টানা বৃষ্টিতে বিদ্যুতের চাহিদা কমলেও বৈরী আবহাওয়ার কারণে লোড-শেডিং অব্যাহত
গত এক সপ্তাহের টানা বৃষ্টিতে চাপের মুখে থাকা বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। বিদ্যুতের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় লোড-শেডিং প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
তবে সরবরাহ পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক হলেও ঢাকার কিছু অংশসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্রাহকেরা এখনো মাঝেমধ্যে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মুখে পড়ছেন।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, উল্লেখযোগ্য কোনো সরবরাহ ঘাটতি না থাকলেও সঞ্চালন ও বিতরণ নেটওয়ার্কে আবহাওয়াজনিত ত্রুটির কারণে দেশের কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে।
ভারী বৃষ্টি, বজ্রঝড় ও বজ্রপাতের কারণে বৈদ্যুতিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কোথাও গাছ ভেঙে বিদ্যুৎ লাইনের ওপর পড়ছে, কোথাও খুঁটি হেলে যাচ্ছে, আবার কোথাও শর্ট সার্কিট ও সাবস্টেশনে ত্রুটি দেখা দিচ্ছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে সাময়িক বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্য বিশ্লেষণ এবং বিদ্যুৎ বিভাগ, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ও পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহের অধিকাংশ সময় প্রকৃত লোড-শেডিং ছিল খুবই কম।
গত ৫ জুলাই থেকে দেশে লোডশেডিং বেশিরভাগ সময়ই ২০০ মেগাওয়াটের নিচে রয়েছে।
১১ জুলাই রাত ৮টার দিকে বিদ্যুতের চাহিদা সর্বোচ্চ ১৪ হাজার ৮২৯ মেগাওয়াটে পৌঁছালে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয় ১৪ হাজার ৬৮৪ মেগাওয়াট। ফলে লোড-শেডিং ছিল মাত্র ১৪৫ মেগাওয়াট।
একই দিনে সর্বোচ্চ লোড-শেডিং হয় রাত ১২টায়। তখন ১৪ হাজার ৪৬৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে লোডশেডিং ছিল ৪৪৬ মেগাওয়াট।
১২ জুলাই পরিস্থিতির আরও উন্নতি হয়। জাতীয় গ্রিডের তথ্য অনুযায়ী, সকাল ৭টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত প্রায় কোনো লোড-শেডিং হয়নি। শুধু সকাল ৮টার দিকে স্বল্প সময়ের জন্য ৩০ মেগাওয়াটের ঘাটতি দেখা যায়।
গত সপ্তাহে এর একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল ৮ জুলাই মধ্যরাত। সেদিন ১৪ হাজার ৭৫৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে লোড-শেডিং বেড়ে ১ হাজার ৩৩২ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। তবে চাহিদা কমে আসায় এক ঘণ্টা পর তা কমে ১ হাজার ২৪৯ মেগাওয়াটে নেমে আসে।
এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, তুলনামূলক শীতল আবহাওয়ায় শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার কমে যাওয়ায় বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট।
তবু কেন বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে
বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, "মানুষ যে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মুখে পড়ছেন, তার বেশিরভাগই বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে নয়; বরং দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় সৃষ্ট স্থানীয় ত্রুটির কারণে।"
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ 'ইভেন্ট সামারি'তেও এ ব্যাখ্যার সমর্থন পাওয়া যায়। এতে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার কারণগুলো নথিবদ্ধ করা হয়েছে।
শুধু ১১ জুলাই-ই আবহাওয়াজনিত কয়েকটি ঘটনায় নেটওয়ার্কের বিভিন্ন অংশ সাময়িকভাবে অচল হয়ে পড়ে। সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে নাটোর ১৩২/৩৩ কেভি সাবস্টেশন থেকে ৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়। প্রায় দুই ঘণ্টা পর ত্রুটি মেরামত করা হয়।
এর কিছুক্ষণ পর সকাল ৯টা ৩৪ মিনিটে বজ্রপাত ও ঝড়ো আবহাওয়ায় নিয়ামতপুর ১৩২/৩৩ কেভি সাবস্টেশন আক্রান্ত হয়। সকাল ১০টা ৪৬ মিনিটে সেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরুদ্ধার করা হয়।
আরেকটি ঘটনা ঘটে দুপুর ২টা ৪২ মিনিটে। বজ্রঝড়ের সময় একটি সার্কিট ব্রেকার বিকল হয়ে পড়লে ১২৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। তবে মাত্র ১২ মিনিটের মধ্যে সরবরাহ পুনরায় চালু করা হয়।
তবে সব বিদ্যুৎ বিভ্রাটই আবহাওয়াজনিত কারণে ছিল না। দুপুর ১টা ৪৬ মিনিটে শাহজিবাজার ১৩২/৩৩ কেভি সাবস্টেশনে নির্ধারিত বাসবার রক্ষণাবেক্ষণের সময় প্রায় ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। বিকেল ৩টায় সেখানে সরবরাহ পুনরায় চালু হয়।
