সুন্দরবনে লোনা পানির কুমিরের আক্রমণে কি লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য আছে? গবেষণায় মিলছে ইঙ্গিত
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন বাংলাদেশ ও ভারত–দুই প্রতিবেশী দেশে উপকূলের একাংশ জুড়ে বিস্তৃত। এখানে ডাঙ্গায় বাঘ, জলে কুমির— এই প্রাচীন প্রবাদের বাস্তবেই দেখা মেলে। ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের বনজীবী মানুষকে তাই প্রাণ হাতে করেই জীবিকার সন্ধান করতে হয়। মাঝেমাধ্যেই তাঁরা হিংস্র বন্যপ্রাণির আক্রমণের শিকারও হন।
বনজীবীদের মধ্যে নারী ও পুরুষ উভয়ই রয়েছেন। কিন্তু, সুন্দরবনে লোনা পানির কুমিরের হামলার শিকার কি মূলত নারীরাই হচ্ছেন? সাম্প্রতিক একটি গবেষণা অন্তত সেই সম্ভাবনার দিকেই ইঙ্গিত করছে।
২০১৭ সালে কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেসে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সুন্দরবনের ভারতীয় অংশে মানুষ–কুমির সংঘাতের ঘটনায় প্রায় ৮০ শতাংশ ভুক্তভোগী ছিলেন চিংড়ির রেণু সংগ্রাহক। এদের মধ্যে ৬১ দশমিক ১৬ শতাংশ হামলায় প্রাণ হারান।
'হিউম্যান–ক্রোকোডাইল কনফ্লিক্ট ইন দ্য ইন্ডিয়ান সুন্দরবনস: অ্যান অ্যানালাইসিস অব স্পেশিও-টেম্পোরাল ইনসিডেন্সেস ইন রিলেশন টু পিপলস লাইভলিহুড' শীর্ষক ওই গবেষণায় দেখা যায়, কুমিরের আক্রমণে নিহতদের মধ্যে নারীর হার ৫৫ দশমিক ১২ শতাংশ, যেখানে পুরুষের হার ৪৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
গবেষণায় বলা হয়েছে, এই হামলাগুলো ঘটে মূলত তখনই, যখন স্থানীয় মানুষ রেণু সংগ্রহে নামে। এতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৯০ সালের পর থেকে মানুষ–কুমির সংঘাত বেড়েছে, যার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে "কুমিরের আবাসভূমিতে ব্যাপক মানব অনুপ্রবেশ"। ঝুঁকি সত্ত্বেও বাঘের মতো কুমিরও সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের গভীরে প্রোথিত।
লোনা পানির রাজা
লোনাপানির কুমির বরাবরই সুন্দরবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ পরিবেশে জোয়ার–ভাটার কারণে প্রায়ই গ্রাম ও বন্যপ্রাণীর আবাসভূমির সীমানা মুছে যায়। এতে এই শিকারি প্রাণীগুলো পরিবেশ ও সংস্কৃতির এক ভঙ্গুর ভারসাম্যরক্ষকে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় লোকদেবী বনবিবি ও দক্ষিণ রায়–সংক্রান্ত লোককথায় কুমিরের উপস্থিতি রয়েছে।
স্থানীয় লোকবিশ্বাস, বনবিবি সুন্দরবনে প্রবেশের আগে মানুষকে বাঘ ও অন্যান্য বিপদ থেকে রক্ষা করেন। তাঁর কাহিনিতে বলা হয়, একবার দুখে নামের এক ছেলে বনে হারিয়ে গেলে বনবিবি কুমির কালু রায়কে ডাকেন এবং দুখেকে তার পিঠে বসিয়ে নিরাপদে ঘরে ফেরান। আজও অনেক জেলে কুমিরের আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য কালু রায়ের কাছে প্রার্থনা করেন।
তবে মানুষের সঙ্গে বন্যপ্রাণীর সংঘাত বাড়তে থাকায়, ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসা জায়গা ও খাদ্যের জন্য লড়াইয়ে জেলেদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে লবণাক্ত পানির কুমিরের।
