মরুভূমির জাহাজও এখন অসহায়: তীব্র গরমে মারা পড়ছে আফ্রিকার উট
উট পরিচিত 'মরুভূমির জাহাজ' হিসেবে। কিন্তু আফ্রিকার তীব্র তাপমাত্রার কাছে এই প্রাণীগুলোও এখন হার মানছে। ইথিওপিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আফার অঞ্চল বিশ্বের অন্যতম উষ্ণ ও শুষ্ক জায়গা। এখানকার যাযাবররা উটের পিঠে করে লবণ পরিবহন করেন।
সেমেরা অঞ্চলের উট পালনকারী আলী উমর (৪০) বিবিসিকে বলেন, 'আমি আমার উটগুলোকে চরম যন্ত্রণায় ভুগতে দেখছি।' প্রায় ৫০০ উটের মালিক উমর জানান, 'তীব্র গরমে উটগুলোর পায়ে ফোসকা পড়ছে, চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। বালুর প্রচণ্ড উত্তাপে বসার সময় তাদের চামড়া পুড়ে যাচ্ছে এবং লোম ঝরে যাচ্ছে।' গত এক মাসে গরমে তার আটটি উটের বাছুরের মৃত্যু হয়েছে। আগে যেসব বাতাসে শীতলতা থাকত, এখন সেসব বাতাসও তপ্ত হয়ে বইছে।
শুধু উমরের পর্যবেক্ষণ নয়, বিজ্ঞানীরাও বলছেন, তীব্র তাপের ফলে উটেরা মানসিক চাপ, ক্লান্তি, পানিশূন্যতা এবং বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। উত্তর আফ্রিকা ও হর্ন অব আফ্রিকায় বিশ্বের ৮০ শতাংশ ড্রোমেডারি (এক কুঁজের উট) বাস করে। খরার মধ্যেও টিকে থাকার ক্ষমতার কারণে এই অঞ্চলের চাষিরা উট পালনে আগ্রহী হয়েছিলেন। কিন্তু ২০২৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তন উটের স্বাস্থ্য ও প্রজনন ক্ষমতার ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে।
সোমালিয়ার পরিস্থিতি আরও নাজুক। জুনে প্রকাশিত এক গবেষণা অনুযায়ী, দেশটিতে খরাজনিত কারণে উটের মৃত্যু এক বড় সংকটে রূপ নিয়েছে, যা প্রায় ৪৬ শতাংশ উট পালনকারী পরিবারকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। প্রায় ৬ হাজার পরিবারের ওপর করা এই গবেষণায় দেখা গেছে, সোল অঞ্চলে উটের মৃত্যুর হার প্রায় ৭৩ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেটেরিনারি সেবা ও সঠিক পশু ব্যবস্থাপনার অভাব এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
কেনিয়ার মারসাবিট কাউন্টির পশুচিকিৎসক হাসান নুয়া গুইয়ো জানিয়েছেন, গত দুই বছরে ওই অঞ্চলে গরমের কারণে উটের মৃত্যু ১৫ শতাংশ বেড়েছে। হাইপারথার্মিয়ার কারণে উটগুলো নানা সংক্রমণে আক্রান্ত হচ্ছে। আলজেরিয়ার একটি গবেষণাতেও গ্রীষ্মকালীন তাপপ্রবাহে উটের মৃত্যুর হার বৃদ্ধির চিত্র উঠে এসেছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ঝুঁকি এড়াতে গ্রীষ্মকালে পানি ও খাবারের জোগান বাড়ানো এবং নিবিড় নজরদারি প্রয়োজন। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, ১৯৮১ সালের পর থেকে উত্তর আফ্রিকায় তাপপ্রবাহের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালে এই অঞ্চল ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে।
সাধারণত ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশপাশের তাপমাত্রা উট অনায়াসে সহ্য করতে পারে। তারা তাদের শরীরের তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি বাড়িয়ে বা কমিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়। ফলে তাদের ঘামতে হয় না এবং পানিশূন্যতা কম হয়। কিন্তু জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) বিজ্ঞানী ড. মোহাম্মদ বেঙ্গুমি জানান, সাহারার অনেক জায়গায় এখন তাপমাত্রা প্রায়ই ৫০ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
আলজেরিয়ার ঘারদাইয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদেলমাজিদ চেহমা বলেন, 'আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় ধরে ৪১ থেকে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা তাদের কোষগুলোকে সরাসরি আক্রমণ করে। এই চাপের মুখে উটের শ্বেত রক্তকণিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোষগুলো নিজেকে মেরামত করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত ধ্বংস হয়ে যায়।' এর ফলে উটের বিপাক প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়, খাবার গ্রহণ কমে যায় এবং তীব্র অবসাদ ও ক্লান্তি ভর করে। এর ফলে দুধের উৎপাদন হ্রাস পাওয়া ও প্রজনন সমস্যার মতো জটিলতা তৈরি হয়।
মরক্কোর ক্যাসাব্লাঙ্কা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ এল খাসমি জানান, উচ্চতাপের কারণে উটকে ওজন হ্রাস, মাংসপেশি ও হাড়ের রোগ, কিডনি বিকল হওয়া এবং পরজীবীর আক্রমণসহ নানা সংক্রামক ব্যাধির মুখোমুখি হতে হয়।
তীব্র দাবদাহের কারণে ইথিওপিয়ার অনেক উট পালনকারী উত্তরের ঐতিহ্যবাহী এলাকা ছেড়ে দক্ষিণের দিকে সরে যাচ্ছেন। ভিশন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড্যানিয়েল জেলান বলেন, 'এটি কোনো মৌসুমি স্থানান্তর নয়। চরম গরম ও খরার কারণে ওই এলাকাগুলো এখন আর উট পালনের উপযোগী নয়।' অক্সফামের মতে, খরার কারণে সোমালিয়ার কিছু এলাকায় পানির দাম ২০০০ শতাংশের বেশি বেড়ে গেছে।
উট পালনকারী আলী উমর এখন বড় উটগুলোকেও হারানোর ভয়ে আছেন। অধ্যাপক চেহমা বলেন, 'উট মরুভূমির মানুষের টিকে থাকার শেষ অবলম্বন। কিন্তু বর্তমান তীব্র তাপপ্রবাহ তাদের শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতাকে যেভাবে ধ্বংস করছে, তাতে এই প্রাণীটি এখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ শিকারে পরিণত হয়েছে।'
