মেড ইন বাংলাদেশ: আর্টনেচারের কাস্টমাইজড উইগ যাচ্ছে জাপান, সিঙ্গাপুরে
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জাপানিজ ইকোনমিক জোনে অবস্থিত আর্টনেচার বাংলাদেশের কারখানার উৎপাদন ফ্লোরটি যেকোনো পোশাক কারখানার মতোই মনে হয়। তবে আর্টনেচারের বিশেষত্ব আলাদা। এখানে প্রায় ২০০ কর্মী উন্নত মানের উইগ বা পরচুলা তৈরি করেন, যা গ্রাহকের প্রয়োজন ও পছন্দ অনুযায়ী কাস্টমাইজ করা যায়।
কোম্পানিটির জাপান ও সিঙ্গাপুরে বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে। গ্রাহকেরা এসব কেন্দ্রে গিয়ে মাথার থ্রিডি স্ক্যান করান। সেই স্ক্যানের ভিত্তিতে গ্রাহকের মাথার মাপ, আকৃতি ও পছন্দের রং অনুযায়ী কাস্টমাইজড উইগ তৈরি করা হয়।
আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষিত কর্মীদের নিখুঁত কারিগরি দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে জাপানের বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত আর্টনেচার বাংলাদেশ লিমিটেড আন্তর্জাতিক মানের উইগ তৈরি করছে। প্রতিষ্ঠানটি এখন জাপান ও সিঙ্গাপুরের মতো উন্নত বাজারে এসব উইগ রপ্তানি করছে।
একটি উইগ তৈরি করতে এখানে সাত থেকে আটটি ধাপ পেরোতে হয়। কর্মী ও কর্মকর্তারা জানান, একটি উইগের বেসে চুল বসানোর পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে একজন কর্মীর প্রায় দুই থেকে তিন মাস সময় লাগে।
বাংলাদেশ স্পেশাল ইকোনমিক জোন, যা জাপানিজ ইকোনমিক জোন নামেও পরিচিত, সেখানে প্রায় ৪ দশমিক ৯৪ একর জায়গাজুড়ে কারখানাটি গড়ে উঠেছে। বর্তমানে এখানে প্রায় ৩০০ কর্মী কাজ করছেন।
সম্প্রতি কারখানাটি পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, উৎপাদন ফ্লোরে প্রায় ২০০ কর্মী মনোযোগ দিয়ে কাজ করছিলেন, যাদের বেশির ভাগই নারী। কেউ আলাদাভাবে উইগে চুলের গোছা বসাচ্ছেন, কেউ সেলাই করছেন, আবার কেউ ফ্রেম প্রস্তুত করছেন।
কারখানার কয়েকটি কক্ষে কর্মীদের ল্যাপটপ কম্পিউটার ব্যবহার করে গবেষণাসংশ্লিষ্ট কাজ করতেও দেখা যায়।
ইকোনমিক জোনটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক চিহারু তাগাওয়া বলেন, বর্তমানে সেখানে তিনটি কোম্পানি পণ্য উৎপাদন করছে; এর মধ্যে আর্টনেচার একটি।
কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, আর্টনেচার ইতোমধ্যে বাংলাদেশে ১ কোটি ৪৪ লাখ ডলার বিনিয়োগ করেছে এবং চলতি বছর আরও ২০ লাখ ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি উচ্চমানের উইগ ও হেয়ার-কেয়ার পণ্য উৎপাদন করে থাকে।
কারখানার কর্মী সানজিদা আক্তার বলেন, "শুরুতে আমরা প্রায় ছয় মাসের প্রশিক্ষণ পেয়েছি। এখন আমরা অত্যন্ত সূক্ষ্ম কাজ করি। হাতে তৈরি প্রতিটি উইগে সময় ও যত্ন—দুটিই লাগে। এখানকার কাজের পরিবেশ ভালো।"
আরেক কর্মী মুরাদ হোসেন বলেন, ইকোনমিক জোনের এই কারখানায় তিনি বাইরের অনেক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বেশি মজুরি পান।
কোম্পানিটি জানিয়েছে, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার মাধ্যমে তারা উচ্চমানের উইগ তৈরি করতে পারছে, যা ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে ভালো গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। ক্যানসার রোগী এবং চুল পড়ার সমস্যায় ভোগা মানুষের জন্য এসব উইগ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
