৭০ অনুচ্ছেদ না থাকলে কি বিরোধীদলীয় প্রার্থী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জিততে পারতেন?
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফল প্রায় নিশ্চিত বলেই মনে হচ্ছে। তবে বিরোধীদের দাবি, 'জুলাই সনদে' প্রস্তাবিত সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের সংস্কার কার্যকর হলে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারতেন। তাতে বিরোধী প্রার্থীর জয়ের সুযোগও তৈরি হতে পারত। এমন পরিস্থিতিতে কী হতে পারে, তার একটি উত্তর পাওয়া যায় ভারতের ইতিহাসে।
আগামী ২০ আগস্ট বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। ভোট হওয়ার আগেই ফল অনেকটাই অনুমান করা যাচ্ছে। সংসদের ৩৪৯টি নির্বাচিত আসনের মধ্যে বিএনপিরই ২৪৭টি। মিত্রদের নিয়ে তাদের সমর্থন দুই-তৃতীয়াংশের চেয়েও বেশি। দলটি রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দিয়েছে তাদের প্রবীণ মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে। অন্যদিকে, বিরোধী ১১-দলীয় জোট মনোনয়ন দিয়েছে প্রবীণ রাজনীতিক ও মুক্তিযুদ্ধের 'বীর বিক্রম' খেতাবপ্রাপ্ত অলি আহমদকে।
তবে বিরোধীদের দাবি, 'জুলাই জাতীয় সনদ' বাস্তবায়িত হলে; বিশেষ করে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার করা হলে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যরা নিজেদের বিবেচনা অনুযায়ী ভোট দিতে পারতেন। সে ক্ষেত্রে অলি আহমদ মির্জা ফখরুলকে হারাতেও পারতেন।
এই যুক্তির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ একটি গণতান্ত্রিক প্রশ্ন আছে। তবে তাত্ত্বিকভাবে যা সম্ভব, বাস্তব রাজনীতিতে সেটি কতটা কার্যকর, সে প্রশ্নও সামনে আসে। জুলাই সনদ বাংলাদেশে যে ধরনের ব্যবস্থার দিকে যাওয়ার প্রস্তাব করেছে, ভারতে তার একটি উদাহরণ আছে। সেখানে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে 'ফ্লোর-ক্রসিং' আইন প্রযোজ্য নয়।
ভারতের নির্বাচন কমিশনও স্পষ্ট করে বলেছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নির্বাচকমণ্ডলীর সদস্যরা নিজেদের ইচ্ছামতো ভোট দিতে পারেন। তারা দলীয় হুইপ মানতে বাধ্য নন। কিন্তু এই স্বাধীনতা ভারতেও খুব কম ক্ষেত্রেই বড় ধরনের অঘটন ঘটিয়েছে। ১৯৪৭ সালের পর ভারতের ইতিহাসে মাত্র একবার ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে হেরেছেন। সেই ব্যতিক্রমী ঘটনাটি ঘটেছিল ৫৭ বছর আগে। সেবার ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী হেরেছিলেন দলেরই বিদ্রোহী এক স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছে।
ভি ভি গিরির ব্যতিক্রমী নির্বাচন
১৯৬৯ সালের ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এখনো সবচেয়ে বড় উদাহরণ হয়ে আছে। সেখানে বিশাল রাজনৈতিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী হেরে যান। তবে ঘটনাটিকে শুধু বিরোধীদের জয় হিসেবে দেখলে ভুল হবে। আসলে সেটি ছিল ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের ভেতরের এক তীব্র ক্ষমতার লড়াই।
১৯৬৯ সালের মে মাসে দায়িত্বরত অবস্থায় রাষ্ট্রপতি জাকির হুসাইনের মৃত্যু হয়। ফলে নির্ধারিত সময়ের আগেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রয়োজন পড়ে। সে সময় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে কংগ্রেসের প্রবীণ নেতাদের একটি শক্তিশালী অংশের তীব্র দ্বন্দ্ব চলছিল। এই গোষ্ঠীটি 'সিন্ডিকেট' নামে পরিচিত ছিল। দলের সাংগঠনিক কাঠামোর বড় অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তারা নীলম সঞ্জীব রেড্ডিকে কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করেন।
ইন্দিরা গান্ধী এই সিদ্ধান্ত মেনে নেননি। তৎকালীন উপরাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়ান। শুরুতে ইন্দিরা গান্ধী তাকে প্রকাশ্যে খুব জোরালো সমর্থন দেননি। পরে তিনি কংগ্রেসের সংসদ সদস্য ও বিধায়কদের নিজের 'বিবেক' অনুযায়ী ভোট দিতে বলেন। বার্তাটি পরিষ্কার ছিল, দলের আনুষ্ঠানিক প্রার্থীকে ভোট দিতেই হবে, এমন বাধ্যবাধকতা তারা মানতে পারেন।
অনেকেই সেটিই করেন। দ্বিতীয় পছন্দের ভোট গণনার পর ভি ভি গিরি ৪ লাখ ২০ হাজার ৭৭ ভোট পান। অন্যদিকে রেড্ডি পান ৪ লাখ ৫ হাজার ৪২৭ ভোট। খুব অল্প ব্যবধানে জয়ী হন ভি ভি গিরি। এর রাজনৈতিক প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। সিন্ডিকেট ইন্দিরা গান্ধীকে কংগ্রেস থেকে বহিষ্কার করে। এরপর দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে দুই ভাগে ভেঙে যায়—কংগ্রেস (অর্গানাইজেশন) এবং কংগ্রেস (রিকুইজিশনিস্টস)।
তাই ১৯৬৯ সালের নির্বাচনকে শুধু এমন একটি ঘটনা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না, যেখানে আইনি স্বাধীনতা পেয়ে হঠাৎ সংসদ সদস্যরা দলীয় অবস্থানের বাইরে ভোট দিয়েছিলেন। বরং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনটি ছিল কংগ্রেসের ভেতরে আগে থেকেই চলতে থাকা ক্ষমতার লড়াইয়ের চূড়ান্ত মঞ্চ।
এই ঘটনাটি আরেকটি রাজনৈতিক বাস্তবতাও সামনে আনে। গোপন ভোট দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার আইনি শাস্তি দূর করতে পারে, কিন্তু এর রাজনৈতিক পরিণতি দূর করতে পারে না। সেই হিসাবে বিরোধীদের যুক্তি একটি সীমিত সাংবিধানিক অর্থে সঠিক। ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার হলে সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আইনগতভাবে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারতেন। কিন্তু স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকা আর কয়েক ডজন সংসদ সদস্যের বাস্তবে দলীয় অবস্থানের বাইরে গিয়ে ভোট দেওয়া—দুটি এক বিষয় নয়।
