উপসাগরীয় দেশগুলোতে কমলেও বছরের প্রথমার্ধে ইউরোপে কর্মী যাওয়া বেড়েছে ৪৬%
ইরান সংঘাতের প্রভাব এবং সৌদি আরবের ভিসা বিধিনিষেধ কঠোর হওয়ার কারণে উপসাগরীয় দেশগুলোতে জনশক্তি রপ্তানি কমে যাওয়ায় চলতি বছরের প্রথমার্ধে বাংলাদেশের সামগ্রিক বিদেশগামী কর্মসংস্থান কমেছে। তবে এর মধ্যেও ইউরোপে বাংলাদেশিদের বৈধ অভিবাসন বেড়েছে।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৫ জুন পর্যন্ত ১৮ হাজার ২২০ জন বাংলাদেশি বৈধভাবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গেছেন। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১২ হাজার ৪৪৫।
সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ইউরোপে বাংলাদেশিদের বৈধ অভিবাসন বেড়েছে ৪৬ দশমিক ৪ শতাংশ।
অন্যদিকে, একই সময়ে উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মী নিয়োগ ৩৮ দশমিক ২ শতাংশ কমে ২ লাখ ৫৭ হাজার ৯৬৭ জনে নেমেছে, যা এক বছর আগে ছিল ৪ লাখ ১৭ হাজার ৩৪৩। এতে বাংলাদেশের মোট বিদেশগামী কর্মসংস্থান বাৎসরিক হিসাবে প্রায় ২৮ শতাংশ কমেছে।
২০২৫ সালে ইউরোপে বৈধ অভিবাসনে বড় ধরনের ঘুরে দাঁড়ানোর ধারাবাহিকতায় চলতি বছরও এ প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালে ইউরোপে বৈধ অভিবাসন বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩ হাজার ৭৭৭ জনে, যা ২০২৪ সালে ছিল ২২ হাজার ২৭১। আগের বছরের ৪৬ হাজার ৪৫৫ জন থেকে ২০২৪ সালে ইউরোপমুখী বৈধ অভিবাসন ৫০ শতাংশের বেশি কমে গিয়েছিল।
বিএমইটির তথ্য বলছে, ইরান সংঘাত ও সৌদি ভিসা বিধিনিষেধ উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মী নিয়োগকে বড়ভাবে প্রভাবিত করলেও ইউরোপে বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা স্থিতিশীল রয়েছে।
এই প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে ইতালিকে কেন্দ্র করে। মানবপাচার রোধ এবং বৈধ অভিবাসন উৎসাহিত করতে বাংলাদেশ ও ইতালি—দুই সরকারের নতুন উদ্যোগের পর দেশটি ইউরোপে বাংলাদেশি কর্মীদের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার হিসেবে উঠে এসেছে।
২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ইতালি ৪ হাজার ৬৪৫ জন বাংলাদেশি কর্মী নিয়েছে। ২০২৫ সালে দেশটি ৯ হাজার ৩৬৫ জন বাংলাদেশি কর্মী নিয়েছিল, যা ২০২৪ সালে ছিল মাত্র ১ হাজার ১৬২ জন। দেশটি মূলত কৃষি ও সংশ্লিষ্ট খাতের জন্য মৌসুমি কর্মী নিয়োগ করে।
পর্তুগাল, সার্বিয়া, রোমানিয়া, রাশিয়া ও বেলারুশেও কর্মী নিয়োগ বাড়ছে, যা উপসাগরীয় দেশগুলোর বাইরে বাংলাদেশের বিদেশি শ্রমবাজার বৈচিত্র্যকরণের প্রচেষ্টাকে প্রতিফলিত করছে।
ইতালির সাফল্যের পর সরকার সাতটি ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে শ্রম অভিবাসন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। দেশগুলো হলো—সার্বিয়া, গ্রিস, নর্থ মেসিডোনিয়া, রোমানিয়া, পর্তুগাল ও রাশিয়া।
মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক অস্থিরতার পর উপসাগরীয় শ্রমবাজারের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টার অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১৫ এপ্রিল সংসদে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, সরকার ইউরোপে বিকল্প বিদেশি কর্মসংস্থানের গন্তব্য খুঁজতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মী নিয়োগ যখন দুর্বল হচ্ছে এবং বাংলাদেশি কর্মীদের একসময়ের বড় গন্তব্য মালয়েশিয়া প্রায় দুই বছর ধরে অনেকটাই বন্ধ রয়েছে, তখন ইউরোপে এ প্রবৃদ্ধি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।
