দক্ষিণ আফ্রিকায় অভিবাসীবিরোধী বিক্ষোভ, ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরাও
দক্ষিণ আফ্রিকায় অভিবাসীবিরোধী বিক্ষোভ চলতে থাকায় সেখানে বসবাসরত অনেক বাংলাদেশি আতঙ্কে রয়েছেন। নিরাপত্তার কারণে অনেকে সাময়িকভাবে ব্যবসা বন্ধ রেখেছেন এবং বাইরে চলাচলও কমিয়ে দিয়েছেন।
প্রতিবেশী আফ্রিকান দেশগুলো থেকে যাওয়া অবৈধ অভিবাসীরা এই বিক্ষোভের মূল লক্ষ্য হলেও এর প্রভাব বাংলাদেশিদের ওপরেও পড়েছে।
কিছু দক্ষিণ আফ্রিকানের অভিযোগ, অভিবাসীদের কারণে স্থানীয়দের চাকরির সুযোগ কমে যাচ্ছে এবং সরকারি সেবার ওপরেও চাপ পড়ছে। যদিও বিক্ষোভ মূলত এসব অভিযোগ ঘিরেই; বাংলাদেশি দোকানমালিকেরা বলছেন, তারাও এর নেতিবাচক প্রভাব ভোগ করছেন।
ডারবানে মুদি দোকানের মালিক বাংলাদেশি মো. আমরান বলেন, নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে ৩০ জুন থেকে দুই দিন পুরোপুরি দোকান বন্ধ রাখতে হয়েছে। আরও কয়েক দিন সীমিত পরিসরে ব্যবসা চালিয়েছেন তিনি।
মোবাইল ফোনে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে তিনি বলেন, "আমাদের দোকানে সাধারণত প্রতিদিন প্রায় ৮০ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি হয়। দুই দিন পুরোপুরি বন্ধ রাখা এবং অন্য দিনগুলোতে সময় কমিয়ে ব্যবসা চালানোর কারণে উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।"
তিনি বলেন, ৩০ জুন দেশজুড়ে বিক্ষোভকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ ছিল। তবে পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
আমরান বলেন, "অভিবাসীবিরোধী তৎপরতা এখনো চলছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় বাংলাদেশিদের মালিকানাধীন দোকানে প্রায়ই লুটপাটের ঘটনা ঘটছে। আমাদের কমিউনিটির মধ্যে এখনো আতঙ্ক বিরাজ করছে।"
অনানুষ্ঠানিক হিসাব অনুযায়ী, দক্ষিণ আফ্রিকায় ১ লাখের বেশি বাংলাদেশি বসবাস করেন। তাদের বেশির ভাগই মুদি দোকান, কনভেনিয়েন্স স্টোরসহ ছোট ও মাঝারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।
দোকান খালি করেছেন অনেক বাংলাদেশি
প্রতিবেশী দেশ বতসোয়ানায় ২২ বছরের বেশি সময় ধরে বসবাসরত বাংলাদেশি সাংবাদিক মনিরুল ভূঁইয়া নিয়মিত দক্ষিণ আফ্রিকায় যাতায়াত করেন। সম্প্রতি জোহানেসবার্গ ও আশপাশের এলাকা ঘুরে তিনি প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ দেখেছেন বলে জানান।
তিনি বলেন, "নিরাপত্তা শঙ্কায় কয়েকজন বাংলাদেশি তাদের দোকান থেকে পণ্য সরিয়ে নিয়েছেন। তারা জানিয়েছেন, অভিবাসীদের মালিকানাধীন অনেক দোকানে ইতোমধ্যে লুটপাট হয়েছে। এ কারণে সতর্কতামূলকভাবে ব্যবসা বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে।"
মনিরুল ভূঁইয়া বলেন, বিক্ষোভ মূলত প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে যাওয়া অনিবন্ধিত অভিবাসীদের বিরুদ্ধে। তবে অনেক বাংলাদেশির বৈধ কাগজপত্র না থাকায় তারাও লক্ষ্যবস্তু হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন এবং এ পরিস্থিতির প্রভাব ভোগ করছেন।
জোরালো হচ্ছে অভিবাসীবিরোধী আন্দোলন
আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ আফ্রিকায় কয়েক সপ্তাহ ধরে অনিবন্ধিত অভিবাসীদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলছে। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, বিদেশি শ্রমিকেরা স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের সুযোগ কমাচ্ছেন এবং সরকারি সেবার ওপর চাপ বাড়াচ্ছেন।
অভিবাসীবিদ্বেষী সহিংসতা ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ায় দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার সমালোচনার মুখে পড়েছে। গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, এসব সহিংসতায় কয়েকজন বিদেশি নিহত হয়েছেন এবং অভিবাসীদের মালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতিবেশী দেশ মোজাম্বিক জানিয়েছে, মে মাসের শেষ দিকে অভিবাসীবিদ্বেষী হামলায় তাদের পাঁচ নাগরিক নিহত হয়েছেন। নাইজেরিয়া জানিয়েছে, তাদেরও দুইজন নাগরিক নিহত হয়েছেন।
নিরাপত্তাহীনতা বাড়ায় শত শত নাইজেরিয়ানসহ অনেক বিদেশি নাগরিক দক্ষিণ আফ্রিকা ছেড়েছেন বলে জানা গেছে। প্রিটোরিয়ায় উগান্ডার হাইকমিশনও চলতি সপ্তাহে জানিয়েছে, দেশটির আরও একদল নাগরিক স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে গেছেন।
তবে দক্ষিণ আফ্রিকায় সহিংস অপরাধের সমস্যা নতুন নয়। সাম্প্রতিক অভিবাসীবিরোধী অস্থিরতার অনেক আগে থেকেই দেশটি এ সংকটে ভুগছে।
নিরাপত্তা সতর্কতা জারি হাইকমিশনের
পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় প্রিটোরিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশন দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের সতর্ক থাকার এবং মিশন ও কমিউনিটি নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার আহ্বান জানিয়েছে।
৩০ জুনের বিক্ষোভের আগে নিরাপত্তা হুমকির তথ্য গ্রহণ এবং প্রবাসীদের সহায়তায় একটি বিশেষ জরুরি হটলাইন চালু করে হাইকমিশন।
হাইকমিশন জানায়, হটলাইনে পাওয়া তথ্য দক্ষিণ আফ্রিকার পুলিশকেও জানানো হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা বাড়াতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও কমিউনিটি নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় অব্যাহত রাখা হবে।
