চট্টগ্রামে নগরে জলাবদ্ধতা কমলেও উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি
মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে টানা পঞ্চম দিনের ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা কিছুটা কমলেও জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও পার্বত্য অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) বিকাল ৩টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ২১৪ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
টানা বৃষ্টিতে সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমার ১৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একই সঙ্গে ডলু, টঙ্কাবতী, মাইনী ও চেঙ্গী নদীর পানিও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে দক্ষিণ চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসনের প্রস্তুতির কথা তুলে ধরে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞাঁ বলেন, 'প্রতিটি উপজেলায় পৃথক কন্ট্রোল রুম এবং জেলা প্রশাসনের কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুম ২৪ ঘণ্টা চালু রয়েছে।'
তিনি বলেন, 'সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাপ্তাহিক ছুটিসহ সব ধরনের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, 'জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ৬২৯টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁশখালী ও সাতকানিয়ার জন্য ১০টি স্পিডবোট প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি দুর্গত এলাকাগুলোতে শুকনো ও রান্না করা খাবার পাঠানো হচ্ছে।'
জেলা ও উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং করে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য চাল, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, শিশুখাদ্য, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।
নগর: জলাবদ্ধতা কমলেও দুর্ভোগ শেষ হয়নি
চট্টগ্রাম নগরে সকাল থেকে বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমেছে পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে থাকা পানিও নামতে শুরু করেছে। তবে কিছু কিছু এলাকায় সড়কের পানি নেমে গেলেও ঘর-বাড়িতে পানি আটকে থাকায় বাসিন্দারা চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন। অনেক বাসা এখনও বসবাসের অনুপযোগী হয়ে আছে।
অফিস-আদালত, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতে দুর্ভোগ অব্যাহত রয়েছে। অনেক সড়কে যানবাহনের চাপ কমে গেছে। তবে টানা বর্ষণের ফলে পাহাড়ধসের ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
বাঁশখালী: সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি
বাঁশখালীতে টানা বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের প্রভাবে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কাথারিয়া, খানখানাবাদ, গুনাগরী, বাহারছড়া, পূর্ব ইলশা, ডুমুরিয়া, গণ্ডামারা, জলদি, শেখেরখীল ও ছনুয়াসহ অধিকাংশ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
পাঁচ শতাধিক মাটির ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক পাকা ও আধাপাকা বাড়িতেও হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি জমেছে।
কৃষিজমি, আমনের বীজতলা, মাছের ঘের ও বসতভিটা তলিয়ে যাওয়ায় শতকোটি টাকারন ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রায় ৬০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় বিশুদ্ধ পানি, শিশুখাদ্য, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ের অধিকাংশ গ্রামীণ সড়ক ডুবে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে।
বৈলছড়ি ইউনিয়নের চেচুরিয়ায় পানিবন্দি একটি পরিবারকে উদ্ধার করতে গিয়ে আট মাস বয়সী এক শিশুকে বড় পাতিলে বসিয়ে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন বলেন, 'বুধবার থেকেই মাইকিং করে মানুষকে বন্যা সম্পর্কে সতর্ক করা হচ্ছে এবং আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। উপজেলায় ১১০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।'
সাতকানিয়া: সাঙ্গু তীরবর্তী ইউনিয়নে বন্যার তীব্রতা
সাতকানিয়ায় সাঙ্গু নদী, ডলু নদী ও স্থানীয় খালের পানি বেড়ে উপজেলার প্রায় সব নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাঙ্গু নদীর তীরবর্তী বাজালিয়া, কেঁওচিয়া, ছদাহা, কালিয়াইশ, ধর্মপুর, খাগরিয়া ও আমিলাইষ ইউনিয়ন। এছাড়া ঢেমশা, নলুয়া, চরতি ও পুরানগড় ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকাও পানিতে তলিয়ে গেছে।
বসতবাড়ি, কৃষিজমি, মাছের ঘের, দোকানপাট ও অভ্যন্তরীণ সড়ক ডুবে যাওয়ায় লাখো মানুষ পানিবন্দি। কোথাও নৌকাই একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। আমনের বীজতলা, সবজিখেত ও মাছের খামারে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
বন্যা পরিস্থিতির কারণে উপজেলার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা দুই দিনের জন্য স্থগিত করা হয়েছে।
লোহাগাড়া: ডলু নদীর পানি লোকালয়ে
লোহাগাড়ায় ডলু নদীর পানি বেড়ে বিভিন্ন স্থানে বেড়িবাঁধ উপচে ও ভেঙে লোকালয়ে প্রবেশ করেছে। আধুনগরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে।
খাগড়াছড়ি: সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, বিদ্যুৎহীন সাজেক
চেঙ্গী ও মাইনী নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় খাগড়াছড়ির দীঘিনালা, মহালছড়ি ও সদর উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। দীঘিনালা-লংগদু, দীঘিনালা-সাজেক এবং খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
বন্যার পানিতে দীঘিনালা ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র তলিয়ে যাওয়ায় দীঘিনালা ও সাজেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে মোবাইল নেটওয়ার্ক, ইন্টারনেট, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ও পর্যটন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। জেলায় ১৩৫টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়া: দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি
কক্সবাজারের চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়ায় টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে মাতামুহুরী নদীর পানি বেড়ে ব্যাপক বন্যা দেখা দিয়েছে। তিন উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন। বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গ্রামীণ সড়ক, কৃষিজমি ও মাছের ঘের পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়নে পাহাড়ধসে দুই ভাইবোনের মৃত্যু হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। প্রশাসন ৩০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দের পাশাপাশি শুকনো খাবার বিতরণ এবং আশ্রয়কেন্দ্র চালু রেখেছে।
ফটিকছড়ি, রাউজান, হাটহাজারী, মিরসরাই ও আনোয়ারা: নিম্নাঞ্চল প্লাবিত
টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ফটিকছড়ি, রাউজান, হাটহাজারী, মিরসরাই ও আনোয়ারার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলেও পানি বেড়েছে। অনেক গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে। বসতবাড়ি, কৃষিজমি ও মাছের ঘেরে পানি ঢুকে পড়েছে। কোথাও কোথাও মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের প্রয়োজন হলে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে।
