ই-জিপিতে আ. লীগ আমলের ঠিকাদার ঠেকাতে পিপিএ-পিপিআর সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার: ফখরুল
ই-জিপি টেন্ডারে আওয়ামী লীগ আমলের ঠিকাদারদের কাজ পাওয়া ঠেকাতে সরকার পিপিএ ২০০৬ এবং পিপিআর সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তিনি বলেন, ই-জিপি টেন্ডারে আওয়ামী লীগ আমলের ঠিকাদারদের কাজ পাওয়া ঠেকাতে সরকার পিপিএ ২০০৬ এবং পিপিআর সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে।
সোমবার (৮ জুন) জাতীয় সংসদে নরসিংদী-৫ আসনের সংসদ সদস্য মো. আশরাফ উদ্দিনের উত্থাপন করা জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশের জবাবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী এ কথা বলেন।
এসময় সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়ে সরকারের উদ্যোগকে সমর্থন জানান।
আশরাফ উদ্দিন বলেন, 'স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) দেশের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। গ্রামীণ সড়ক, সেতু, কালভার্ট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার অবকাঠামোসহ নানা উন্নয়নমূলক কাজ এলজিইডির মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এসব প্রকল্প জনগণের জীবনমান উন্নয়ন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রাখতে বিশেষ অবদান রাখছে।'
তিনি বলেন, 'কিন্তু দুঃখের বিষয়, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে স্থানীয় এলাকার কাজ অন্য জেলা বা বিভাগের ঠিকাদারদের দেওয়া হয়। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা সমস্যা দেখা দেয়। বহিরাগত ঠিকাদাররা অনেক সময় নিয়মিত কাজ তদারকি করেন না, স্থানীয় বাস্তবতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা থাকে না, শ্রমিক ব্যবস্থাপনায় জটিলতা সৃষ্টি হয় এবং কাজের গুণগত মানও প্রশ্নবিদ্ধ হয়।'
তিনি আরও বলেন, 'নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়া, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলার মতো অভিযোগও প্রায়ই উঠে আসে। একইসঙ্গে আবার সেই কাজ হাত বদল হয়ে স্থানীয় ঠিকাদারদের কাছেই ফেরত আসে। একই ভাবে সেই স্থানীয় ঠিকাদাররা যদি প্রফেশনাল না হয় তখন আবার তার হাত বদল হয়।'
আশরাফ উদ্দিন বলেন, 'এতে করে কাজের খরচ বেড়ে যায়, আর এই বাড়তি খরচ মেটাতে নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করা হয়। আর তাতে কাজের গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায়।'
তিনি বলেন, 'অন্যদিকে স্থানীয় ঠিকাদাররা এলাকার ভৌগোলিক অবস্থা, জনসাধারণের চাহিদা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও মৌসুমি বাস্তবতা সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত থাকেন। তারা কাজের প্রতি অধিক দায়িত্বশীল থাকেন, কারণ কাজের মান খারাপ হলে সরাসরি স্থানীয় জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয়।'
তিনি আরও বলেন, 'এছাড়া স্থানীয় ঠিকাদারদের কাজের সুযোগ দিলে এলাকার অর্থনীতি সচল হয়, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায় এবং স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যও উপকৃত হয়।'
তিনি এই সমস্যা সমাধানের জন্য দ্রুত উদ্যোগ চান।
জবাবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, 'এলজিইডির আওতায় পিপিএ ২০০৬ এবং পিপিআর অনুযায়ী মূলত দুটি পদ্ধতিতে কাজ সম্পাদন করা হয়। এর মধ্যে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত সীমিত দরপত্র পদ্ধতিতে শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট জেলার ঠিকাদাররাই অংশ নেন, যেখানে বাইরের কারও সুযোগ নেই। তবে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে শর্ত ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী দেশের যেকোনো প্রান্তের ঠিকাদার কাজ পেতে পারেন।'
মন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর ই-জিপির ফাঁকফোকর ও অতীতের অনিয়ম নিয়ে সম্পূরক প্রশ্ন তোলেন সংসদ সদস্য আশরাফ উদ্দিন।
তিনি অভিযোগ করেন, বিগত ফ্যাসিস্ট আমলের কিছু প্রভাবশালী ঠিকাদার, যাদের প্রোফাইল কাগজে-কলমে অনেক শক্তিশালী, তারা ই-জিপির মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কাজগুলো সহজে পেয়ে যাচ্ছেন।
আশরাফ উদ্দিন আরও অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকারের সমর্থক ঠিকাদাররা কাজ পাচ্ছেন না। কিন্তু যারা কাজ পাচ্ছে, তারা নিজেরা মাঠে কাজ না করে পর্দার আড়ালে থেকে স্থানীয় অযোগ্য লোকদের কাছে কাজগুলো কয়েক দফায় বিক্রি বা হাতবদল করছেন। দাম কমে যাওয়ার কারণে বাধ্য হয়েই স্থানীয় পর্যায়ে নিম্নমানের মালামাল দিয়ে কাজ করা হচ্ছে, যার প্রত্যক্ষ সাক্ষী খোদ সংসদ সদস্যরা।
এই অনিয়ম রুখতে এবং স্থানীয় ঠিকাদারদের জবাবদিহির আওতায় আনতে ঠিকাদারি পদ্ধতিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা জানতে চান তিনি।
এ সময় অধিবেশনের সভাপতি ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, 'এই সমস্যা আমাদের সবার। মন্ত্রী জবাব দেবেন আশা করি '
সংসদ সদস্যদের এই উদ্বেগের সঙ্গে শতভাগ একমত পোষণ করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বলেন, 'মাঠপর্যায়ের এই বাস্তব সমস্যা ও ভোগান্তি সম্পর্কে সরকার পুরোপুরি অবগত আছে। এই ক্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থা ও কাজের ক্ষতিকর হাতবদল ঠেকাতে ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা হয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, 'সঠিক ও যোগ্য স্থানীয় ঠিকাদাররা যাতে যথাযথভাবে কাজ পান এবং গ্রামীণ অবকাঠামোর মান বজায় থাকে, সেজন্য বিদ্যমান ক্রয় আইন বা পিপিআর কীভাবে রিভিউ বা সংশোধন করা যায়, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।'