সুন্দরবনে জোয়ার-ভাটা ও তাপমাত্রার মতো পরিবেশগত উপাদান কুমিরের আচরণকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। কুমির সরীসৃপ গোত্রের হওয়ায়—শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য তারা রোদ পোহায় এবং ভাটার সময় তাদের বেশি দেখা যায়। কাদামাটির চর ও খাঁড়ি এলাকায় নিঃশব্দে পড়ে থেকে শিকারের জন্য ওঁত পেতে থাকে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য বন দপ্তরের ২০২৫ সালের জরিপে দেখা গেছে, ভারতীয় অংশের সুন্দরবন জীবমণ্ডল সংরক্ষণ এলাকায় (এসবিআর) সব বয়সী লবণাক্ত পানির কুমিরের সংখ্যা বেড়েছে। বিশেষ করে সদ্য জন্মানো বাচ্চা কুমিরের বিরল উপস্থিতি বাড়ায় বিষয়টি আশাব্যঞ্জক বলে মনে করা হচ্ছে।
২০২৫ সালে পরিচালিত সর্বশেষ সমীক্ষা অনুযায়ী, এসবিআরে লবণাক্ত পানির কুমিরের সংখ্যা সর্বোচ্চ ২৪২ এবং সর্বনিম্ন ২২০টির মধ্যে রয়েছে। ওই গবেষণায় সরাসরি ২১৩টি কুমির দেখা গেছে।
এসবিআরের উপ-মাঠপরিচালক জাস্টিন জোনস জানান, বর্তমানে কুমির গণনার একটি আদমশুমারি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। "সাধারণত প্রতি বছর ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি—শীতকালেই কুমিরের সংখ্যা নিরূপণ করা হয়," বলেন তিনি।
কুমিরের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি সুন্দরবনে মানুষের ওপর কুমিরের আক্রমণের ঘটনাও বাড়ছে। কলকাতা থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার গোসাবা, বাসন্তী ও পাথরপ্রতিমা এলাকায় মাঠপর্যায়ের কর্মীরা এমন ঘটনার কথা জানিয়েছেন।
উল্লেখিত গবেষণায় ২০০০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে ঘটে যাওয়া ১২৭টি কুমিরের হামলার তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে গোসাবা—সুন্দরবনের একটি ছোট দ্বীপ—সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।
এই হামলাগুলোর প্রধান শিকার হচ্ছেন রেণু বা মীন সংগ্রহে নিয়োজিত নারীরা।
ঝুঁকিপূর্ণ জীবিকা
সুন্দরবনের বাসিন্দারা চরম দরিদ্র। তারা ফসল ফলানোর পাশাপাশি বন থেকে মধু ও কাঠ সংগ্রহ করেন, মাছ ধরেন এবং রেণু সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। টানাটানির সংসারের আর্থিক চাপেই নারীরা রেণু সংগ্রহে বাধ্য হন। এমনকি ঋতুস্রাবের সময়ও তাদের পানিতে নামতে হয়। বলা হয়, মাসিকের রক্তের গন্ধ কুমিরকে আকৃষ্ট করে, যা এই কঠিন কাজকে আরও ভয়ংকর করে তোলে।
কুমির বিশেষজ্ঞ এ. জাইলাবদীন—যিনি রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ ও উত্তরপ্রদেশের চম্বল অঞ্চলে ঘড়িয়াল সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করছেন, বলেন—লবণাক্ত পানির কুমিরের ঘ্রাণশক্তি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ এবং তারা রক্তের গন্ধ পায়।
সুন্দরবনে প্রতিটি কুমির হামলার ঘটনাই দেখিয়ে দেয়, রেণু সংগ্রহের সময় নারীদের কী পরিমাণ ঝুঁকি নিয়ে ঘোলা পানিতে নামতে হয়—এমনকি ঋতুস্রাব চলাকালেও।
দ্য টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবরে সুন্দরবনের বনশ্যামনগরের কাছে কাঁকড়া ধরতে গিয়ে ৩৭ বছর বয়সী গৃহবধূ প্রণতি প্রামাণিক প্রায় ৩০ মিনিট ধরে একটি লোনা পানির কুমিরের সঙ্গে লড়াই করেন। এক পর্যায়ে একটি গাছ আঁকড়ে ধরে তিনি প্রাণে বাঁচেন, তবে গুরুতর আহত হন।
এমন পরিস্থিতিতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, সুন্দরবনের অনেক নারী রেণু সংগ্রহ ছেড়ে অন্য পেশায় ঝুঁকছেন।
গোসাবার বাসিন্দা ছিত্তরঞ্জন রায় বলেন, "আগে রেণু অবৈধভাবে বাংলাদেশে পাচার হতো। এখন বিক্রি কমে যাওয়ায় দাম পড়ে গেছে। তাই অনেক নারী কাঁকড়া ধরছেন বা অন্য কাজ করছেন।" তিনি জানান, একসময় সুন্দরবনের দয়াপুর গ্রামে ছয়–সাতজন নারী কুমির হামলায় প্রাণ হারিয়েছিলেন।