তবে তারা সতর্ক করে বলেন, বাংলাদেশের বিদেশগামী কর্মসংস্থানে ইউরোপের অংশ এখনো খুবই কম।
ইউরোপে বৈধ অভিবাসন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সেখানে গেছেন মাত্র ১৮ হাজার ২২০ জন বাংলাদেশি, যা দেশের মোট বিদেশগামী কর্মসংস্থানের ৫ শতাংশের কিছু বেশি।
শ্রম রপ্তানিকারকরা বলছেন, এ সংখ্যা এখনো অঞ্চলটির সম্ভাবনার তুলনায় অনেক কম।
তারা বলছেন, দক্ষ কর্মীর পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকা, নথি জালিয়াতির কারণে ভিসা অনুমোদনের হার কমে যাওয়া এবং কয়েকটি গন্তব্য দেশের নিয়োগকারীদের আস্থা কমে যাওয়ার কারণে ইউরোপের ক্রমবর্ধমান শ্রমিক সংকটের সুযোগ কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ।
পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া ও স্লোভেনিয়ার মতো পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোর পাশাপাশি ক্রোয়েশিয়া, কসোভো, আলবেনিয়া ও মন্টেনেগ্রোর মতো বলকান দেশগুলোর নিয়োগকারীরা বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগে ক্রমেই অনাগ্রহী হয়ে উঠছেন। তাদের উদ্বেগ, অনেক বাংলাদেশি কর্মী কর্মস্থল ছেড়ে পশ্চিম ও উত্তর ইউরোপের বেশি মজুরির গন্তব্যে চলে যান।
পূর্ব ইউরোপ ও বলকানে নতুন সুযোগ
এসব উদ্বেগ সত্ত্বেও পর্তুগাল, সাইপ্রাস, মলদোভা, বেলারুশ, সার্বিয়া, নর্থ মেসিডোনিয়া এবং বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাসহ কয়েকটি উদীয়মান গন্তব্যে শ্রমিকের চাহিদা বাড়ছে।
ইউরোপে কর্মী পাঠাতে বিশেষায়িত বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সি ইনফিনিটি এইচসিএম লিমিটেড চলতি বছর মলদোভায় ৩৭ জন কর্মী পাঠিয়েছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় দল ছিল ১৯ জন কংক্রিট শ্রমিকের। এছাড়া ছয়জন পেভিং স্টোন ইনস্টলার এবং চারজন কৃষি শ্রমিকও পাঠিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
কোম্পানিটি বলছে, মলদোভা ওয়েল্ডার, মেকানিক, ভারী যন্ত্রপাতি অপারেটর ও চালকের মতো দক্ষ কর্মী খুঁজছে। পাশাপাশি নির্মাণ, কৃষি ও সাধারণ শ্রম খাতে কম দক্ষ কর্মীদেরও সুযোগ রয়েছে।
দক্ষতা, পেশা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মাসিক বেতন সাধারণত ৫০০ ডলার থেকে ১ হাজার ডলারের বেশিও হয়ে থাকে।
ইনফিনিটি এইচসিএম লিমিটেডের চেয়ারম্যান শারমিন আফরোজ সুমি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "যেসব কর্মীর হাতে-কলমে দক্ষতা, সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতা এবং শেখার আগ্রহ আছে, নিয়োগকারীরা তাদের ক্রমেই বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। নিয়োগকারীদের কারিগরি চাহিদা পূরণ করতে পারে—এমন পর্যাপ্ত দক্ষ কর্মীর ঘাটতি অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।"
তিনি আরও বলেন, "আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো, গন্তব্য দেশে পৌঁছানোর পর কিছু কর্মীর অবৈধভাবে অন্য ইউরোপীয় দেশে চলে যাওয়ার প্রবণতা। এতে নিয়োগকারীদের আস্থা কমেছে এবং নিয়োগ ও তদারকি প্রক্রিয়া আরও কঠোর হয়েছে।"
কর্মী কম গেলেও ইউরোপ থেকে রেমিট্যান্স আসে বেশি
ইউরোপের আকর্ষণ শুধু বৈধ অভিবাসনেই নয়, অনিয়মিত অভিবাসনেও প্রতিফলিত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ২৪ হাজার ৩১৮ জন বাংলাদেশি অবৈধ সমুদ্র ও স্থলপথে ইউরোপে পৌঁছেছেন, যা আগের বছরের তুলনায় ৫৯ শতাংশ বেশি।
