের বাইরে বেপজা এখন হালকা প্রকৌশলের মতো রপ্তানিমুখী খাতগুলোকে আকর্ষণ করতে কাজ করছে। কাইজি লঞ্জারি বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শিয়াও হংসি বলেন, তাদের কোম্পানি ইউরোপে বার্ষিক প্রায় ৩ মিলিয়ন ডলার মূল্যের অন্তর্বাস ও সংশ্লিষ্ট আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম রপ্তানি করে। বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক শ্রমশক্তি, শুল্কমুক্ত বাজারে প্রবেশাধিকার ও প্রণোদনার কথা উল্লেখ করার পাশাপাশি তিনি উন্নত লজিস্টিকস, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ ও শিল্প বহুমুখীকরণের তাগিদ দেন।
গ্যাস সংকটে ব্যাহত হচ্ছে কার্যক্রম
ইতিমধ্যে এই অর্থনৈতিক অর্থনৈতিক অঞ্চলে ১৫টি প্রতিষ্ঠান রপ্তানি করলেও এখন এখানে গ্যাস সরবরাহ না থকায় কার্যক্রম পিছিয়ে যাচ্ছে।
গত ৩০ জুন বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্পের স্টিয়ারিং কমিটির এক সভায় কর্তৃপক্ষ গ্যাস সংযোগের জরুরি প্রয়োজনের ওপর জোর দিয়েছে। সরবরাহ দ্রুত করার জন্য বেপজাকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সমন্বয় করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বেপজার নির্বাহী পরিচালক (বিনিয়োগ উন্নয়ন) মো. তানভীর হোসেন বলেন, 'গ্যাস থাকলে আমরা বর্তমানের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বিনিয়োগ আনতে পারতাম।' তিনি আরও বলেন, কাস্টমসের অনেক সেবা এখনও পুরোপুরি অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভেতরে পাওয়া যায় না। ফলে বন্ড নিবন্ধনসহ বিভিন্ন আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত অনুমোদনের জন্য বাইরে যেতে হয়। এতে সময় ও খরচ দুটিই বেড়ে দিচ্ছে।
