মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত ও সৌদির কড়াকড়িতে জনশক্তি রপ্তানি কমে কোভিড-পূর্ব পর্যায়ে
গত চার মাসে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কর্মী পাঠানোর হার ব্যাপকভাবে কমেছে। জনশক্তি রপ্তানি খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং সৌদি আরবে কাগজপত্র যাচাইয়ে কঠোরতার কারণে শ্রম অভিবাসন কমেছে। আর এই ধীরগতির শ্রম অভিবাসন শেষ পর্যন্ত প্রবাসী আয়ের প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যদিও মে মাসে প্রবাসীরা দেশে ৩৪২ কোটি ডলার পাঠিয়েছেন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেশি; তবে সরকারি তথ্য ভিন্ন এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরছে।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে প্রতি মাসে বিদেশে কর্মসংস্থানের ছাড়পত্র পাওয়া কর্মীর সংখ্যা ৪৪ হাজার থেকে ৬৫ হাজারের মধ্যে রয়েছে। মহামারির পর প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১ লাখ কর্মী বিদেশে যাওয়ার তুলনায় এটি বড় ধরনের পতন। এর মাধ্যমে শ্রম অভিবাসন আবারও কোভিড-পূর্ব পর্যায়ে ফিরে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই ধীরগতি আগামী অর্থবছরে ১৪ লাখ কর্মী বিদেশে পাঠানোর সরকারি লক্ষ্যমাত্রার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে আগামী পাঁচ বছরে ১ কোটি মানুষের বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির নির্বাচনী অঙ্গীকারও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
কোভিড-১৯ মহামারির আগে বাংলাদেশ থেকে সাধারণত প্রতি মাসে ৬০ হাজার থেকে ৭০ হাজার কর্মী বিদেশে যেতেন। মে মাসে ৬০ হাজার ১১৯ জন কর্মী বিদেশে কর্মসংস্থানের ছাড়পত্র পেয়েছেন, যা এপ্রিলের তুলনায় ২৩ শতাংশ বেশি। তবে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ সংখ্যা এখনো প্রায় ৪৩ শতাংশ কম।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশে কর্মী নিয়োগে দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা অব্যাহত থাকলে দেশের শ্রম রপ্তানির গতি ধরে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়বে। মালয়েশিয়া, ওমান, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারগুলো যেন কম দক্ষ কর্মীদের জন্য পুনরায় খোলে সেজন্য কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিগগিরই প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া যেতে পারেন—এমন প্রত্যাশার মধ্যে জনশক্তি রপ্তানিকারকরা নতুন করে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন। তারা মনে করছেন, এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় খুলে যেতে পারে, যা শ্রম অভিবাসনের ধারা পুনরুজ্জীবিত করতে সহায়তা করবে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর ৮ জুন সংসদে জানান, আগামী অর্থবছরে প্রায় ১৪ লাখ কর্মী বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। চলতি অর্থবছরে এ সংখ্যা ছিল ৯ লাখ ৩৩ হাজার ৮১৫ জন।
তিনি বলেন, দক্ষ ও পেশাজীবী কর্মী পাঠানো বাড়িয়ে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণে সরকারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ৪৫ লাখ ৭০ হাজারের বেশি কর্মী বিদেশে গেছেন। এ সময়ে প্রতি মাসে গড়ে ৯৫ হাজারের বেশি কর্মী বিদেশে পাঠানো হয়েছে।
সৌদির বিধিনিষেধ ও সংঘাতের প্রভাব পড়েছে কর্মী নিয়োগে
সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশে কর্মী পাঠানোর হার কমে যাওয়ার পেছনে মূলত দুটি কারণকে দায়ী করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
তারা বলছেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানকে ঘিরে সংঘাত শুরুর পর আঞ্চলিক অস্থিরতার কারণে কয়েকটি গন্তব্য দেশে বাংলাদেশি কর্মীদের নতুন ভিসা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে কর্মী নিয়োগে ধীরগতি দেখা দিয়েছে এবং অনুমোদন প্রক্রিয়াও বিলম্বিত হচ্ছে।
একই সময়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরবও ভিসা ইস্যুতে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু কর্মী ভুয়া চাকরির চাহিদাপত্রের ভিত্তিতে পাওয়া ভিসা নিয়ে সৌদি আরবে প্রবেশ করলেও পরে প্রতিশ্রুত চাকরি পাননি।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিসের সাবেক যুগ্ম মহাসচিব টিপু সুলতান বলেন, তার এজেন্সিতে নতুন সৌদি ভিসার সংখ্যা কমেছে।
তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নতুন সৌদি ভিসার সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে গেছে। জুনে আমরা মাত্র দুই-তিনটি নতুন সৌদি ভিসা পেয়েছি। মে মাসে এ সংখ্যা ছিল ছয়-সাতটির মতো, আর তার আগের মাসে ছিল প্রায় ১০ থেকে ১২টি।"
সৌদি আরবের বিধিনিষেধের পর গন্তব্য দেশগুলোর নিয়োগকর্তাদের দেওয়া চাকরির চাহিদাপত্র সংশ্লিষ্ট দেশে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে সত্যায়িত করার শর্ত আরোপ করেছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
টিপু সুলতান বলেন, বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে এখন এমন কাগজপত্রের শর্ত পূরণ করতে হচ্ছে, যা প্রতিযোগী শ্রম রপ্তানিকারক দেশগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
তিনি বলেন, "নিয়োগকর্তাদের কাছ থেকে পাওয়া চাহিদাপত্র এখন বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে সত্যায়িত করে জমা দিতে বলা হচ্ছে। ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোকে এ ধরনের কাগজপত্রের শর্ত পূরণ করতে হচ্ছে না। কিন্তু বাংলাদেশি এজেন্সিগুলোকে অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে, যা নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ধীর করে দিচ্ছে।"
যুদ্ধ ঘিরে অনিশ্চয়তা অব্যাহত
রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে ১ হাজারের বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এতে বিদেশি নিয়োগকর্তারা আরও সতর্ক হয়ে পড়েছেন এবং নতুন নিয়োগাদেশ ও ভিসার আবেদন কমে গেছে।
তাদের মতে, চলমান অনিশ্চয়তার কারণেই বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৬৫ হাজার ৬৩৪ জন কর্মী বিদেশে কর্মসংস্থানের ছাড়পত্র পেয়েছেন। এরপর মার্চে এ সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৪৪ হাজার ৬৫৮ জনে। এপ্রিলে ৪৮ হাজার ৮৫৯ জন এবং মে মাসে ৬০ হাজার ১১৯ জন কর্মী ছাড়পত্র পেয়েছেন।
মে মাসে ৩০ হাজার ৫০৯ জন কর্মী নিয়ে সৌদি আরব ছিল বাংলাদেশি কর্মীদের শীর্ষ গন্তব্য। এরপর কাতারে গেছেন ৮ হাজার ৯০১ জন এবং সিঙ্গাপুরে ৫ হাজার ৬৮৩ জন।
সৌদি আরব এখনো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার হলেও কর্মী নিয়োগের সংখ্যা মহামারি-পরবর্তী ঊর্ধ্বগতির সময়ের তুলনায় অনেক কম।
রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো সতর্ক করে বলছে, ভিসা প্রক্রিয়া সহজ না হলে এবং প্রধান শ্রম আমদানিকারক দেশগুলোতে নিয়োগকর্তাদের আস্থা না ফিরলে বিদেশে কর্মসংস্থান কোভিড-পূর্ব পর্যায়ের কাছাকাছিই থেকে যেতে পারে। এতে প্রবাসী আয় বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক শ্রম রপ্তানি খাতে প্রভাব পড়তে পারে।
সরকারি কর্মকর্তা ও খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি তারা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং কঠোর কমপ্লায়েন্স শর্ত শ্রম অভিবাসনের ধরনকে নতুনভাবে প্রভাবিত করছে।
প্রচলিত বাজারের বাইরে নজর দেওয়ার পরামর্শ
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষক মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন সিকদার বলেন, প্রচলিত উপসাগরীয় শ্রমবাজারের বাইরে বাংলাদেশকে কর্মী পাঠানোর গন্তব্য বৈচিত্র্যময় করতে হবে।
তিনি বলেন, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপজুড়ে বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কম থাকায় এসব অঞ্চলের অনেক জায়গায় শ্রমিক সংকট দেখা দিচ্ছে। রাশিয়া, মধ্য এশিয়া ও আফ্রিকার কিছু অংশেও একই ধরনের চাহিদা বাড়ছে, বিশেষ করে জ্বালানি খাতে।
এসব সুযোগ কাজে লাগাতে দক্ষ কর্মী তৈরি, ভাষাভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং অভিবাসন কূটনীতি জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
প্রবাসী আয়ের পূর্বাভাস
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ৩৪২ কোটি ডলার। আগের বছরের একই মাসে এর পরিমাণ ছিল ২৯৭ কোটি ডলার। চলতি বছরের এপ্রিলের ৩১৩ কোটি ডলারের তুলনায়ও মে মাসে প্রবাসী আয় বেশি এসেছে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ৩ হাজার ২৭৬ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২ হাজার ৭৫১ কোটি ডলার।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, দীর্ঘ সময় ধরে জনশক্তি রপ্তানি কম থাকলে বর্তমানে প্রবাসী আয় শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও একপর্যায়ে এর প্রবাহ চাপের মুখে পড়তে পারে।
