মধ্যপ্রাচ্য সংকট: যুদ্ধের মূল্য দিতে যেভাবে চুরমার হচ্ছে বাংলাদেশি শ্রমিকদের স্বপ্ন
ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে বাড়তে থাকা যুদ্ধের উত্তেজনায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এক অস্থির পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এই সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়ছে অঞ্চলটিতে কর্মরত হাজার হাজার বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকের জীবনে। প্রতিনিয়ত আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা এবং আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়া আয়ের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা বাংলাদেশি 'রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের' স্বপ্ন এখন ফিকে হয়ে আসছে।
সম্প্রতি কুমিল্লার পাঁচজন অভিবাসী শ্রমিকের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরেছে রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (আরএমএমআরইউ)। তাদের বর্ণনায় উঠে এসেছে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির কথা; যেখানে একদিকে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া মিসাইলের শব্দ, আর অন্যদিকে দেশে থাকা পরিবারের দুশ্চিন্তা। নিরাপত্তা নাকি বেঁচে থাকা—এই কঠিন সমীকরণের সামনে দাঁড়িয়ে তারা দিশেহারা। ঋণের বোঝা, অসুস্থ বাবা-মা আর সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অনেকেই চাইলেও দেশে ফিরতে পারছেন না।
'মিসাইলের শব্দে মনে হয় এই বুঝি শেষ সময়'
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে কর্মরত কুমিল্লার চান্দিনার বাসিন্দা নাসির জানান তার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা। একটি চীনা কোম্পানিতে কর্মরত নাসির মার্কিন সামরিক ঘাঁটির কাছেই একটি লেবার ক্যাম্পে থাকেন। তিনি বলেন, 'কয়েক মিনিট পরপর মিসাইলের শব্দ শোনা যায়। ভয়ে বুক কেঁপে ওঠে। মনে হয় যেকোনো মুহূর্তে জীবন শেষ হয়ে যেতে পারে।'
নাসিরের পরিবার প্রতিনিয়ত আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। তিনি দেশে ফিরতে চান, কিন্তু ফিরলে চাকরি, ভিসা এবং আয়ের একমাত্র উৎস হারাবেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে প্রবাসে পড়ে আছেন বলে জানান তিনি।
আতঙ্কে ধস নেমেছে আয়ে
সৌদি আরবের জেদ্দায় কর্মরত সাইফুল ইসলাম জানান, এই সংঘাত তার রুজি-রোজগার শেষ করে দিয়েছে। আগে চালক হিসেবে কাজ করে তিনি মাসে ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা দেশে পাঠাতে পারতেন। এখন কাজ না থাকায় রেস্তোরাঁয় কাজ করে মাত্র ৩০ হাজার টাকা পাঠাতেও তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
সাইফুল বলেন, 'আমি আমেরিকান দূতাবাসের কাছে থাকি। সবসময় ভয়ে থাকি এই বুঝি কিছু হলো। কিন্তু আমার মাথায় প্রায় ৮ লাখ টাকা ঋণ। এই অবস্থায় দেশে ফেরার কোনো সুযোগ নেই।'
সৌদি আরবের আরেক প্রবাসী নাসির উদ্দিন জানান, যুদ্ধের প্রভাবে তার কাজ প্রায় বন্ধ। কয়েক দিন আগে তার থাকার জায়গার মাত্র ১০ মিনিট দূরত্বের মধ্যে বোমা বিস্ফোরণে বেশ কয়েকজন মারা গেছেন। আগে তিনি মাসে ৫০ হাজার টাকা পাঠাতে পারলেও এখন নিজের থাকা-খাওয়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।
একইভাবে সৌদি আরবের একটি সাপ্লাই কোম্পানিতে কর্মরত ইকবাল হোসেন জানান, তার মাসিক আয় ছিল প্রায় এক লাখ টাকা, যা এখন শূন্যের কোঠায়। তিনি বলেন, 'সারাদিন রুমের ভেতরেই থাকতে হয়। মনে হচ্ছে আমরা আটকা পড়েছি।'
ফিরতে চাইলেও ফেরার উপায় নেই
সৌদি প্রবাসী মেহেদী হাসান দেশে ফিরতে চাইলেও ঋণের বোঝা আর অসুস্থ বাবার চিকিৎসার খরচ তাকে আটকে রেখেছে। তিনি বলেন, 'চাকরি ছেড়ে দেওয়া মানে পরিবারের জন্য আর্থিক মৃত্যুদণ্ড। জীবনের ঝুঁকি থাকলেও আমার থেকে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই।'
কুমিল্লায় অবস্থানরত মেহেদীর স্ত্রী তাহমিনা করিম বলেন, 'আমরা প্রতিটা মুহূর্ত আতঙ্কে থাকি। কিন্তু দেশে আমাদের বেঁচে থাকার কোনো অবলম্বন নেই। তাই জীবনের ঝুঁকি আছে জেনেও তাকে সেখানে থাকতে হচ্ছে।'
মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি কেবল এই পাঁচজন নয়, বরং সেখানে থাকা লাখ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিকের ভবিষ্যৎকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