এতে বোঝা যায়, ইউরোপের শ্রমবাজারে বেশি আয়ের সুযোগ থাকায় সেখানে যাওয়ার আগ্রহ বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে থাকা বাংলাদেশি অভিবাসীরা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে প্রায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। একই সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এসেছে ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার, যদিও আমিরাতে যুক্তরাজ্যের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বাংলাদেশি কর্মী রয়েছেন।
আইওএমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইউরোপে প্রায় ৯ লাখ ৪৪ হাজার বাংলাদেশি নাগরিক বসবাস করছিলেন, যার মধ্যে ৬ লাখ ৫২ হাজার ছিলেন যুক্তরাজ্যে। অনানুষ্ঠানিক হিসাবে, অনথিভুক্ত অভিবাসীসহ ইউরোপে মোট বাংলাদেশির সংখ্যা এখন প্রায় ১৫ লাখে পৌঁছেছে, যেখানে উপসাগরীয় দেশগুলোতে এ সংখ্যা ৬০ লাখের বেশি।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্স প্রবাহের ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ এসেছে ইউরোপ থেকে। একই সময়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর অবদান ছিল ৪৩ দশমিক ৪ শতাংশ।
চলতি বছরের ২৫ জুন পর্যন্ত কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশে যাওয়া ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৬৫০ জন বাংলাদেশির মধ্যে প্রায় ৭২ শতাংশ গেছেন উপসাগরীয় দেশগুলোতে, আর ইউরোপে গেছেন মাত্র ৫ শতাংশ।
দক্ষতার ঘাটতি ও অনিয়মিত অভিবাসন বড় বাধা
ইউরোপের দেশগুলোতে নির্মাণ, উৎপাদন, কৃষি, পরিবহন, আতিথেয়তা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে শ্রমিক সংকট অব্যাহত রয়েছে, যা বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য উল্লেখযোগ্য সুযোগ তৈরি করছে।
তবে অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর্মীদের দক্ষতা না বাড়ালে এবং নিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে না পারলে বাংলাদেশ এসব সুযোগ হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।
বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, কয়েক বছর ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির পর ২০২৪ সালে ইউরোপে কর্মী নিয়োগ তীব্রভাবে কমে যায়। ওই বছর ইউরোপে ২২ হাজার ২৭১ জন কর্মী যান, যা ২০২৩ সালে ছিল ৪৬ হাজার ৪৫৫ জন।
বায়রার সাবেক মহাসচিব শামীমা আহমেদ চৌধুরী নোমান বলেন, "সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কিছু অভিবাসন কর্তৃপক্ষ ও নিয়োগকারীর আস্থা কমে যাওয়া। গন্তব্য দেশে পৌঁছানোর পর কিছু কর্মীর অবৈধভাবে অন্য ইউরোপীয় দেশে যাওয়ার চেষ্টার ঘটনায় বাংলাদেশি ভিসা আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই আরও কঠোর হয়েছে।"
তিনি আরও বলেন, "এর পাশাপাশি অনেক কর্মী কারিগরি দক্ষতা ও কাজের পারফরম্যান্সের ক্ষেত্রে নিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেন না, যা ভবিষ্যৎ নিয়োগেও প্রভাব ফেলছে।"
তিনি উল্লেখ করেন, ইউরোপের কয়েকটি দেশের ভিসা আবেদন বাংলাদেশে নয়, বরং বিশেষ করে ভারতে অবস্থিত দূতাবাসের মাধ্যমে প্রক্রিয়া করা হয়।
তিনি বলেন, "ভারতের ভিসা পেতে জটিলতা অনেক সময় নিয়োগ প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত ও জটিল করে তোলে।"
