উজানের ঢলে দেশের আরও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা
ভারতের উজানে টানা ভারী বৃষ্টিপাত এবং উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরের লঘুচাপের প্রভাবে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি অব্যাহত রয়েছে।
বর্তমানে ছয় জেলার ১০টি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে ছয়টি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টায় কয়েকটি নদীর পানি আরও বাড়তে পারে এবং কিছু নতুন এলাকায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি)।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সন্ধ্যা ৬টার বিশেষ বন্যা আউটলুকে এ তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
এফএফডব্লিউসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বান্দরবান, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জ জেলার ১০টি স্টেশনে ছয়টি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পানি রয়েছে হবিগঞ্জের বাল্লা পয়েন্টে খোয়াই নদীতে, যেখানে পানি বিপৎসীমার ১৯২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
এছাড়া বান্দরবানের লামা পয়েন্টে মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ১৬৪ সেন্টিমিটার, হবিগঞ্জ পয়েন্টে খোয়াই নদী ১৪০ সেন্টিমিটার এবং বান্দরবান পয়েন্টে সাঙ্গু নদী ১০৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
মনু নদীর দুটি পয়েন্টে পানি যথাক্রমে ৭৩ ও ৬৯ সেন্টিমিটার, চিরিঙ্গা পয়েন্টে মাতামুহুরী ৭৭ সেন্টিমিটার, মারকুলিতে কুশিয়ারা ১৫ সেন্টিমিটার, কলমাকান্দায় ধলাই ৫ সেন্টিমিটার এবং দোহাজারীতে সাঙ্গু ১৬ সেন্টিমিটার ওপরে রয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র জানিয়েছে, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে গত তিন দিনে চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগ এবং ভারতের ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। একই সময়ে চট্টগ্রামে ৮১৫ মিলিমিটার, লামায় ৫১৮ মিলিমিটার এবং কক্সবাজারে ৩৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
আবহাওয়া পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী দুই দিনও এসব এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে।
কেন্দ্রটির তথ্য বলছে, আগামী তিন দিনে বান্দরবান ও কক্সবাজারে সর্বোচ্চ ৩০০ থেকে ৩৫০ মিলিমিটার এবং চট্টগ্রাম, ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী অঞ্চলে ২৫০ থেকে ৩০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হতে পারে।
অন্যদিকে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর এবং উত্তরাঞ্চলের নীলফামারী, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামে ১০০ থেকে ১৫০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।
ভারতের সীমান্তবর্তী নদীগুলোর তথ্যেও উজানের পানির চাপ বাড়ার ইঙ্গিত মিলেছে। ত্রিপুরার খোয়াই ও কৈলাশহর এলাকায় গত ২৪ ঘণ্টায় নদীর পানি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এর প্রভাবে বাংলাদেশের খোয়াই ও মনু নদীর পানিও দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।
একইভাবে পশ্চিমবঙ্গের ডোমোহনী এলাকায় তিস্তার পানিও বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তিস্তা নদী বিপৎসীমা স্পর্শ বা অতিক্রম করতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এফএফডব্লিউসি।
বিশেষ আউটলুকে বলা হয়েছে, বান্দরবান ও কক্সবাজারে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদী অববাহিকায় চলমান বন্যা পরিস্থিতি আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা অব্যাহত থাকতে পারে। হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে খোয়াই, মনু ও ধলাই নদীর বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকার সম্ভাবনা থাকলেও সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের কয়েকটি নদীর পানি আরও বাড়তে পারে।
একই সঙ্গে ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ির মুহুরী, ফেনী, সিলোনিয়া ও হালদা নদীর কিছু স্থানে এবং তিস্তা অববাহিকার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলেও স্বল্পমেয়াদি প্লাবনের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে কেন্দ্রটি।
এদিকে, টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে খোয়াই নদের বাঁধ ভেঙে হবিগঞ্জের অন্তত ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে শত শত পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। অনেকের বসতঘরে পানি ঢুকে পড়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। একই সঙ্গে হবিগঞ্জ-ভায়া-মিরপুর আঞ্চলিক সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার কালিগঞ্জ-চরহামুয়া এলাকায় নদের বাঁধে ভাঙন দেখা দেয়। এরপর দ্রুত পানি আশপাশের গ্রামগুলোয় ঢোকা শুরু করে। আজ শুক্রবারও পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যায়। প্লাবিত এলাকায় অনেক কাঁচা সড়ক পানির নিচে চলে গেছে। কৃষিজমিরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
অন্যদিকে, ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা। চন্দনাইশ উপজেলার হাসিমপুর ও দোহাজারী বটতলা এলাকায় চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কে থই থই পানি। এতে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। আবার মহাসড়কে ওঠা পানিতে জাল ফেলে মাছ ধরতেও দেখা গেছে।
