কূটনৈতিক টানাপোড়েনে আখাউড়া স্থলবন্দরে আশানুরূপ বাড়েনি রপ্তানি আয়, কমেছে রাজস্বও
সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া স্থলবন্দরে রপ্তানি আয় আশানুরূপ বাড়েনি। গত অর্থবছরে বন্দরটি দিয়ে রপ্তানি আয় বেড়েছে মাত্র ৯ কোটি ৬৮ লাখ ৬৫ হাজার ১৭৯ টাকা। পাশাপাশি নিয়মিত পণ্য আমদানি না হওয়ায় বন্দরটির রাজস্ব আয়ও আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপোড়েনের জেরে বাংলাদেশ থেকে কয়েকটি উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয় ভারত সরকার। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে আখাউড়া স্থলবন্দরের রপ্তানি বাণিজ্যে।
তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে ভারতের সঙ্গে পণ্য আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য চলছে। আমদানির চেয়ে রপ্তানি তুলনামূলক বেশি হওয়ায় এটি মূলত রপ্তানিমুখী বন্দর হিসেবে বিবেচিত হয়। এখান থেকে প্রতিদিন হিমায়িত মাছ, রড, সিমেন্ট, ভোজ্যতেলসহ বিভিন্ন পণ্য ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে রপ্তানি হয়। বর্তমানে মোট রপ্তানি হওয়া পণ্যের প্রায় অর্ধেকই হিমায়িত মাছ।
তবে ২০২৫ সালের ১৭ মে বাংলাদেশ থেকে বেশ কয়েকটি পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয় ভারত সরকার। এক বছরেরও বেশি সময় পার হলেও এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়নি। এর ফলে বন্দরে পণ্য রপ্তানি কমেছে।
বন্দরের আমদানি-রপ্তানিকারক রাজীব উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, 'ভারতের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা প্লাস্টিক, প্রক্রিয়াজাত খাবার, ফলের স্বাদযুক্ত জুস, পিভিসি সামগ্রী এবং তুলার মতো উচ্চ চাহিদা সম্পন্ন পণ্যগুলো রপ্তানি না করতে পারায় বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। হিমায়িত মাছের পর সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হতো প্লাস্টিক, প্রক্রিয়াজাত খাবার ও পিভিসি সামগ্রী।'
বন্দরের ব্যবসায়ীদের অনীহার কারণে গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে কোনো পণ্যই আমদানি করা হয়নি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই রাজস্ব আয় কমে গেছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, আখাউড়া দিয়ে আমদানির অনুমতি থাকা অধিকাংশ পণ্যই ত্রিপুরার বাইরের রাজ্য থেকে আনতে হয়। এতে পরিবহন ও আমদানি খরচ মিটিয়ে কাঙ্ক্ষিত মুনাফা করা সম্ভব হয় না।
আখাউড়া স্থল শুল্ক স্টেশন সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই বন্দর দিয়ে ভারতে ৫২৪ কোটি ২ লাখ ৮৯ লাখ ২৩৮ টাকার পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছিল ৫১৪ কোটি ৩৪ লাখ ২৪ হাজার ৫৯ টাকার পণ্য। অর্থাৎ রপ্তানি বেড়েছে মাত্র ৯ কোটি ৬৮ লাখ টাকার কিছু বেশি।
অন্যদিকে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত থেকে আমদানি হয়েছে মাত্র ১ কোটি ৯৬ লাখ ৩৩ হাজার ৭৪০ টাকার চাল, আগরবাতি ও জিরা। এ থেকে সরকারের রাজস্ব এসেছে ৭১ লাখ ৩২ হাজার ৫৯৩ টাকা। অথচ এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৭ কোটি ৩১ লাখ ৮২ হাজার ৭৫৯ টাকার জিরা, ডাল ও কাজু বাদাম আমদানির বিপরীতে রাজস্ব এসেছিল ৪ কোটি ১৬ লাখ ৮৪ হাজার ৬১৯ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে রাজস্ব আয় কমেছে প্রায় ৩ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।
পণ্য আমদানি বাড়াতে বন্দর দিয়ে সব ধরনের পণ্য আমদানির অনুমতি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। বন্দরের ব্যবসায়ী মো. নাসির উদ্দিন বলেন, 'স্থানীয় বাজারে যখন যে পণ্যের চাহিদা তৈরি হবে, সেই পণ্য আমদানির জন্য বন্দর দিয়ে সব ধরনের পণ্য আমদানির অনুমতি দিতে হবে। অন্যথায় পণ্য আমদানি বাড়া বা নিয়মিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ দিনের পর দিন লোকসান দিয়ে কেউ পণ্য আমদানি করবে না।'
আখাউড়া স্থলবন্দর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি নিছার উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, 'অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে যে টানাপোড়েন ছিল, তা এখন অনেকটাই কেটে গেছে। তবে আমরা আশা করেছিলাম নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারত আমদানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে। কিন্তু সেটি না করায় এবার আমাদের রপ্তানি আয় আশানুরূপভাবে বাড়েনি। আমাদের দাবি থাকবে, দুই দেশের সরকার আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত নিষেধাজ্ঞাটি প্রত্যাহারের ব্যবস্থা করবে।'
এ বিষয়ে আখাউড়া স্থল শুল্ক স্টেশনের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা সাদরুল হাসান চৌধুরী বলেন, পণ্য আমদানি অনিয়মিত হওয়ার কারণে রাজস্ব কিছুটা কমেছে। তবে আমদানি-রপ্তানি বাড়াতে ব্যবসায়ীদের সব ধরনের সহযোগিতা দিচ্ছে শুল্ক কর্তৃপক্ষ। ব্যবসায়ীদের সব পণ্য আমদানির অনুমতি দেওয়ার দাবিটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
