টানা বৃষ্টিতে স্থবির চট্টগ্রাম; ব্যাহত হচ্ছে বন্দর কার্যক্রম, বন্ধ রেল যোগাযোগ
মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে টানা ভারি বৃষ্টিতে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম। টানা তিন দিনের বর্ষণে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে, সীমিত হয়ে পড়েছে মানুষের চলাচল। দ্বিতীয় দিনের মতো ব্যাহত হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য খালাস কার্যক্রম। রেললাইনে পানি ওঠায় বন্ধ রয়েছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল যোগাযোগ।
আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, বুধবার (৮ জুলাই) সকাল ১০টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ২৩৭ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগে মঙ্গলবার (৭ জুলাই) বিকেল ৩টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড হয়েছিল ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত। এর আগে ১৯৮৩ সালের ৪ আগস্ট ৪১১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের রেকর্ড ছিল। সে হিসাবে গত ৪৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়েছে মঙ্গলবারের আগের ২৪ ঘণ্টায়।
আবহাওয়া ও ভূপ্রাকৃতিক কেন্দ্র চট্টগ্রামের উপপরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রহমান খান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'সম্প্রতি সৃষ্ট মৌসুমি নিম্নচাপের প্রভাব যুক্ত হওয়ায় বৃষ্টির তীব্রতা বেড়েছে। নিম্নচাপটি ভারতের ঝাড়খণ্ড ও ওডিশা অঞ্চলে সরে গেলেও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর কারণে অন্তত আরো দুদিন দিন থেমে থেমে ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টি হতে পারে। সমুদ্র বন্দরগুলোর ৩ নম্বর সতর্কতা সংকেট দেখাতে বলা হয়েছে। চট্টগ্রামের নদীগুলো হালকা বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।'
টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বেড়েছে। এতে নগরের পাহাড়ঘেঁষা বসতিগুলোতে বসবাসকারীদের নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। এরই মধ্যে মঙ্গলবার দেয়াল ও পাহাড়ধসে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া, রাঙামাটির বাঘাইছড়ি এবং কক্সবাজারে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে।
বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন চট্টগ্রাম ও রাঙামাটি জেলার বুধবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণাধীন সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বুধবার ও বৃহস্পতিবার বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। একই কারণে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত রয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান টিবিএসকে বলেন, 'গত রাতে চট্টগ্রাম মহানগর ও উপজেলাগুলোর বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ৩,০০০ পরিবার অবস্থান করছিলেন। রাতে বৃষ্টি কমেছিল। আবার সকালে বেড়েছে। চট্টগ্রামে মাঝারি থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় ১৫টি উপজেলা এবং মহানগরীর নিচু এলাকাগুলো প্লাবিত হয়ে অস্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, 'জেলায় ৬২৯টি আশ্রয় কেন্দ্র রয়েছে। প্রয়োজন অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি আছে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় মহানগর এলাকায় আরও ৮টি আশ্রয়কেন্দ্র সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা হয়েছে।'
বৈরী আবহাওয়ার প্রভাবে চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য খালাস কার্যক্রম ব্যাহত হলেও শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। বিমানবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রকৌশলী ইব্রাহিম খলিল টিবিএসকে বলেন, 'বৈরী আবহাওয়ার কারণে গতকাল মঙ্গলবার তিনটি ফ্লাইট চট্টগ্রামের পরিবর্তে ঢাকায় অবতরন করেছিল। পরে আবার চট্টগ্রামে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। কিছু ফ্লাইট বিলম্ব হয়েছিল। আজ পরিস্থিতি স্বাভাবিক।'
এদিকে রেললাইনে পানি ওঠায় মঙ্গলবার দুপুর থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। নগরীর মুরাদপুর সুন্নিয়া মাদ্রাসাসহ কয়েকটি এলাকায় রেললাইন তলিয়ে যাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মঙ্গলবার পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেনটি প্রায় আট ঘণ্টা ষোলশহর স্টেশনে আটকে থাকার পর চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে ফিরিয়ে আনা হয়। বুধবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ।
রেলওয়ের চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা ফারহান মাহমুদ টিবিএসকে বলেন, 'চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটের ট্রেন বন্ধ আছে। কক্সবাজার থেকে যেসব ট্রেন ঢাকায় ছাড়ার কথা, সেগুলো চট্টগ্রাম থেকে ছাড়ছে। আবার কক্সবাজার পর্যন্ত না গিয়ে চট্টগ্রামেই যাত্রা শেষ করছে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা ট্রেনগুলো। পর্যটক ট্রেনের যাত্রা বাতিল হয়েছে। টিকিটের মূল্য রিফান্ড করা হচ্ছে।'
টানা বৃষ্টির কারণে দুর্ঘটনা এড়াতে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের সব ঝরনায় পর্যটকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে বন বিভাগ। আগামী শুক্রবার পর্যন্ত উপজেলার সব ঝরনায় পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ থাকবে। মঙ্গলবার চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বারৈয়ারঢালা রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আশরাফুল আলম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
