বনের রানি বনে ফিরে গেল
সুন্দরবনের শ্যালা নদীর তীরে আন্ধারমানিক এলাকায় অবশেষে মুক্ত করা হয়েছে গত ছয় মাস আগে হরিণ ধরার ফাঁদে আটকে পড়া সেই বাঘিনীকে। রোববার দুপুরে বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে বাঘিনীটিকে তার চিরচেনা আবাসস্থলে ছেড়ে দেওয়া হয়।
১০ ফুট দীর্ঘ ও ৬ ফুট চওড়া একটি সবুজ রঙের বাক্সের স্লাইডিং দরজাটি যখন ওপরে তোলা হলো, কয়েক মুহূর্তের জন্য চারপাশ স্তব্ধ হয়ে যায়। আন্ধারমানিকে শ্যালা নদীর তীরে জড়ো হওয়া উৎসুক জনতার সবার চোখ ছিল সেই বাক্সের দিকে। সবাই মুঠোফোনের ক্যামেরা তাক করে রেখেছিলেন সেই মুহূর্তটি ধারণ করতে।
এরপর খাঁচার ভেতর থেকে উঁকি দেয় বাঘিনীটির মাথা। গতকাল রাতে অবশ করার পর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে জ্ঞান ফেরায় বাঘিনীটিকে বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। শুরুতে বাইরে আসতে অনীহা দেখালেও প্রায় এক ঘণ্টার প্রচেষ্টার পর সে খাঁচা থেকে বের হয়। ১১ বছর কাটানো সেই পরিচিত ম্যানগ্রোভ বনের দিকে তাকিয়ে এক লাফে নিজের স্বাধীন জীবনে ফিরে যায় বাঘিনীটি।
আটকে পড়া বাঘিনী
শরকির খাল-লাগোয়া একটি জায়গা। এক সময় যেটি বলেশ্বর নদীর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল। সে সময় এখান দিয়ে বড় বড় ইঞ্জিনচালিত নৌকা চলত। কিন্তু পলি জমে খালটি এক পর্যায়ে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে সরকার খালটি পুনরায় খননের উদ্যোগ নিলে সেখানে এক্সকাভেটর দিয়ে মাটি কাটা শুরু হয়।
গভীর বন আর নোনা পানির মাছের ঘের ঘেরা এই শান্ত জনপদে মাটি কাটার এই বিশাল যন্ত্রগুলো এক ধরণের কৌতূহল তৈরি করেছিল। খননকাজ দেখতে আসা গ্রামের কয়েকটি কিশোর খালের ওপাড়ে বনের ভেতরে প্রায় ১০০ গজ ঢুকে পড়লে বাঘের গর্জন শুনতে পায়। তারা বনের একটু গভীরে গিয়ে একটি শুকনো ঝোপের আড়ালে বাঘিনীটিকে দেখতে পায়। সিন্থেটিক দড়ি দিয়ে তৈরি হরিণ শিকারের একটি ফাঁদে তার সামনের পা আটকে ছিল।
কিশোরদের দেখে বাঘিনীটি যেন এক ধরণের আর্তনাদ মেশানো দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল। তবে কিছুক্ষণ স্থির থেকে সে আবারও দাঁত বের করে নিজের তেজ জাহির করার চেষ্টা করে।
আলিমা বেগম নামের এক গ্রামবাসী সেই সময়ের কথা মনে করে বলেন, 'ছেলেরা বাঘ বাঘ বলে চিৎকার করতে করতে ফিরে এসেছিল।' বাঘের আক্রমণে অতীতে গ্রামবাসীর মৃত্যুর কথা তার এখনও মনে পড়ে।
বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করা সংস্থা 'ওয়াইল্ডটিম'-এর সদস্য মোস্তফা মৃধা স্থানীয় একটি বাজারে চা পানের সময় খবরটি পান। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে বন বিভাগকে বিষয়টি জানান। বন বিভাগের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখে, ফাঁদে আটকে থাকা বাঘিনীটির পা থেকে রক্ত ঝরছে এবং নিজেকে মুক্ত করার প্রাণান্ত চেষ্টায় সে বেশ ক্লান্ত।
মোস্তফা বলেন, 'সেই মুহূর্তে আমাদের করার কিছুই ছিল না। তখন সন্ধ্যা হয়ে এসেছিল এবং একটি ক্রুদ্ধ বাঘের কাছে যাওয়া ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক। তাই আমরা রাতভর পাহাড়ার ব্যবস্থা করি যাতে বাঘিনীটির কেউ ক্ষতি করতে না পারে।'
বন বিভাগের ঢাকা ও বাগেরহাট অফিসে খবর জানানো হয় এবং পরদিন বেশ কিছু কর্মকর্তা এসে বাঘটিকে অজ্ঞান করে উদ্ধার করেন।
তবে উদ্ধার কাজ ছিল অত্যন্ত দুরূহ। হাজার হাজার কৌতূহলী গ্রামবাসী বাঘটিকে এক নজর দেখার জন্য ভিড় জমান। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে বন কর্মকর্তাদের ওপর হামলার উপক্রম হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সফলভাবে বাঘিনীটিকে উদ্ধার করা হয়।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. রেজা খান বলেন, 'বন বিভাগ কর্তৃক আহত বাঘিনীটিকে সফলভাবে উদ্ধারের বিষয়টি আন্তরিক প্রশংসার দাবি রাখে। বিশ্বের অন্যতম কঠিন একটি বাস্তুসংস্থানে একটি পূর্ণবয়স্ক বেঙ্গল টাইগারকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে বাঁচানো কোনো সাধারণ কৃতিত্ব নয়। এটি বন কর্মকর্তাদের সাহস, নিষ্ঠা ও পেশাদারত্বের বহিঃপ্রকাশ।'
শিকারির ফাঁদ
ছয় মাস আগে চোরাশিকারিদের জালে আটকে পড়া বাঘিনীটি অবশেষে নিজের বাসস্থানে ফিরেছে। এটি বন বিভাগের অন্যতম সফল একটি অভিযান। তবে এই ঘটনা সুন্দরবনের বাঘের জন্য বড় ধরনের হুমকির বার্তাও দিচ্ছে। হরিণ শিকারের জন্য শিকারিরা বনের ভেতরে সিন্থেটিক দড়ির যেসব মজবুত ফাঁদ পাতছে, তাতে আটকা পড়ে বাঘেরা বিপদে পড়ছে। বাঘিনীটিকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও এই অবৈধ শিকারিরা বাঘের নিরাপত্তার জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) রেজাউল করিম চৌধুরী হরিণ শিকারিদের দমনে দীর্ঘদিন ধরে এক কঠিন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তার নেতৃত্বে বনকর্মীদের ছোট্ট একটি দল প্রতিদিন পায়ে হেঁটে বনের ভেতরে টহল দেয়। বনভূমির প্রতিটি ইঞ্চি খুঁজে খুঁজে তারা হরিণ ধরার ফাঁদ শনাক্ত করার চেষ্টা করেন।
'পরিস্থিতি ভয়াবহ,' বলেন রেজাউল। 'প্রতিদিনই একের পর এক ফাঁদ খুঁজে পাই। সেগুলো ধ্বংস করি, কখনও সুযোগ পেলে শিকারিদের গ্রেপ্তারও করি। কিন্তু পরদিন আবার নতুন ফাঁদ পাতা থাকে। এত অল্প জনবল নিয়ে এই কাজ প্রায় অসম্ভব।'
