সমন্বিত অভিযানে সুন্দরবনে বেড়েছে বাঘ, হরিণসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী: বন বিভাগ
সমন্বিত অভিযানের ফলে গত এক বছরে পূর্ব সুন্দরবনে বাঘ, হরিণ ও পাখিসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর উপস্থিতি বেড়েছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।
বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার ও হরিণ শিকার কমে আসা, অভয়ারণ্যে অবৈধ মাছ আহরণ বন্ধ এবং টহল জোরদারের ফলে বনে প্রাণ-প্রকৃতি ফিরতে শুরু করেছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
তবে সম্প্রতি বনদস্যুদের তৎপরতা, সীমিত জনবল ও ভৌগোলিক জটিলতা এখনো সুন্দরবন রক্ষায় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে বন্যপ্রাণী অপরাধ দমনে নজিরবিহীন অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
এ সময় প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার ৫৫৩ ফুট দীর্ঘ হরিণ শিকারের প্রাণঘাতী মালা ফাঁদ উদ্ধার করা হয়, যা প্রায় ৩৫ কিলোমিটারের সমান। পাশাপাশি ৮১৩টি সিটকা ফাঁদ ও ২ হাজার ২৯৪টি হাঁটা ফাঁদ অপসারণ করা হয়েছে।
বন বিভাগের তথ্যমতে, এসব ফাঁদ উদ্ধার না করা গেলে কয়েক হাজার হরিণ, বন্য শুকর, বানর এমনকি বাঘও শিকার হতে পারত। ফাঁদ পাতার সঙ্গে জড়িত ৭০ জন চোরা শিকারিকে আটক করে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
তাদের দাবি, ধারাবাহিক অভিযানের ফলে হরিণ শিকার কমেছে এবং অবৈধ বাজারে হরিণের মাংসের সরবরাহও হ্রাস পেয়েছে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় চলতি বছর উদ্ধার হওয়া হরিণের মাংসের পরিমাণ ৭৫০ কেজি থেকে কমে ২৫০ কেজিতে নেমে এসেছে। বনে পেতে রাখা বিপুল পরিমাণ ফাঁদ উদ্ধার ও ধ্বংস করায় হরিণ শিকার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
পূর্ব সুন্দরবনে চোরাশিকার দমনে ফুট প্যাট্রোলিং, স্মার্ট নজরদারি ও ড্রোন ব্যবহারের কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে।
গত এক বছরে সুন্দরবনে ৪৭৪টি অভিযানে ২৪১টি মামলায় ৩৭৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরও ৩৯৬ জনের বিরুদ্ধে বন আইনে মামলা করা হয়েছে।
এ সময় ৪৪৮টি নৌকা ও ট্রলার, ৮ হাজার ৩৮১টি অবৈধ কাঁকড়া ধরার যন্ত্র, ৩০০ ফুট জাল, ৭২৪ কেজি বিষ দিয়ে ধরা মাছ, ১ হাজার ৬৬ কেজি কাঁকড়া এবং ২৫০ কেজি হরিণের মাংস জব্দ করা হয়েছে।
বন বিভাগের তথ্যমতে, অবৈধ বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ায় হরিণের মাংসের দাম কেজিপ্রতি ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৫০০ টাকায় উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, এখন আগের মতো সহজে হরিণের মাংস বা বিষ দিয়ে ধরা মাছ পাওয়া যায় না।
স্থানীয় জেলে আসাদ মুন্সি, বারেক হাওলাদারসহ বনসংলগ্ন এলাকার জেলে ও মৌয়ালরা জানান, তারা ১৪-১৫ বছর ধরে সুন্দরবনে যাতায়াত করছেন। বর্তমানে মাছ ধরা ও মধু সংগ্রহে গিয়ে প্রায়ই বাঘের পায়ের ছাপ দেখতে পান, কখনো কখনো বাঘের ডাকও শোনেন।
তাদের ভাষ্য, আগের তুলনায় এখন বেশি হরিণ ও বন্য শুকর দেখা যায়। নদী সাঁতরে বাঘের চলাচল এবং কুমিরের উপস্থিতিও বেড়েছে।
