ভাসমান বাজার, খালের পাশে কংক্রিটের দেয়াল: চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে ৩,৮৭১ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প
দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে গত এক দশকে চার মেগাপ্রকল্পে ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি খরচের পরও বর্ষা এলেই পানির নিচে তলিয়ে যায় বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম। ঐতিহ্যগত ড্রেজিং ও প্রচলিত অবকাঠামো যেখানে বারবার ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে এবার সম্পূর্ণ নতুন ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর মহাপরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)।
নগরীর দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনে ৩ হাজার ৮৭১ কোটি টাকার দুটি নতুন প্রকল্প অনুমোদনের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছে সিটি কর্পোরেশন। এর অধীনে খালের অবৈধ দখল রোধ করতে থাইল্যান্ডের আদলে ভাসমান বাজার চালু করা হবে। পাশাপাশি খালের দুই পাশে আধুনিক রিইনফোর্সড সিমেন্ট কংক্রিটের (আরসিসি) রিটেইনিং দেয়াল নির্মাণ করা হবে।
নতুন উদ্যোগ কেন?
বিগত বছরগুলোতে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মেগা প্রকল্পগুলোর মূল গুরুত্ব ছিল কেবল খাল খনন ও বাঁধ নির্মাণে।
কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পলি জমে খালের ধারণক্ষমতা প্রায় ৪০ শতাংশ কমে যাওয়ায় সেসব প্রকল্প কাঙ্ক্ষিত সুফল দিতে পারেনি।
সিটি কর্পোরেশনের নতুন পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হলো—কেবল পানি নিষ্কাশন নয়, বরং খালের চারপাশকে এমনভাবে সংস্কার করা যাতে নতুন করে কেউ তা দখল করতে না পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত হয়।
প্রস্তাবিত ৩ হাজার ৮৭১ কোটি টাকার এই নতুন মাস্টারপ্ল্যানে বেশ কিছু আধুনিক ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগ যুক্ত করা হয়েছে:
সিটি কর্পোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেনের প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, নগরীর গুরুত্বপূর্ণ খালগুলোকে দখলমুক্ত রাখতে থাইল্যান্ড বা ভেনিসের আদলে 'বোট ট্যুরিজম' বা ভাসমান বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। একটি খাল যখন পর্যটন কেন্দ্রে রূপ নেবে, তখন সেখানে অবৈধ দখলদারিত্ব বা ময়লা ফেলা প্রাকৃতিকভাবেই বন্ধ হয়ে যাবে।
খালের পাড় ভেঙে পলি জমে যাওয়া রোধ করতে এ প্রকল্পে ৩৪.৭৫ কিলোমিটার আরসিসি রিটেইনিং দেয়াল ও ইউ-শেইপড কংক্রিটের চ্যানেল নির্মাণের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, এর ফলে পানির প্রবাহ বহুগুণ বাড়বে এবং ভবিষ্যতে পলি জমার পরিমাণও কমে আসবে।
আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে নগরীর অবশিষ্ট ২১টি অবহেলিত খাল থেকে প্রায় ১৬.১০ লাখ ঘনমিটার পলি ও বর্জ্য অপসারণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এই প্রকল্পে।
কর্মকর্তারা বলছেন, আগের প্রকল্পগুলোর অন্যতম বড় দুর্বলতা ছিল সিটি কর্পোরেশন, সিডিএ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব।
২১টি টাইডাল রেগুলেটর (স্লুইস গেট) নির্মাণ করা হলেও পর্যাপ্ত লজিস্টিক ও জনবলের অভাবে সেগুলো সঠিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি।
সিডিএর বোর্ড সদস্য ও নগর পরিকল্পনাবিদ জেরিনা হোসেন টিবিএসকে বলেন, 'প্রকল্পগুলোর শুরু থেকেই গলদ ছিল। সিডিএর কাছে ড্রেনেজ বিশেষজ্ঞ নেই। তারা কাজ দিয়ে দিল সেনাবাহিনীর কাছে। কোনো প্রকার সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। অদক্ষতা, অপরিকল্পনার কারণে পদে পদে সংশোধন করতে হয়েছে।
'৩৬টি খালের প্রকল্প নেওয়ার সময় বলা হয়েছিল, এগুলোর কাজ করলেই জলাবদ্ধতা থাকবে না। এগুলোর কাজ শেষের পথে এখন বলা হচ্ছে, ২১টি খালের কাজ না করলে পানি প্রবাহ হবে না। তাহলে শুরুতে কেন সবগুলো খাল প্রকল্পে যুক্ত করা হলো না? নতুন প্রকল্প নেওয়া হলেও আমি মোটেও আশাবাদী নই।'