রেজাউলের ছোট এই দলটিকেই ঈদ কিংবা সরকারি ছুটির দিনেও বিরামহীনভাবে টহল দিতে হয়। অথচ তাদের পাহারা দিতে হয় বিশাল এক বন, যেখানে চলাচলই অত্যন্ত কঠিন। জলাভূমি, ম্যানগ্রোভ গাছের তীক্ষ্ণ শ্বাসমূল আর হাঁটু থেকে কোমরসমান কাদা—সব মিলিয়ে শিকারিদের ঠেকানো এক বিরাট চ্যালেঞ্জ।
বাস্তবে হরিণ শিকার এখন এতটাই ব্যাপক যে চাইলে প্রায় যেকোনো সময় রাতের খাবারের টেবিলে হরিণের মাংস জোগাড় করা সম্ভব।
'এই লাগামহীন অবৈধ বাণিজ্যই এখন সুন্দরবনে বাঘ সংরক্ষণের সবচেয়ে বড় হুমকি,' বলেন তিনি। 'হরিণের সংখ্যা কমে গেলে বাঘের খাদ্যও কমে যায়। তখন ক্ষুধার্ত ও মরিয়া বাঘ লোকালয়ে ঢুকে পড়ে বা গবাদিপশু শিকার করে, যার ফলে মানুষ-বাঘ সংঘাত বাড়ে।'
চাঁদপাই রেঞ্জে ২০০৬ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে এই সংঘাত চরমে পৌঁছেছিল। প্রায় প্রতি রাতেই কোনো না কোনো গ্রামে একটি করে বাঘ ঢুকে পড়ত।
ওয়াইল্ডটিমের ফিল্ড ফ্যাসিলিটেটর মো. আলম হাওলাদার বলেন, 'এই জয়মণি গ্রামেই প্রায় প্রতি রাতেই একটি বাঘ আসত।'
গত রাতেই আমরা সেই গ্রামে বসেছিলাম। হাওলাদার আমাদের দেখালেন, কোন পথ ধরে বাঘটি গ্রামের ভেতরে ঢুকত। পথটি ছিল আমরা যেখানে অবস্থান করছিলাম, সেখান থেকে মাত্র ২০০ গজ দূরে।
'আমরা আতশবাজি ফাটাতাম, হ্যান্ড মাইক দিয়ে শব্দ করতাম,' বলেন হাওলাদার। 'বাঘটি তখনই গ্রাম ছেড়ে চলে যেত, কিন্তু পরের রাতেই আবার ফিরে আসত।'
তবে সময়ের সঙ্গে মানুষ-বাঘ সংঘাত অনেকটাই কমেছে। সর্বশেষ ২০১৮ সালে একটি বাঘ নিহত হয়েছিল। এর অন্যতম কারণ, এখন অধিকাংশ গ্রামেই বিদ্যুৎ পৌঁছেছে। আলোকিত এলাকায় বাঘ সাধারণত ঢুকতে চায় না।
তবু হরিণ শিকার বাঘের খাদ্যসংকটকে আরও প্রকট করে তুলছে। শিকারের প্রাণী কমে গেলে বাঘের প্রজননও কমে যেতে পারে, কিংবা জন্ম নেওয়া শাবকদের টিকে থাকার হার হ্রাস পেতে পারে।
বিতর্ক
বাঘিনীটিকে উদ্ধার করে চিকিৎসার পর বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়—এবার তার কী হবে? সামনে ছিল দুটি পথ। একটি, তাকে সাফারি পার্কে পাঠিয়ে সারাজীবন বন্দিদশায় রাখা। অন্যটি, আবার সুন্দরবনের বনে ফিরিয়ে দেওয়া।
এ নিয়ে বন বিভাগ দেশের বাঘ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি অনলাইন সভার আয়োজন করে।
সেখানে প্রায় সবাই বাঘিনীটিকে বনে ছেড়ে দেওয়ার পক্ষেই মত দেন।
