ডেঙ্গুতে দৈনিক ভর্তি ৫০০ ছাড়িয়েছে, বিশেষ ওয়ার্ড চালুর প্রস্তুতি হাসপাতালগুলোর
দেশজুড়ে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। প্রতিদিন ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি মোকাবিলায় অনেক হাসপাতাল এখন বিশেষ ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। রোগীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকায় বেশ কয়েকটি হাসপাতালে শয্যা সংকটও দেখা দিতে শুরু করেছে।
গত এক সপ্তাহে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মাত্র দুই সপ্তাহ আগেও প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ৩০০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হত; আর এখন সেই সংখ্যা বেড়ে ৫০০ ছাড়িয়েছে।
গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে ৫৩০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছিলেন ৫৮০ জন।
এর আগে ২৭ জুলাই একদিনে ৫৪৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। এরপর থেকে প্রতিদিনই রোগী ভর্তির সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "আমাদের হাসপাতালে এখনো ডেঙ্গু কর্নারে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু করা হয়নি, তবে রোগীর চাপ বাড়ছে। প্রয়োজন হলে বর্তমান কর্নারটি সম্প্রসারণ করে ডেডিকেটেড ওয়ার্ডে রূপ দেওয়া হবে। কয়েকজন শিশু ডেঙ্গু রোগীকে আইসিইউতে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।"
তিনি আরও বলেন, "হাসপাতালের পাশাপাশি ব্যক্তিগত চেম্বারেও ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। পরশু আমার চেম্বারে ছয়জন ডেঙ্গু রোগী এসেছিলেন। এবার ডেঙ্গু পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে বলে আমরা আশঙ্কা করছি। টানা বৃষ্টির কারণে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠতে পারে।"
হাসপাতালে শয্যা সংকট
বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
রোগীর চাপ বাড়ায় সেখানে পুরুষ ও নারীদের জন্য আলাদা দুটি ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। প্রতিদিন নতুন করে ১৫ থেকে ২০ জন রোগী ভর্তি হচ্ছেন। রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ওয়ার্ডে শয্যার পাশাপাশি মেঝেতেও রোগী রাখতে হচ্ছে।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. নন্দ দুলাল সাহা বলেন, "বর্তমানে হাসপাতালে শয্যায় ১৭০ জন এবং মেঝেতে ২৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছেন। গত এক সপ্তাহ ধরে ধীরে ধীরে রোগী বাড়ছে। সব বয়সী রোগীই ভর্তি হচ্ছেন। এর মধ্যে প্রায় ৩০ জন শিশু। আমাদের হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীদের প্রায় ৫০ শতাংশই মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা।"
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সারাদেশে ১ হাজার ৩২১ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি আছেন। এর মধ্যে ঢাকার সরকারি হাসপাতালে ২১৮ জন, বেসরকারি হাসপাতালে ৭৬ জন এবং ঢাকার বাইরের বিভিন্ন হাসপাতালে ১ হাজার ২৭ জন ভর্তি রয়েছেন।
তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সকাল ৮টা পর্যন্ত এবং নির্দিষ্ট কিছু হাসপাতালের তথ্য সংকলন করায় অনেক ডেঙ্গু রোগীর তথ্য এর বাইরে থেকে যায়।
ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল মিরপুরের উপপরিচালক ডা. আব্দুল ওয়াহাব বলেন, "আমাদের হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চাপ দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে কোনো শয্যা খালি নেই। প্রতিদিনই রোগী ভর্তির জন্য অনুরোধ আসছে। এখনো আলাদা ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু করা হয়নি। তবে রোগী আরও বাড়লে ডেডিকেটেড ওয়ার্ড চালু করা হবে।"
সতর্ক অবস্থায় হাসপাতালগুলো
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক বিভাগের পরিচালক ডা. নুরুল ইসলাম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু রোগী বাড়ার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত থাকতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর মজুত রাখা হচ্ছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে অতিরিক্ত শয্যা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পৃথক ওয়ার্ড চালুর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
তিনি আরও বলেন, "এক থেকে দুই দিন জ্বর থাকলেও দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে গিয়ে ডেঙ্গু পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদেরও এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগের বছরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব হবে বলে আমরা আশা করছি।"
স্কুলপড়ুয়া শিশুরাই বেশি আক্রান্ত
ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম বলেন, "হাসপাতালে ভর্তি রোগী এবং চেম্বারে আসা রোগীদের দেখে মনে হচ্ছে, এ বছর ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে স্কুলপড়ুয়া শিশুরা। তাই তাদের সুরক্ষায় অভিভাবকদের বাড়তি সতর্ক থাকতে হবে।"
তিনি বলেন, "স্কুলে যাওয়ার সময় শিশুদের ফুলহাতা জামা ও মোজা পরানো উচিত। দুপুরে ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করতে হবে। বাড়ির আশপাশে কোথাও পানি জমে থাকতে দেওয়া যাবে না। পুরোনো টায়ার, টব, পাত্র বা অন্য যেকোনো স্থির পানির উৎস দ্রুত পরিষ্কার করতে হবে।"
তিনি আরও বলেন, "এ সময়ে যেকোনো জ্বরকে গুরুত্ব দিতে হবে। জ্বর হলেই দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ডেঙ্গু পরীক্ষা করানো উচিত। শিশুদের ক্ষেত্রে কোনো অবহেলা করা যাবে না। প্রয়োজনে দ্রুত শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যেতে হবে।"
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এ বছর এখন পর্যন্ত ১৭ হাজার ২১৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মারা গেছেন ৫৯ জন। এর মধ্যে জুলাই মাসে ৩৬ জন এবং আগস্টে এখন পর্যন্ত পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে।
এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ০ থেকে ৫ বছর বয়সী তিনজন এবং ৬ থেকে ১৫ বছর বয়সী ছয়জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ০ থেকে ৫ বছর বয়সী ৯৩৭ জন এবং ৬ থেকে ১৫ বছর বয়সী ২ হাজার ২৭ জন শিশু ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
