সমুদ্রে বিলীন হয়ে যাওয়ার শঙ্কা: নাম বদলে ফেলল বিশ্বের তৃতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রের গর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় থাকা বিশ্বের তৃতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ নাউরু তাদের নাম পরিবর্তন করেছে। দেশটির নতুন দাপ্তরিক নাম রাখা হয়েছে 'রিপাবলিক অফ নাওইরো'। নিজস্ব ঐতিহ্যকে উদযাপন এবং মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় এই পদক্ষেপ নিয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরীয় এই দ্বীপ রাষ্ট্রটি।
তবে দেশটির এই নতুন নাম বিদেশি পর্যটকদের মুখে উচ্চারণ করা কিছুটা কঠিন। দেশটির প্রেসিডেন্ট নাম পরিবর্তনের ঘোষণা করে জানান, নতুন এই বানান ও উচ্চারণ তাদের নিজস্ব জাতীয় ভাষার সাথে হুবহু মিলে যায়।
ইতোমধ্যেই জাতিসংঘের দাপ্তরিক ওয়েবসাইটে দেশটিরে এই নতুন নাম নথিভুক্ত করা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, গত জুন মাসেই সরকারের পক্ষ থেকে নাম পরিবর্তনের অনুরোধ করা হয়েছিল।
শুধু জাতিসংঘই নয় অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ওই অঞ্চলে থাকা আমেরিকা ও চীনের দূতাবাসগুলোও তাদের ওয়েবসাইটে এখন 'নাউরু'র বদলে 'নাওয়েরো' নামটিই ব্যবহার করছে।
দেশটির আন্তর্জাতিক কান্ট্রি কোডও 'এনআরইউ' থেকে বদলে হচ্ছে 'এনআরও'। আর সেখানকার অধিবাসীদেরও এখন আর 'নাউরুয়ান' না ডেকে বলা হবে 'দেঈ-নাওয়েরো' (dei-Naoero)। এতদিন দেশটি মানুষের কাছে 'নাউ-রু' নামে পরিচিত থাকলেও, এখন উচ্চারণ করতে হবে 'নাউ-য়েরো'।
দেশটির সরকারের ফেসবুক পেইজে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়, এই পদক্ষেপের ফলে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রটি তার ঐতিহ্যবাহী নামের কাছে ফিরে যাবে। পূর্বের একটি সরকারি বিবৃতিতে থেকে জানা যায়, কেবল বিদেশিদের উচ্চারণের সুবিধার্থে দেশটি আন্তর্জাতিকভাবে 'নাউরু' নামে পরিচিতি পেয়েছিল। এটি তারা ইচ্ছাকৃতভাবে বেছে নেয় নি, বরং এটি ছিল তাদের জন্য সাময়িক মানিয়ে নেওয়ার বিষয়।
দেশটির প্রেসিডেন্ট এডিয়াং জানান, নাম পরিবর্তনের এই পদক্ষেপ কোনো রাজনৈতিক বিষয় নয়; এটি মূলত তাদের পরিচয়, ঐতিহ্য এবং পূর্বপুরুষদের স্মৃতি রক্ষা ও সন্তানদের ভবিষ্যৎকে সমৃদ্ধ করার প্রচেষ্টা।
সংবিধান সংশোধনের এ প্রস্তাবটি আইনপ্রণেতাদের দুই দফার ভোটে পাশ হয়েছে। তবে দেশটির সংবিধানে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে এখনই চূড়ান্তভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হওয়া যায়নি।
মাত্র ১২,০০০ জনসংখ্যার এই দেশটি জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের তৃতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ (ভ্যাটিকান সিটি এবং টুভালুর পরেই এর অবস্থান)। অন্যদিকে, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত 'পালাউ' বিশ্বের চতুর্থ ক্ষুদ্রতম দেশ।
চুনাপাথরের এই প্রবালদ্বীপটি একসময় জার্মানির উপনিবেশ ছিল। পরবর্তীতে এটি অস্ট্রেলিয়ার অধীনে পরিচালিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৬৮ সালে একটি স্বাধীন প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
দেশটি বহু উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছে। ১৯৭০-এর দশকে ফসফেট খনি উত্তোলনের মাধ্যমে দ্বীপটি প্রচুর ধন-সম্পদে পূর্ণ ছিল। পরবর্তীতে এ শিল্পের পতন ঘটলে ১৯৯০-এর দশকে চরম অর্থনৈতিক ধ্বংসের মুখে পড়ে নাউরু।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি নাইয়েরো। দেশটির নাগরিক ও অবকাঠামো নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে পুনর্বাসনের তহবিল জোগাতে দেশটির সরকার এখন প্রবাসীদেরকে 'অর্থের বিনিময়ে নাগরিকত্ব' দেওয়ার মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে বৈদেশিক বিনিয়োগ খুঁজছে।
সর্বশেষ ঘোষণায় প্রেসিডেন্ট এডিয়াং জানান, এই নাম পরিবর্তন তাদের পুনরুজ্জীবিত জাতীয় গৌরবের সূচনাকে নির্দেশ করে। গত মে মাসে তার সরকার যখন এই পদক্ষেপের পক্ষে ভোট দেয়, তখন দেশটির নাম পরিবর্তন চূড়ান্ত করতে একটি গণভোটের কথাও ঘোষণা করেন তিনি।
গত সপ্তাহের এক বিবৃতিতে দেশটির সরকার জানায়, দীর্ঘ আলোচনা-পর্যালোচনার পর আইনপ্রণেতারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে এ বিষয়ে কোনো গণভোটের প্রয়োজন নেই।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, 'যদিও জনগণের ইচ্ছা জানার জন্য গণভোট আয়োজন করা হয়, তবে 'নাওয়েরো' নামটিকে আমরা কখনই হারিয়ে ফেলিনি; বরং এটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পাওয়ার অপেক্ষায় ছিল।'
এতে আরও বলা হয়, এটি ইতোমধ্যেই এই দেশের জনগণের মূল সত্তা বা পরিচয়; যা জাতীয় প্রতীকে রয়েছে এবং সাধারণ মানুষের মুখে মুখেও প্রচলিত।