ওয়াইল্ডটিমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, 'আমাদের মনে হয়েছে, বাঘিনীটির বয়স এখন প্রায় ১১ বছর। তার জীবনের আর কয়েক বছরই হয়তো বাকি। সুন্দরবনই তার প্রকৃত আবাস, নিশ্চয়ই সে নিজের ঘরে ফিরতে চাইবে। যদি তার গলায় একটি রেডিও কলার পরানো যেত, তাহলে আমরা তাকে পর্যবেক্ষণ করতে পারতাম এবং বন বিভাগ বাঘ সংরক্ষণে অমূল্য অভিজ্ঞতা অর্জন করত। পাশাপাশি সে কোনো গ্রামে ঢুকছে কি না, সেটিও নজরে রাখা সম্ভব হতো। কলার পরানোর আরেকটি গুরুত্ব ছিল—এর মাধ্যমে অন্তত জানা যেত বাঘিনীটি বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে। উভয় তথ্যই সংরক্ষণ গবেষণায় নতুন অধ্যায় যোগ করতে পারত।'
তবে উদ্বেগও ছিল। বাঘিনীটি ছয় মাস ধরে বন্দিদশায় থাকায়, এর আগের এলাকা হয়তো ইতোমধ্যে অন্য কোনো বাঘ দখল করে নিয়েছে। ফলে ফিরে গেলে আঞ্চলিক আধিপত্য নিয়ে সংঘাতের আশঙ্কা ছিল।
অন্যদিকে, এর পাল্টা যুক্তিও ছিল। নতুন কোনো বাঘ এলে অন্যরা ধীরে ধীরে জায়গা ছেড়ে দেয়। আবার নতুন শাবকেরা বড় হয়ে নিজস্ব এলাকা গড়ে তোলে। সেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেই এই বাঘিনীও নিজের জন্য একটি নতুন এলাকা খুঁজে নিতে পারবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞানী অধ্যাপক মনিরুল এইচ খান বলেন, 'এটি একটি স্ত্রী বাঘ। তাই বনাঞ্চলে ফিরে গেলে অন্য বাঘদের, বিশেষ করে পুরুষ বাঘের সঙ্গে সংঘাতের সম্ভাবনা তুলনামূলক কম। বাঘিনীটি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছে এবং আমরা আশা করছি, সে আবার শিকার করতে সক্ষম হবে। শিকার করার সহজাত প্রবৃত্তি তার মধ্যেই রয়েছে, বনে ফিরে গেলে সেটি আবারও সক্রিয় হয়ে উঠবে।'
শেষ পর্যন্ত বাঘটির গলায় রেডিও কলার না পরানোর সিদ্ধান্ত হয়। ধারণা করা হয়, ২০০৪ ও ২০০৬ সালে ব্রিটিশ প্রাণিবিজ্ঞানী অ্যাডাম বার্লোর দুটি বাঘের গলায় রেডিও কলার পরানোর অভিজ্ঞতাও এ সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছিল। ওই দুটি বাঘই পরে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। এরপর এ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়—কলার পরানোর কারণেই কি তাদের মৃত্যু হয়েছিল?
কেউ কেউ মনে করেছিলেন, ব্যবহৃত কলারগুলো অতিরিক্ত ভারী ছিল। এতে হয়তো বাঘগুলোর শিকার করার সক্ষমতা ব্যাহত হয়েছিল, অথবা কলারে শ্যাওলা ও অন্যান্য উপাদান জমে সংক্রমণের সৃষ্টি হয়েছিল।
তাই বাঘিনীটির গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য বনের ভেতরে ২০টি ক্যামেরা ট্র্যাপ বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
অবশেষে বাঘিনীটিকে আবার সুন্দরবনের বনে অবমুক্ত করা হয়। তাকে বিদায় জানানোর সময় উপস্থিত সবার একটাই প্রার্থনা ছিল—সে যেন টিকে থাকে। ভাগ্য সহায় হলে হয়তো আরও তিন-চার বছর বাঁচবে, নতুন শাবকের জন্ম দেবে এবং ২০২৪ সালের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী সুন্দরবনের ১২৫টি বাঘের জনসংখ্যা বাড়াতে অবদান রাখবে।