পোশাক-বহির্ভূত রপ্তানি বেড়েছে, কিন্তু আরএমজি খাতে রপ্তানির গতি কমায় মোট আয় একই থাকছে
চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় প্রায় একই আছে। তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের বাইরে অন্য কিছু পণ্যের রপ্তানি সামান্য বাড়লেও পোশাক রপ্তানি ধারাবাহিকভাবে কমার প্রভাবে মোট আয়ের চিত্র অপরিবর্তিত রয়েছে। এটি মূলত একটিমাত্র রপ্তানি খাতের ওপর অর্থনীতির অতিনির্ভরশীলতারই প্রতিফলন।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুসারে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে মোট রপ্তানি আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৮.৪১ বিলিয়ন ডলার—গত বছরের একই সময়ের তুলনায় যা ১.৯৩ শতাংশ কম। তবে মাসওয়ারি হিসাবে ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে রপ্তানি ১১.২২ শতাংশ বেড়ে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে।
দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮১ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত থেকে। আলোচ্য সময়ে এ খাতে রপ্তানি আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২.৪৩ শতাংশ কমেছে। ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য, চামড়াজাত পণ্য, পাটপণ্য, হিমায়িত মাছ ও হোম টেক্সটাইলের মতো পোশাক-বহির্ভূত খাতের কয়েকটি পণ্যে মাঝারি প্রবৃদ্ধি হলেও পোশাক খাতের মন্দার কারণে সামগ্রিক রপ্তানি পরিস্থিতির ওপর নেতিবাচক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
জুলাই-জানুয়ারি সময়ে আরএমজি খাত থেকে রপ্তানি আয় এসেছে ২২.৯৮ বিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কম। এ খাতের মধ্যে নিটওয়্যার রপ্তানি কমেছে ৩.১৩ শতাংশ ও ওভেন পোশাকের রপ্তানি কমেছে ১.৬০ শতাংশ। আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদার ঘাটতি এবং অব্যাহত মূল্যচাপ রপ্তানি কমার মূল কারণ হিসেবে উঠে আসছে।
অন্যদিকে তৈরি পোশাক-বহির্ভূত খাতগুলোতে তুলনামূলক শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখা করা গেছে। যদিও সামগ্রিক রপ্তানিতে এসব খাতের হিস্যা এখনো কম।
ইপিবির তথ্য বলছে, ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য রপ্তানি প্রায় ২৬ শতাংশ বেড়েছে। পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে বাইসাইকেল (৩১ শতাংশ বৃদ্ধি) ও ইলেকট্রনিক পণ্য (২৬.৮ শতাংশ বৃদ্ধি) রপ্তানি বেড়ে যাওয়া।
এ সময়ে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি বেড়েছে ৫.৭ শতাংশ। অন্যদিকে হোম টেক্সটাইল খাতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩.৩ শতাংশ। আর পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি ২ শতাংশের সামান্য বেশি বেড়েছে।
নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএ-র সহ-সভাপতি ফজলে এহসান শামীম টিবিএসকে বলেন, বৈশ্বিক ও স্থানীয় দুই কারণেই রপ্তানি কমেছে।
'বৈশ্বিক কারণের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের অর্ডার কমেছে, ট্যারিফ বাবদ ক্রেতাদের ব্যয় করতে হচ্ছে বেশি। আবার যুক্তরাষ্ট্র ভারত ও চীনের ওপর বেশি রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ আরোপ করায় এই দুটি দেশের রপ্তানিকারকরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে প্রবেশ করেছে। ভারত চীনের কারণে ইইউর বাজার থেকেও অর্ডার কমেছে,' বলেন তিনি।
শামীম আরও বলেন, এর বাইরে দেশে নির্বাচন সামনে রেখে অনেক ক্রেতা অর্ডার কমিয়ে দিয়েছেন। নির্বাচনের সময় কোনো অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে সময়মতো পণ্য পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা হতে পারে, এমনটা কথা ভেবে বড় ক্রেতারা ২০ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত অর্ডার কমিয়েছে।
