কয়েক লাখ অভিবাসী কর্মীকে ছাঁটাইয়ের নির্দেশ দিল যুক্তরাষ্ট্র
মানবিক কর্মসূচির অধীনে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা কয়েক লাখ বিদেশি কর্মীকে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ছাঁটাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত শুক্রবার দেশটির ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি নিয়োগকর্তাদের এই সিদ্ধান্তের কথা জানায়। উল্লেখ্য, ট্রাম্প প্রশাসন আগে থেকেই এই কর্মসূচিটি বন্ধ করার চেষ্টা করছিল।
মার্কিন নাগরিকত্ব ও অভিবাসন বিষয়ক সংস্থার (ইউএসসিআইএস) নোটিশ অনুযায়ী, 'টেম্পোরারি প্রোটেক্টেড স্ট্যাটাস' (টিপিএস) থাকা হাইতির নাগরিকদের কাজের অনুমতি শেষ হবে আগামী ২৪ জুলাই। এ ছাড়া ইথিওপিয়া, মিয়ানমার, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান, সিরিয়া এবং ইয়েমেনের নাগরিকদের জন্য এই সময়সীমা ১৭ জুলাই পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
গত মাসে সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের পরই এই নির্দেশনা এল। ওই রায়ে হাইতি ও সিরিয়ার নাগরিকদের জন্য থাকা টিপিএস সুরক্ষা সুবিধা বাতিলের ক্ষমতা ট্রাম্প প্রশাসনের হাতে বজায় রাখা হয়।
এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে সংশ্লিষ্ট নাগরিকরা ডিপোর্টেশনের ঝুঁকিতে পড়বেন। এই কর্মসূচির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার হাইতিয়ান এবং ৬ হাজার ১০০ সিরীয় নাগরিক বসবাস করছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা গৃহযুদ্ধের কারণে নাগরিকরা নিজ দেশে ফিরতে না পারলে, মার্কিন সরকার মানবিক বিবেচনায় এই বিশেষ মর্যাদা দেয়।
অ্যাডভোকেসি গ্রুপ 'ন্যাশনাল ইমিগ্রেশন ফোরাম'-এর তথ্য অনুযায়ী, অন্য পাঁচটি দেশের আরও প্রায় ২০ হাজার মানুষ এই সুবিধার আওতায় রয়েছেন।
ইউএসসিআইএস অল্প সময়ের ব্যবধানে এই কাজের অনুমতির মেয়াদ বাড়াচ্ছিল। সংস্থাটি প্রথমে এই মেয়াদ ১ জুলাই পর্যন্ত নির্ধারণ করেছিল। তবে গত সপ্তাহে সব দেশের নাগরিকদের জন্য তা বাড়িয়ে ১০ জুলাই করা হয়। এরপর গত শুক্রবার আবারও এই মেয়াদ বাড়ানো হলো।
কিন্তু এই বর্ধিত মেয়াদের নোটিশ পৌঁছানোর আগেই অনেক নিয়োগকর্তা কর্মীদের ছাঁটাই করে দেন। অন্যদিকে কিছু নিয়োগকর্তা এই ভেবে কর্মীদের পে-রোলে (বেতন তালিকায়) রেখে দিয়েছিলেন যে, এই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায় কার্যকর হতে হয়তো আরও অন্তত ৩০ দিন সময় লাগবে।
আমেরিকান বিজনেস ইমিগ্রেশন কোয়ালিশন-এর আইনি উপদেষ্টা জ্যাকব মন্টি জানান, মেয়াদের তারিখ বারবার পরিবর্তন হওয়ায় অনেক নিয়োগকর্তাই বিভ্রান্তিতে পড়েছেন। তাদের আশঙ্কা ছিল, যুক্তরাষ্ট্রে কাজের অনুপযুক্ত কাউকে চাকরিতে রাখার কারণে তারা হয়তো বড় কোনো শাস্তির মুখে পড়তে পারেন।
একটি সাক্ষাৎকারে মন্টি বলেন, 'আমাদের এখনো আইনের শাসন আছে এবং টিপিএস এখনো বাতিল হয়ে যায়নি।' তিনি আরও বলেন, 'ইউএসসিআইএস বিষয়টি আরও স্পষ্ট করতে পারত। অনেক নিয়োগকর্তা এই অনিশ্চয়তার কারণে সময়ের আগেই কর্মীদের ছাঁটাই করে দিয়েছেন।'
হাইতির হাজার হাজার টিপিএস সুবিধাভোগী যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবা এবং বৃদ্ধাশ্রমে সেবাদাতা হিসেবে কাজ করেন। এ ছাড়া উৎপাদন, নির্মাণ ও পরিবহন শিল্পেও হাজার হাজার কর্মী এই কর্মসূচির মাধ্যমে কর্মরত রয়েছেন।
সুপ্রিম কোর্টের মামলায় থাকা হাইতি ও সিরিয়া ছাড়াও বাকি পাঁচটি দেশের কর্মীদের জন্য টিপিএস সুবিধা বন্ধের ইচ্ছা আগেই প্রকাশ করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। ফেডারেল আদালতের মামলার কারণে এত দিন এই সিদ্ধান্ত আটকে ছিল। তবে সুপ্রিম কোর্টের এই নতুন রায় একটি বড় নজির তৈরি করল। এর ফলে নিম্ন আদালতগুলোও এখন এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার অনুমতি দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নিয়োগকর্তাদের দেওয়া সরকারি নোটিশে সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, ফেডারেল আদালতগুলোও এখন উচ্চ আদালতের পথ অনুসরণ করে প্রশাসনের পক্ষেই রায় দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে হাইতি ও সিরিয়ার নাগরিকদের আইনজীবীদের দাবি, এই টিপিএস সুবিধা বাতিল করার সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, পূর্বপরিকল্পিত এবং জাতিগত বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ।
মার্কিন সরকার সম্প্রতি লেবাননের নাগরিকদের জন্য এই মানবিক সুবিধা বাড়ালেও, সুপ্রিম কোর্টের এই রায় অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রেও এটি বাতিলের প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করবে। যেমন—আগামী সেপ্টেম্বরের শুরুতে এল সালভাদরের প্রায় ২ লাখ নাগরিকের এই সুরক্ষা সুবিধা বাতিল হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
১৯৯০ সাল থেকে এই মানবিক কর্মসূচিটি চালু রয়েছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই এটিকে একটি স্থায়ী অভিবাসন প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করে আসছিল। কারণ আগের প্রশাসনগুলো বারবার মেয়াদ বাড়ানোর ফলে বহু মানুষ বছরের পর বছর ধরে এই সুবিধার আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন।
অভিবাসী অধিকার কর্মীরা ট্রাম্প প্রশাসনের এই উদ্যোগের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তারা জোর দিয়ে বলেছেন, সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকটি দেশের পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত নাজুক।