কর্মকর্তারা বলছেন, বজ্রপাত ও ঝড়ো আবহাওয়ার কারণে সৃষ্ট ত্রুটির পাশাপাশি নির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণকাজের কারণেও পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও কিছু এলাকায় গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মুখে পড়তে হচ্ছে।
গতকাল ১২ জুলাই টিবিএসের সঙ্গে আলাপকালে বিপিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম বলেন, বর্তমান তুলনামূলক শীতল আবহাওয়া অব্যাহত থাকলে দেশে উল্লেখযোগ্য কোনো লোডশেডিং হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
তিনি বলেন, "তবে প্রতিকূল আবহাওয়ায় স্থানীয় সাবস্টেশনে সৃষ্ট সমস্যা এবং নির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণকাজের কারণে কিছু এলাকায় এখনো বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে।"
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের অঞ্চলভিত্তিক সরবরাহের তথ্যেও বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান সংকুচিত হওয়ার চিত্র দেখা যায়।
১১ জুলাই সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার পিক আওয়ারে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল প্রায় ১৪ হাজার ৯৯৮ মেগাওয়াট। বিপরীতে সারা দেশে মোট লোড-শেডিং ছিল মাত্র ১৩০ মেগাওয়াট।
দেশের নয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ অঞ্চলের মধ্যে মাত্র দুটিতে সরবরাহ ঘাটতি ছিল।
ঢাকায় ৫ হাজার ৪৩২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে লোড-শেডিং ছিল মাত্র ৮১ মেগাওয়াট। আর ময়মনসিংহে ১ হাজার ২৮৩ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে লোডশেডিং ছিল ৪৯ মেগাওয়াট।
অন্য সাতটি অঞ্চল—চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেট, খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী ও রংপুরে কার্যত কোনো লোডশেডিং ছিল না।
বর্তমান পরিস্থিতি প্রায় দুই সপ্তাহ আগের চিত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত। তখন তীব্র গরমে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছিল।
গত ২৮ জুন বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাবে, দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রাজশাহীতে ৩৭ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ঢাকায় ৩৫ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়।
তীব্র গরমে দেশজুড়ে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধানও বড় হয়ে যায়।
জাতীয় গ্রিডের তথ্য অনুযায়ী, সেদিন বিকেল ৩টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৪৯৫ মেগাওয়াট। বিপরীতে উৎপাদন সীমিত ছিল ১৩ হাজার ৬০৭ মেগাওয়াটে। ফলে লোড-শেডিং বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৮৮৮ মেগাওয়াট।
রাতেও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর একই ধরনের চাপ অব্যাহত ছিল।
সেদিন রাত ১টায় লোড-শেডিং হয়েছিল ৩ হাজার ৩৪৮ মেগাওয়াট। রাত ২টায় তা বেড়ে ৩ হাজার ৪৩১ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। রাত ৩টাতেও লোড-শেডিং ৩ হাজার ৩০০ মেগাওয়াটের ওপরে ছিল এবং ভোর পর্যন্ত তা ৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি থাকে। সকাল ৬টার পর থেকে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
জাতীয় লোড ডিসপ্যাচ সেন্টারের (এনএলডিসি) কর্মকর্তারা বলছেন, গরম ও আর্দ্র রাতেও বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকে, কারণ শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র দীর্ঘ সময় ধরে চালু থাকে।
সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান চলতি বছরের শুরুতে এ প্রভাবের বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি তিনি বলেছিলেন, শুধু শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রেই ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়।
এনএলডিসি ও বিপিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, রাতের বিদ্যুৎ চাহিদা বাড়ার আরেকটি বড় কারণ ব্যাটারিচালিত রিকশার ব্যাপক চার্জিং। সাধারণত রাত ১১টার দিকে এসব রিকশায় চার্জ দেওয়া শুরু হয় এবং তা সকাল ৮টা পর্যন্ত চলে।
ফলে মধ্যরাত থেকে সকাল ৭টা-৮টা পর্যন্ত বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকে। এরপর চালকেরা রিকশা নিয়ে সড়কে নামলে এ চাপ কমতে শুরু করে।
