সরকারি দুই সংস্থার টানাপোড়েনে ৮ বছর ধরে বেহাল দশায় চট্টগ্রামের অক্সিজেন–কুয়াইশ সড়ক
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) টানাপোড়েনের কারণে দীর্ঘ আট বছর ধরে কোনো স্থায়ী সংস্কার ছাড়াই পড়ে আছে চট্টগ্রামের অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়ক।
সড়কটির বিভিন্ন স্থানে কংক্রিট ও পিচঢালাইয়ের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এতে সড়কটি কার্যত চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
বর্ষা মৌসুমে এসব গর্তে পানি জমে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে, বিকল হচ্ছে যানবাহন এবং তৈরি হচ্ছে তীব্র যানজট। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে পুরো এলাকা ধুলায় ছেয়ে যায়, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সড়কের এমন বেহালদশায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন গণপরিবহন ও বাণিজ্যিক যানবাহনের চালকেরা। প্রতিনিয়ত ভাঙাচোরা সড়কে গাড়ি চালাতে গিয়ে তাদের অর্থনৈতিক ও শারীরিক—উভয় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।
মোহাম্মদ হান্নান নামে এক চালক বলেন, "আগে রাস্তায় পানি উঠত, এখন পানি ওঠা কিছুটা কমলেও রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ। আমাদের গাড়ি বারবার নষ্ট হয়ে যায়, নাট-বল্টু খুলে পড়ে এবং নিয়মিত গ্যারেজে নিয়ে মেরামত করতে হয়। যারা প্রতিদিন এ সড়কে গাড়ি চালান, তাদের দুর্ভোগের শেষ নেই। ঝাঁকুনির কারণে নিয়মিত ব্যথানাশক ওষুধ খেতে হচ্ছে। অনেকের হৃদরোগের সমস্যাও দেখা দিচ্ছে। এমনকি সারাদিনের কাজ শেষে সকালে ঘুম থেকে উঠলেও শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভূত হয়।"
নগরের উত্তরাংশ, হাটহাজারী, রাউজান, ফটিকছড়ি এবং পার্বত্য জেলা রাঙামাটি ও কাপ্তাই উপজেলার বাসিন্দাদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প ও প্রধান সড়ক।
সড়কটির আশপাশে গড়ে উঠেছে এভারকেয়ার হাসপাতালের মতো বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র, ইংরেজি মাধ্যম স্কুল, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হেফজখানা এবং কুয়াইশ বুড়িশ্চর শেখ মোহাম্মদ সিটি কর্পোরেশন কলেজসহ ১০টিরও বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
অক্সিজেন মোড় হয়ে বায়েজিদ লিংক রোডের মাধ্যমে সড়কটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সঙ্গেও যুক্ত। প্রতিদিন হাজারো রোগী, শিক্ষার্থী, চালক ও স্থানীয় বাসিন্দা এ পথ ব্যবহার করেন।
চিকিৎসার জন্য মোমিনবাগ আবাসিক এলাকা থেকে এভারকেয়ার হাসপাতালে আসা মুরাদুর রহমান বাবর বলেন, "ব্যক্তিগত গাড়িতে আসার পথেই দেখলাম রাস্তার অবস্থা অত্যন্ত বেহাল। সাধারণ মানুষের জন্য এ পথে চলাচল করা খুবই কষ্টকর। গুরুতর রোগীদের জন্য পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। একটি স্বনামধন্য হাসপাতাল ও আবাসিক এলাকা থাকার পরও সড়কটি কার্যত ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।"
তিনি দ্রুত ও কার্যকর সংস্কারের মাধ্যমে জনদুর্ভোগ নিরসনের দাবি জানান।
নিয়মিত চলাচলকারী মুহাম্মদ আলী নামে আরেক বাসিন্দা আক্ষেপ করে বলেন, "সড়কটির অবস্থা এতটাই খারাপ যে গাড়ি ঠিকমতো চলতে পারে না। বছরের পর বছর ধরে আমরা এই দুর্ভোগ সহ্য করছি।"
যেভাবে তৈরি হলো অচলাবস্থা
২০০৫ সালে নগরের চান্দগাঁও ও কুয়াইশ এলাকায় ১৬৯ একর জমির ওপর অনন্যা আবাসিক প্রকল্প গ্রহণ করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। প্রকল্পের আওতায় ২০১৩ সালে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়কের নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে সড়কটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
তবে উদ্বোধনের প্রায় এক দশক পরও সড়কটি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। ফলে সড়কটির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ কার্যত বন্ধ রয়েছে।
২০১৮ সালে চট্টগ্রাম ওয়াসার পাইপলাইন স্থাপনের জন্য সড়কের কিছু অংশ কাটা হয়েছিল। পরে সিডিএ সেসব অংশ জোড়াতালি দিয়ে মেরামত করলেও বর্তমানে পুরো সড়কই চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
