মশা মারতে ঢাকায় বরাদ্দ বেড়েছে সর্বোচ্চ ৭০৭%, তবুও কমছে না ডেঙ্গু
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে মশকনিধন খাতে বরাদ্দ গত এক দশকে সর্বোচ্চ ৭০৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এরপরও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কার্যকর অগ্রগতি দেখা যায়নি। চলতি বছর আবারও ডেঙ্গু সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে।
বাজেট নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছর থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত মশকনিধন খাতে দুই সিটি করপোরেশন ১ হাজার ৩৭ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ দিয়েছে। এর মধ্যে মোট বরাদ্দের প্রায় ৭০ শতাংশই ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের। এ সময়ে ঢাকা উত্তরের বার্ষিক বরাদ্দ বেড়েছে ৭০৭ শতাংশ, আর ঢাকা দক্ষিণে বেড়েছে ৩৬৫ শতাংশ।
তবে বরাদ্দ বাড়লেও ডেঙ্গু সংক্রমণ কমার লক্ষণ নেই।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গতকাল প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এখন পর্যন্ত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ৪৪০ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং মৃত্যু হয়েছে দুজনের। একই সময়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ৭৪৬ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।
সারাদেশে চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৫ হাজার ৩১৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ সময়ে ডেঙ্গুতে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শুধু জুন মাসেই ২ হাজার ১২০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং সাতজনের মৃত্যু হয়েছে।
১০ বছরে বরাদ্দ ১ হাজার ৩৭ কোটি টাকার বেশি
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মশকনিধন খাতে বার্ষিক বরাদ্দ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ২৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১৮৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এতে সর্বশেষ বরাদ্দ ২০১৬-১৭ অর্থবছরের তুলনায় প্রায় আট গুণ হয়েছে।
গত এক দশকে মশকনিধন খাতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন মোট ৭২৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে।
অন্যদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে এ খাতে বার্ষিক বরাদ্দ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫৩ কোটি ৫০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এতে সর্বশেষ বরাদ্দ ২০১৬-১৭ অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৪ দশমিক ৭ গুণ হয়েছে।
গত এক দশকে মশকনিধন খাতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মোট বরাদ্দ ছিল ৩১০ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।
ঢাকা দক্ষিণের ৬৩ ওয়ার্ডে এডিসের ঝুঁকি
বরাদ্দ বাড়লেও অনেক এলাকায় এডিস মশার ঝুঁকি কমেনি।
সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, সংস্থাটির ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টিতেই এডিস মশার ঘনত্ব নির্ধারিত সূচকের চেয়ে বেশি। এর মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ডকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সহায়তায় ১২ মে থেকে ২৩ মে পর্যন্ত এ জরিপ চালায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।
জরিপ করা ২ হাজার ২৫০টি বাড়ির মধ্যে ২৮১টিতেই এডিস মশার লার্ভা ও পিউপা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বহুতল ভবনে সর্বোচ্চ ৩৫ দশমিক ২৩ শতাংশ, একক বাড়িতে ২৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং নির্মাণাধীন ভবনে ১৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ লার্ভা ও পিউপা মিলেছে।
তুলনামূলকভাবে কম বরাদ্দ পেয়েও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এ জরিপ পরিচালনা করলেও বেশি বরাদ্দ পাওয়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো জরিপ করেনি।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনগুলো বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও তা কার্যকর হয়নি। মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করতে ড্রোন ব্যবহার, পরিত্যক্ত টায়ার ও প্লাস্টিকজাত বর্জ্য কিনে নেওয়া, এমনকি বাউল গানের মাধ্যমে সচেতনতা তৈরির মতো উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব প্রচেষ্টা কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি।
এদিকে গত দুই বছর ধরে সিটি করপোরেশনে কোনো ওয়ার্ড কাউন্সিলর নেই। যথাযথ তদারকির অভাবে মশকনিধন ও ডেঙ্গু প্রতিরোধে নেওয়া বিভিন্ন কার্যক্রমের গতি শ্লথ হয়ে পড়ায় পরিস্থিতি এখন নাজুক। হাসপাতালে বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা।
লক্ষ্যভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ দরকার
কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রচলিত ফগিং বা ড্রেনকেন্দ্রিক মশকনিধন পদ্ধতি কার্যকর নয়। কারণ এডিস মশা নোংরা পানিতে নয়, বরং বাসাবাড়ি ও আঙিনায় জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে জন্মায়।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে তথ্য-প্রমাণভিত্তিক সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিতে হবে। এজন্য আগে বৈজ্ঞানিকভাবে এডিস মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে সেগুলোকে লক্ষ্য করে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সিটি করপোরেশনকে সারা বছর কমিউনিটি এনগেজমেন্ট বজায় রাখতে হবে।
ড. কবিরুল বাশার আরও বলেন, সিটি করপোরেশনকে আধুনিক প্রযুক্তি ও ডেটাভিত্তিক পদ্ধতি ব্যবহার করে আরও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক ভূমিকা নিতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কেবল সরকার বা সিটি করপোরেশনের একার পক্ষে সম্ভব নয়; এতে নাগরিকদেরও সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি।
বাজেট বৃদ্ধির বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান বলেন, জনবল ও এলাকার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় খরচও বেড়েছে।
তিনি আরও বলেন, "বাজেট কাজে লাগিয়ে আমরা লার্ভিসাইডিং, ফগিং ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাচ্ছি। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগ্রামও চলছে। তবে সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।"
বাজেট বৃদ্ধির বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী বলেন, কীটনাশকের মূল্যবৃদ্ধি এবং নতুন ওয়ার্ড যুক্ত হওয়ায় বাজেট ও সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। ফলে এখন দিনে দুইবারের পরিবর্তে তিনবার মশকনিধনের কাজ পরিচালনা করা হচ্ছে। জনসাধারণের জন্য নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