কারখানার মহাব্যবস্থাপক মো. তানভির রহমান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "আমরা বর্তমানে শুধু হেয়ার উইগ উৎপাদন করছি এবং শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছি। ভবিষ্যতে কাঁচা ফাইবার প্রক্রিয়াজাতকরণে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।"
তিনি বলেন, "বাংলাদেশে তৈরি উইগের বাজার ইতোমধ্যে রয়েছে। তবে আর্টনেচার কাস্টমাইজড হেয়ার উইগে বিশেষায়িত, অর্থাৎ প্রতিটি উইগ নির্দিষ্ট গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী আলাদাভাবে তৈরি করা হয়। কাস্টমাইজড উইগের এই বাজারটি বাংলাদেশে এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।"
তানভির আরও বলেন, "আমরা এখন ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছি।"
একতলা শেড-ধাঁচের কারখানাটিতে জাপানি শিল্প নকশা ও কর্মক্ষেত্রের শৃঙ্খলার ছাপ রয়েছে। পরিদর্শনের সময় দেখা যায়, উৎপাদন ফ্লোরের অর্ধেকের বেশি জায়গা খালি। ভবিষ্যতে সেখানে আরও প্রায় ৮০০ কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা করছে কোম্পানিটি।
তানভির বলেন, "আমাদের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত দক্ষ কর্মী পাচ্ছি না। আমরা এখন নতুন কর্মী নিয়োগ দিয়ে তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। ভবিষ্যতে আরও প্রায় ৮০০ কর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে, আর তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়াই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।"
কারখানাটি বিশেষ করে নারীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে। কর্মীদের দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা ও আয় বাড়াতে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দিতে ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে প্রশিক্ষকও আনা হচ্ছে।
বিভিন্ন ওয়েবসাইটে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পণ্যের ধরনভেদে এধরনের উইগের বাজারমূল্য ভিন্ন হয়। ফুল উইগের দাম সাধারণত প্রায় ৫৭০ ডলার থেকে ১ হাজার ৭৮০ ডলারের মধ্যে থাকে। আর প্রিমিয়াম ও কাস্টম-মেড উইগের দাম ৩ হাজার ৭৫০ ডলার বা তার বেশি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশে তৈরি উইগ এখন শুধু স্থানীয় শিল্পপণ্য হিসেবেই নয়, বৈশ্বিক উচ্চমূল্যের বাজারে সম্ভাবনাময় রপ্তানি পণ্য হিসেবেও উঠে আসছে।
হেয়ার উইগ ও এক্সটেনশনের বাজারের আকার
গ্লোবাল মার্কেট ইনসাইটস ইনকরপোরেশনের (জিএমআই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বৈশ্বিক হেয়ার উইগ ও এক্সটেনশন বাজারের আকার ছিল ৭৫০ কোটি ডলার। ২০২৫ সালে এই বাজার বেড়ে ৭৯০ কোটি ডলারে দাঁড়াবে এবং ২০৩৪ সাল নাগাদ তা ১ হাজার ২৬০ কোটি ডলারে পৌঁছাবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী টিবিএসকে বলেন, "প্রতিটি অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘিরে দক্ষতা উন্নয়নে সহায়তা করতে আমরা কাজ করছি। আর্টনেচারের জাপানি বিনিয়োগকারীরা প্রাথমিকভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সরকারের পক্ষ থেকেও আমরা কর্মীদের দক্ষতা বাড়াতে উদ্যোগ নিয়েছি। এই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে পারলে এ খাতে আরও অগ্রগতি সম্ভব হবে।"