দুটি নতুন প্রকল্প
সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে প্রকল্প দুটির প্রাথমিক কারিগরি ও প্রশাসনিক কাজ সম্পন্ন করেছে। চলতি মাসের মধ্যেই উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) চূড়ান্ত করে অনুমোদনের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।
চসিকের প্রকৌশল বিভাগের তথ্যমতে, দুটি প্রকল্পের মধ্যে একটি হচ্ছে বিদ্যমান ড্রেনেজ কাজে আগে থেকেই অন্তর্ভুক্ত থাকা ৩৬টি খালের রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কার। প্রাথমিকভাবে এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩২২ কোটি টাকা। বর্তমানে এসব খালে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ চলছে।
৩ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকা ব্যয়ের দ্বিতীয় ও অপেক্ষাকৃত বড় প্রকল্পটির আওতায় আগের জলাবদ্ধতা নিরসন উদ্যোগ থেকে বাদ পড়া বাকি ২১টি খালের সংস্কার ও উন্নয়ন করা হবে।
সম্প্রতি এক সভায় মেয়র শাহাদাত হোসেন বলেন, নৌপথকে দখলমুক্ত রাখতে তিন বা চারটি খালে নৌ-পর্যটন ও ভাসমান বাজার চালুর পরিকল্পনা করছে নগর কর্তৃপক্ষ। এই নৌ-যোগাযোগ নেটওয়ার্ককে কালুরঘাট থেকে কর্ণফুলী মেরিন ড্রাইভের সাথে যুক্ত করে একটি সমন্বিত আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন অঞ্চল গড়ে তুলতে প্রকৌশল বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সম্ভাব্যতা যাচাই না থাকায় সমালোচিত সিডিএর প্রকল্প
প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিডিএর প্রধান ড্রেনেজ প্রকল্পটি গোড়াতেই ত্রুটিপূর্ণ ছিল। কোনো ধরনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়াই ২০১৭ সালে এটি অনুমোদন করা হয়।
তারা আরও বলেন, নকশা প্রণয়নের সময় চট্টগ্রামের ১৯৯৫ সালের ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছিল। মূলত চট্টগ্রাম ওয়াসার একটি ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যানের ভিত্তিতে তড়িঘড়ি করে প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়। ২০১৮ সালে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিগেডের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর সমীক্ষা চালানো হয়। নকশায় ব্যাপক পরিবর্তন ও ঘষামাজা করতে হয়, যা প্রকল্পটিকে শুরুতেই ধীরগতির মুখে ফেলে দেয়।
পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় ত্রুটি ছিল শহরের ৫৭টি খালের মধ্যে ২১টিকে বাদ দেওয়া। এর ফলে মূল ৩৬টি খালের কাজ প্রায় শেষ হলেও শহরের অনেক এলাকায় এখনও তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। কারণ বাদ পড়া খালগুলোর পানি সরার কোনো পথ নেই এবং সেগুলোর ওপর থাকা ব্রিজ-কালভার্ট, বিদ্যুৎ ও ওয়াসার লাইনে ময়লা জমে পানি চলাচলে তীব্র প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।
এই ২১টি খালকে কেন বাদ দেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে সিডিএ পরবর্তীতে কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি। মাঝপথে এসে ভুল ঢাকতে এবং সংশোধিত ডিপিপিতে নকশা পরিবর্তন করার কারণে প্রকল্পের ব্যয় একলাফে ৫৪ শতাংশ বা ৩ হাজার ১০ কোটি টাকা বেড়ে ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।
২০২০ সালের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও দফায় দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে তা ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ায় সিডিএ আরও এক বছর মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেছে। বর্তমানে প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি ৯৫ শতাংশ। ৩৬টি খালের মধ্যে ৩০টির কাজ শেষ ও ৬টির কাজ চলছে। প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি ৬৮ শতাংশ।
এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে সিডিএর কারিগরি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা না থাকায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সেনাবাহিনীকে। কিন্তু সিডিএর অদক্ষতা ও ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে তহবিল ছাড় করতে দেরি হওয়ায় মাঠপর্যায়ের অগ্রগতিকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে বছরে প্রায় ৬ মাস কাজ বন্ধ থাকার পাশাপাশি একের পর এক নতুন জটিলতা যুক্ত হওয়ায় দফায় দফায় মেয়াদ বাড়াতে হয়েছে।
সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক আহম্মদ মঈনুদ্দিন টিবিএসকে বলেন, 'ভূমি গ্রহণ জটিলতা ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে বছরে প্রায় ৬ মাস কাজ বন্ধ রাখতে হওয়ায় এই বিলম্ব হয়েছে। তবে আগামী বছরের মধ্যে কাজ শেষ হবে বলে আমরা আশাবাদী।'
ধীরগতিতে তিন প্রকল্প
বহদ্দারহাট বাড়ইপাড়া থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত ২.৯ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন খাল খনন প্রকল্পটি ১৯৯৫ সালের সিডিএ ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ২০১৪ সালে প্রকল্পটি হাতে নিলেও ১২ বছরে এর অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৯৮ শতাংশে। আর আর্থিক অগ্রগতি ৯০ শতাংশ।
শুরুতে ৩২৬.৮৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৬ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রকল্পটির মেয়াদ ও ব্যয় বারবার বাড়ানো হয়। সংশোধিত ভূমি অধিগ্রহণ আইনের কারণে প্রকল্প ব্যয় ৩০৪.১৬ শতাংশ বেড়ে ২০২২ সালের সর্বশেষ সংশোধনীতে মোট ১ হাজার ৩৬২.৬২ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। এর প্রায় ৯০ শতাংশই গেছে জমি অধিগ্রহণে।
প্রকল্প পরিচালক মো. ফরহাদুল আলম বলেন, 'প্রকল্পটির খালের পাশের কিছু সড়কের কাজ বাকি আছে। চলতি বছরের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা আছে।'
সিডিএ'র আরেকটি বড় উদ্যোগ কালুরঘাট-চাক্তাই সড়ক ও বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পও দীর্ঘসূত্রতার কবলে পড়েছে। ২০১৭ অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পটির শুরুতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৩১০ কোটি টাকা, যা পরে বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৭৭৯.৩৯ কোটি টাকা। তিন দফা মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হলেও কাজ পুরোপুরি শেষ করা যায়নি। ফলে সিডিএ আরও এক বছর মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেছে।
প্রধান প্রকৌশলী আহমেদ আনোয়ারুল নজরুল জানান, প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি ৯০ শতাংশ ও আর্থিক অগ্রগতি ৮৬ শতাংশ। আগামী এক বছরের মধ্যে কাজ শেষ হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এদিকে ২০১৯ সালে অনুমোদিত বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও জলাবদ্ধতা নিরসনে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ১ হাজার ৬২০ কোটি টাকার প্রকল্পটি সাত বছরে শেষ হয়নি। আরো এক বছর বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে। শুরু থেকেই বিভিন্ন সংস্থার আপত্তিতে প্রকল্পটি সংকোচন করতে হয়েছে।
সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিগেডের প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ তারিকুল আলম বলেন, প্রকল্পটির ভৌত ও আর্থিক অগ্রগতি প্রায় ৯৫ শতাংশ। ২১টি খালের মুখের রেগুলেটরের মধ্যে ১৭টির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের জন্য কিছুটা বিলম্ব হলেও এখন চারটির কাজই চলছে।
তিনি আরও বলেন, ১০০ মিটার বন্যা প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণের কাজ এখনও বাকি আছে। সবগুলো রেগুলেটর পরিচালনার মতো সক্ষমতা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নেই। তাই এটি সিটি কর্পোরেশনকে বুঝিয়ে দিতে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। এসব কারণে আরো এক বছর সময় বাড়ানো হয়েছে।