সড়কটির দায়িত্ব গ্রহণের জন্য সিডিএ দুই দফা চিঠি দিলেও চসিক তা গ্রহণ করেনি।
চসিকের সচিব আশরাফুল আমিন টিবিএসকে বলেন, "বর্তমানে সড়কটির মালিকানা সিডিএর অধীনেই রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী কোনো সংস্থা অন্য সংস্থার কাছে সড়ক হস্তান্তর করলে সেটি সম্পূর্ণ মেরামত ও সচল অবস্থায় বুঝিয়ে দিতে হয়। কিন্তু এই সড়কের অবস্থা অত্যন্ত বেহাল। শুধু সড়কই নয়, পাশের নালাগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত। এ অবস্থায় সড়কটি গ্রহণ করা সম্ভব নয়।"
তিনি আরও বলেন, কোনো সড়কের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেওয়ার আগে সেটিকে সম্পূর্ণ ব্যবহার উপযোগী অবস্থায় বুঝিয়ে দিতে হয়। বর্তমান অবস্থায় সড়কটি গ্রহণ করলে প্রায় নতুন করে নির্মাণের সমপরিমাণ ব্যয় প্রয়োজন হবে।
তবে সড়ক হস্তান্তর বিষয়ে সমাধানের লক্ষ্যে চসিকের দুইজন এবং সিডিএর তিনজন প্রতিনিধিকে নিয়ে পাঁচ সদস্যের একটি যৌথ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। চলতি বছরের জানুয়ারিতে কমিটি তাদের সুপারিশ ও শর্তাবলি জমা দিয়েছে।
চসিকের প্রধান সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে— দীর্ঘ সময় অযত্নে পড়ে থাকায় সড়কটি সম্পূর্ণ নতুনভাবে পুনর্নির্মাণ করে দিতে হবে। আর যদি সিডিএ তা করতে না পারে, তাহলে নতুন করে সড়ক নির্মাণে যে পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন হবে, তা চসিককে প্রদান করতে হবে।
জোড়াতালির মেরামত আর স্থায়ী সমাধানের প্রতিশ্রুতি
শনিবার (৭ জুন) পোবেল একাডেমি সংলগ্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সিডিএর নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আলিফ এন্টারপ্রাইজের কর্মীরা একটি ট্রাক ও ক্রেন নিয়ে সড়ক সংস্কারের কাজ করছেন। তারা সড়কের গর্ত পরিষ্কার করে সেখানে সলিং ও হেরিংবোন বন্ড পদ্ধতিতে ইট বসাচ্ছেন।
আলিফ এন্টারপ্রাইজের কর্মী আবু বকর সিদ্দিক টিবিএসকে বলেন, "ইট ও বালু দিয়ে গর্ত ভরাট করে আমরা অক্সিজেন মোড় পর্যন্ত কাজ করব। পুরো কাজ শেষ করতে প্রায় ১৫ দিন সময় লাগবে।"
তিনি বলেন, এটি মূলত জরুরি ভিত্তিতে সাময়িক দুর্ভোগ কমানোর উদ্যোগ। স্থায়ী সমাধানের জন্য বড় পরিসরে প্রকল্প ও টেন্ডারের প্রয়োজন।
কুয়াইশ এলাকার তালুকদার সুপারশপের স্বত্বাধিকারী মো. দিদার টিবিএসকে বলেন, "দুই দিন আগে কাজ করা হলেও বৃষ্টির কারণে আবার আগের মতো গর্ত তৈরি হয়েছে। এই জোড়াতালির কাজ দেওয়া আর না দেওয়া সমান। বারবার এভাবে মেরামতের নামে টাকা খরচ না করে স্থায়ীভাবে সড়কটি সংস্কার করা উচিত। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এ পথ ব্যবহার করে।"
দীর্ঘদিনের এই সংকটের বিষয়টি স্বীকার করেছেন সিডিএ চেয়ারম্যান মো. নুরুল করিম।
তিনি টিবিএসকে বলেন, "আজ থেকে প্রায় ১০ বছর আগেই সড়কটি সিটি কর্পোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা উচিত ছিল। তখন তা না করে সিডিএ বড় ভুল করেছে। দীর্ঘদিন হস্তান্তর প্রক্রিয়া ঝুলে থাকায় সড়কটি অনেকটা অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছিল।"
তিনি আরও বলেন, ওয়াসা পাইপলাইন স্থাপনের জন্য সড়ক খনন করলেও সিডিএ কোনো ক্ষতিপূরণ পায়নি। সড়কটি সিটি কর্পোরেশনের অধীনে থাকলে এ ক্ষতিপূরণ আদায় করা সম্ভব হতো।
সিডিএ চেয়ারম্যান জানান, সংস্থাটির নিজস্ব কোনো নির্দিষ্ট রক্ষণাবেক্ষণ তহবিল নেই। এ কারণে বর্তমানে 'জাংশন ডেভেলপমেন্ট' নামের একটি পৃথক খাত থেকে অর্থ বরাদ্দ এনে জরুরি সংস্কার ও গর্ত ভরাটের কাজ চালানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, "চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের সঙ্গে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে, সিডিএ সাময়িকভাবে সড়কের গর্তগুলো ভরাট করে চলাচলের উপযোগী করে দেবে। এরপর সিটি কর্পোরেশন আনুষ্ঠানিকভাবে সড়কটির দায়িত্ব গ্রহণ করবে।"
"দায়িত্ব গ্রহণের পর চসিক নিজস্ব প্রক্রিয়ায় বর্ষা শেষে সড়কটির স্থায়ী ও বড় পরিসরের সংস্কারকাজ শুরু করবে," যোগ করেন তিনি।