তারা আরও জানান, নদী ও খালের চর এবং বনাঞ্চলে খয়েরিপাখা মাছরাঙা, বামুনি মাছরাঙা, লাল মাছরাঙা, সিঁদুরে মৌটুসী, মদনটাক, শঙ্খচিল, ধলাপেট সিন্ধু ঈগল ও কালোমুখ প্যারা পাখিসহ নানা প্রজাতির পাখির আনাগোনা বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরিণ সুন্দরবনের প্রধান তৃণভোজী প্রাণী এবং রয়েল বেঙ্গল টাইগারের অন্যতম প্রধান খাদ্য। হরিণের সংখ্যা ও নিরাপদ বিচরণ বাড়লে বাঘের উপস্থিতিও স্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়।
তাদের মতে, বন্যপ্রাণী শিকার কমে যাওয়া, বিষ দিয়ে মাছ ধরা নিয়ন্ত্রণ এবং অভয়ারণ্যে অবৈধ প্রবেশ কমে যাওয়ায় পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
বন বিভাগ দাবি করেছে, গত এক বছরে কটকা, কচিখালী, কোকিলমনি ও টিয়ারচরসহ অভয়ারণ্য এলাকায় অবৈধ মাছ ও কাঁকড়া আহরণ প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে।
এ সময় অবৈধ প্রবেশ ও বিষ দিয়ে মাছ শিকারের দায়ে ৩০০ জেলেকে আটক করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ডলফিন অভয়ারণ্যে ফাঁস জাল অপসারণ, প্লাস্টিকমুক্ত পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা এবং আগুনপ্রবণ ধানসাগর, কলমতেজী, নাংলী, আমুরবুনিয়া ও দাশের ভাড়ানী এলাকায় ড্রোন নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
বন বিভাগের দাবি, প্রচার-প্রচারণা ও সচেতনতা কার্যক্রমের ফলে বনসংলগ্ন মানুষের আচরণেও পরিবর্তন এসেছে।
গত এক বছরে শরণখোলায় বন থেকে লোকালয়ে চলে আসা তিনটি চিত্রা হরিণ, একটি বাঘ ও ৩৭টি অজগর সাপ স্থানীয়রা হত্যা না করে বন বিভাগের সহায়তায় বনে ফিরিয়ে দিয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বর্তমানে সুন্দরবনের ভেতরে কয়েকটি সংঘবদ্ধ দস্যু দলের তৎপরতা রয়েছে, যা বননির্ভর জেলে ও মৌয়ালদের নিরাপত্তায় নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এছাড়া সুন্দরবনের বিশাল আয়তন, সীমিত জনবল এবং লোকালয়ের সঙ্গে যুক্ত অনেক নদী-খালের নাব্যতা কমে যাওয়ায় অপরাধীদের বনাঞ্চলে প্রবেশ তুলনামূলক সহজ হয়ে পড়েছে।
ডিএফও মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, "বন ভালো থাকলে বন্যপ্রাণী ভালো থাকবে। আর বন রক্ষায় স্থানীয় মানুষের সম্পৃক্ততা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।"
তিনি বলেন, "বনের খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষে থাকা বাঘ রক্ষা পেলে সুন্দরবনের পুরো ইকোসিস্টেমই সুরক্ষিত থাকবে।"
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জরিপে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ছিল ১২৫টি। বর্তমান সংরক্ষণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে আগামী জরিপে এ সংখ্যা আরও এক-চতুর্থাংশ বাড়তে পারে বলে আশা করছে বিভাগটি।
ইনস্টিটিউট ফর ইন্টিগ্রেটেড স্টাডিজ অন দ্য সুন্দরবনস অ্যান্ড কোস্টাল ইকোসিস্টেমসের (আইআইএসএসসিইএস) পরিচালক ড. মোহাম্মদ রায়হান আলী বলেন, "বাস্তুতন্ত্রের সব উপাদান একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। পূর্ব সুন্দরবন বন বিভাগের উপাত্ত ইকোসিস্টেমে ইতিবাচক পরিবর্তনের যৌক্তিক ইঙ্গিত হতে পারে।"
তিনি বলেন, বন বিভাগ যেহেতু মূল ব্যবস্থাপনা সংস্থা, তাই তাদের কার্যক্রমের ইতিবাচক প্রভাব পড়া স্বাভাবিক।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবন সুরক্ষায় সব ধরনের ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয় প্রস্তুত রয়েছে।
তিনি বলেন, "বনে দস্যুদমনে যৌথবাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে। দেশের এই সম্পদ রক্ষায় সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।"