ডিবিএল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান এম এ রহিম ফিরোজ বলেন, অতীত অভিজ্ঞতা হচ্ছে নির্বাচনের আগে ও পরে বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার কমিয়ে দেয়। গত ৩০ বছর ধরেই এমন দেখা যাচ্ছে। আগামী দুই মাসও রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কমবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির জন্য এপ্রিল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
টানা ষষ্ঠ মাসের মতো রপ্তানি আয়ে পতন
২০২৬ সালের জানুয়ারিতেও বাংলাদেশের রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে। এ নিয়ে টানা ছয় মাস ধরে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি কমল। জানুয়ারিতে বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৪.৪১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা ২০২৫ সালের জানুয়ারির ৪.৪৩ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ০.৫০ শতাংশ কম।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২০ সালে বিশ্বব্যাপী কোভিড লকডাউনের কারণে টানা রপ্তানি কমছিল। এছাড়া এভাবে টানা ছয় মাস পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে রপ্তানি কমার রেকর্ড নিকট অতীতে নেই।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে রপ্তানি আয় ছিল ৪.৭৭ বিলিয়ন ডলার। এরপরের মাস আগস্টে ৩.৯১ বিলিয়ন ডলার, সেপ্টেম্বরে ৩.৬২ বিলিয়ন ডলার, অক্টোবরে ৩.৮২ বিলিয়ন ডলার, নভেম্বরে ৩.৮৯ বিলিয়ন ডলার ও ডিসেম্বরে ৩.৯৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে।
অর্থাৎ অর্থবছরের শুরুতে বিশ্ববাজারে রপ্তানি যে পর্যায়ে ছিল, পরে সেটি বেশ কমেছে। গত বছরের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যে পাল্টা শুল্ক আরোপ করার ফলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এই রপ্তানি বাজারের চাহিদায় টান পড়ে। এর প্রভাব পড়ে অন্যান্য বাজারেও। তবে পরের মাসগুলোতে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাইয়ে ৩.৮২ বিলিয়ন ডলার, আগস্টে ৪.০৩ বিলিয়ন ডলার, সেপ্টেম্বরে ৩.৮০ বিলিয়ন ডলার, অক্টোবরে ৪.১৩ বিলিয়ন ডলার, নভেম্বরে ৪.১২ বিলিয়ন ডলার ও ডিসেম্বরে ৪.৬২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছিল।
তৈরি পোশাক রপ্তানি কিছুটা কমেছে
দেশের প্রধান রপ্তানিপণ্য তৈরি পোশাক রপ্তানি আগের বছরের জানুয়ারির তুলনায় এ বছরের জানুয়ারিতে ১.৩৫ শতাংশ কমেছে। এ বছরের জানুয়ারিতে ৩.৬১ বিলিয়ন ডলারের ওভেন ও নিট পোশাক রপ্তানি হয়েছে—যা ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ছিল ৩.৬৬ বিলিয়ন ডলার। তবে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের তুলনায় এ বছরের জানুয়ারিতে তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ১১.৭৭ শতাংশ।
জানুয়ারি মাসে জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, জাপান, ডেনমার্ক, অষ্ট্রেলিয়া, সুইডেন, বেলজিয়াম ও তুরস্কে ডিসেম্বরের তুলনায় রপ্তানি কমেছে। অন্যদিকে এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ষ্পেন, নেদারল্যান্ড, পোল্যান্ড, ভারত, কানাডা, চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে রপ্তানি বেড়েছে।
অন্যদিকে ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে ভারতে রপ্তানি বেড়েছে সবচেয়ে বেশি—১৯.২৩ শতাংশ। জানুয়ারিতে ভারতে ১৬৬ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা ডিসেম্বরে ছিল ১২৭ মিলিয়ন ডলার। তবে চলতি অর্থবছরের সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) বাংলাদেশ থেকে ভারতে পণ্য রপ্তানি কমেছে ৪.৯৮ শতাংশ। গত সাত মাসে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ১.০৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের ছিল ১.১০ বিলিয়ন ডলার।