কৌশল্যা সরদার নামে এক নারী জানান, তিনি একসময় রেণু সংগ্রহ করতেন, কিন্তু কুমিরের ভয়ে তা ছেড়ে দিয়েছেন।
"আমি প্রায় দুই বছর আগে মীন (রেণু) সংগ্রহ ছেড়ে দিয়েছি। এখন দরিদ্র মানুষ হিসেবে ধান কাটার মৌসুমে মাঠে কাজ করি, অন্য কাজ খুঁজি। আমার স্বামী অন্ধ্রপ্রদেশে কাজ করেন। হামলার পর অনেক নারীই এই কাজ ছেড়েছেন," বলেন গোসাবা থানার অধীন বিরাজমণির এই বাসিন্দা। তিনি জানান, দিনে ১,০০০টি মীন ধরলে ১৫০–২০০ রুপি পাওয়া যেত। "ব্যবসায়ীরা এসে গুনে টাকা দিয়ে যেত।"
কলকাতাভিত্তিক এনজিও 'ট্যাগোর সোসাইটি ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট'-এর কর্মী কানাইলাল সরকার জানান, কুমিরের পাশাপাশি হাঙরও হুমকি হয়ে উঠেছে। সংস্থাটির প্রধান প্রবীর মহাপাত্র বলেন, সমুদ্রের লবণাক্ততা বাড়ায় কুমিরের তৎপরতা বেড়ে থাকতে পারে।
সরকার জানান, পর্যটকেরা প্রায়ই পানিতে কিংবা তীরে রোদ পোহাতে থাকা কুমির দেখেন। সুন্দরবনে কুমিরের সংখ্যা বাড়াতে ১৯৭৬ সালে ভাগবতপুর কুমির প্রকল্প শুরু করা হয়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকসংস্কৃতি বিভাগের গবেষক উজ্জ্বল সরদার বলেন, সুন্দরবন অঞ্চলে সমুদ্রের লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে কুমির গ্রাম ও মাছের পুকুরেও ঢুকে পড়ছে। ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলা ও ২০২০ সালের আম্ফানের পর লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ায় অনেক ম্যানগ্রোভ প্রজাতি নষ্ট হয়েছে, লোনাপানির কারণে বহু জমি অনাবাদি হয়ে পড়েছে।
বারুইপুরের বাসিন্দা উজ্জ্বল সরদার জানান, তিনি ম্যানগ্রোভ বনের দুই পাশের লোকজ প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি বলেন, একসময় নদীপাড়ের গ্রামগুলোতে হাঙর হামলা ছিল নিয়মিত, কিন্তু গত কয়েক বছরে তেমন ঘটনা নেই। তিনি কুমিরের আক্রমণ থেকে বেঁচে যাওয়া নারীদের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, "রেণু সংগ্রহ পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট করে। জাল দিয়ে রেণু ধরতে গিয়ে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জলজ প্রজাতিও মারা যায়।"
জাইলাবদীন বলেন, শুধু ঋতুস্রাবরত নারীরাই আক্রান্ত হন না। "পানিতে যেকোনো ধরনের নড়াচড়া কুমির টের পায়। তাই ঋতুস্রাব না থাকলেও নারীরা হামলার শিকার হতে পারেন।"
ঘাতক কেবল কুমিরই নয়
কুমির হামলার পাশাপাশি, সুন্দরবনে রেণু সংগ্রহকারী নারীরা অপরিচ্ছন্ন কাপড়ের প্যাড ব্যবহারের কারণে জরায়ু ক্যানসারের ঝুঁকিতেও থাকেন—জানান শিক্ষক সুমন্ত বিশ্বাস, যিনি নিরাপদ ঋতুচক্র নিয়ে সচেতনতা তৈরি করেন এবং স্যানিটারি প্যাড বিতরণ করেন।
"প্রথমে পেলভিক ইনফ্ল্যামেটরি ডিজিজ (পিআইডি) হয়, যা পরে জরায়ুমুখ ক্যানসারে রূপ নিতে পারে। দারিদ্র্যের কারণে অধিকাংশ নারী প্যাড কিনতে পারেন না। কাপড়ের প্যাড ঠিকমতো ধোয়া ও শুকানো হয় না, ফলে সংক্রমণ হয়," বলেন বিশ্বাস। বিশ্বে জরায়ুমুখ ক্যানসারে আক্রান্ত প্রতি পাঁচ নারীর একজন ভারতের।
তিনি জানান, সুন্দরবন অঞ্চলে এখনো ঋতুস্রাব নিয়ে লজ্জা ও সামাজিক ট্যাবু প্রচলিত। অনেক সময় নারীদের রক্তপাতের সময় নৌকায় উঠতে দেওয়া হয় না। কখনো নৌকা ফিরিয়ে এনে ধুয়ে নেওয়া হয়।
