চট্টগ্রামে তীব্র গ্যাস সংকট: পরিবহন ও জনজীবনে ভোগান্তি, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজট
চট্টগ্রামে তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে একযোগে ব্যাহত হচ্ছে গণপরিবহন ও আবাসিক জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় নগরীর বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও এই সারি দেড় থেকে দুই কিলোমিটার পর্যন্ত ছাড়িয়ে গেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস না পেয়ে অনেক সিএনজি অটোরিকশা সড়কে নামতেই পারছে না।
ফিলিং স্টেশনগুলোতে যানবাহনের এই দীর্ঘ লাইনের প্রভাব পড়েছে নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কেও। স্টেশনসংলগ্ন সড়ক ছাড়িয়ে যানজট ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের এলাকায়, যার ফলে বিভিন্ন স্থানে যান চলাচল অত্যন্ত ধীর হয়ে পড়েছে।
সিএনজি অটোরিকশার সংকটে বিকল্প গণপরিবহন হিসেবে বাসে যাত্রীদের উপচে পড়া চাপ লক্ষ্য করা গেছে। একই সঙ্গে কোনো কোনো রুটে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়ার অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। তেলচালিত ছোট যানবাহনগুলোতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে।
গত মঙ্গলবার রাত থেকে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কমতে শুরু করে। এরপর বুধবার দিনভর ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারি দেখা যায় এবং গতকাল বৃহস্পতিবার সকালেও একই পরিস্থিতি বজায় ছিল। অনেক চালক ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস না পেয়ে খালি গাড়ি নিয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
অক্সিজেন এলাকার একটি ফিলিং স্টেশনে অপেক্ষমাণ সিএনজি অটোরিকশাচালক আব্দুল গফুর টিবিএসকে বলেন, 'সকাল ৭টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। বিকেল পর্যন্ত গাড়িতে গ্যাস নিতে পারিনি। গ্যাসের চাপ এত কম যে একটি গাড়িতে গ্যাস দিতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় তিন-চার গুণ বেশি সময় লাগছে।'
দামপাড়া এলাকার অটোরিকশাচালক আব্দুল কাদের বলেন, 'গেল রাতেও গ্যাসের জন্য লাইনে অপেক্ষা করেও গ্যাস পাইনি। পরে তেল নিয়ে সড়কে বের হয়েছি। ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় যাত্রীও পাচ্ছি না।'
আরেক চালক গফুর আহমেদ জানান, গ্যাসের পাশাপাশি তেল ব্যবহারের বিকল্প সুবিধা থাকা কিছু অটোরিকশা তেলের ওপর ভর করে সড়কে নামতে পারলেও, শুধু গ্যাসচালিত অনেক গাড়ি গ্যারেজেই পড়ে রয়েছে। চালকদের ভাষ্য, গ্যাসের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করায় কর্মঘণ্টার বড় অংশ নষ্ট হচ্ছে, যার ফলে মালিকের দৈনিক জমা তোলাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
সিএনজি অটোরিকশা কমে যাওয়ায় স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতেও যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে এবং বিকল্প হিসেবে বাসে বাসের চাপ বেড়েছে। বিশেষ করে নিউ মার্কেট-অক্সিজেন, বহদ্দারহাট-নিউ মার্কেট, কালুরঘাট-কাঠগড় ও ভাটিয়ারী-পতেঙ্গা রুটে ভোগান্তি সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া অক্সিজেন, ২ নম্বর গেট, মুরাদপুর, জিইসি, টাইগারপাস, আগ্রাবাদ, ইপিজেড ও বন্দরটিলা এলাকাতেও গণপরিবহনে উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে।
ইপিজেড এলাকার পোশাকশ্রমিক লতিফুন নাহার টিবিএসকে বলেন, 'গ্যাস সংকটের কারণে সিএনজি অটোরিকশা কমে গেছে। তাই বাধ্য হয়ে বাসে উঠতে হচ্ছে। কিন্তু বাসেও বাড়তি ভাড়া দিতে হচ্ছে। আমাদের মতো পোশাক শ্রমিকদের জন্য এই বাড়তি খরচও অনেক চাপের।'
চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী শাহানাজ আক্তার বলেন, 'গ্যাস সংকটের কারণে সিএনজি অটোরিকশা কমে গেছে। বাসেও অনেক বেশি ভিড়। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাড়তি ভাড়াও দিতে হচ্ছে। এতে সময়মতো কলেজে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে।'
বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ
গ্যাস সংকটের সুযোগে বিভিন্ন রুটে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। যাত্রীদের দাবি, নিউ মার্কেট-অক্সিজেন, বহদ্দারহাট-নিউ মার্কেট, কালুরঘাট-কাঠগড় ও ভাটিয়ারী-পতেঙ্গা রুটে জনপ্রতি ১০ থেকে ১৫ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া তেলচালিত মাহিন্দ্রা ও অন্যান্য ছোট যানবাহনে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।
মো. রমজান নামের এক যাত্রী টিবিএসকে বলেন, 'রাস্তায় সিএনজি কমে যাওয়ায় চালকেরা বাড়তি ভাড়া চাইছেন। বাধ্য হয়ে বেশি টাকা দিয়ে যেতে হচ্ছে। গ্যাস সংকটের ভোগান্তি এখন যাত্রীদের ওপরও পড়ছে।'
তবে গণপরিবহনে এভাবে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার বিষয়ে কোনো সাংগঠনিক নির্দেশনা নেই বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহজাহান।
তিনি টিবিএসকে বলেন, 'গ্যাসের জন্য চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এ কারণে কেউ কেউ নিজ উদ্যোগে বাড়তি ভাড়া নিচ্ছেন। তবে সংগঠনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার কোনো নির্দেশনা নেই।' গ্যাসচালিত গাড়ি তেলে চালানোর সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'গ্যাস সংকটের সুযোগে কেউ বাড়তি ভাড়া নিতে পারেন, তবে এটাকে সংগঠনের সিদ্ধান্ত বলা যাবে না।'
রান্নাবান্না বন্ধ আবাসিক এলাকায়
পরিবহন খাতের পাশাপাশি বাসাবাড়ির আবাসিক লাইনেও গ্যাস সংকটের তীব্র প্রভাব পড়েছে। গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ শূন্যের কোঠায় নেমে আসায় রান্নাবান্না সম্পূর্ণ ব্যাহত হয়েছে।
খুলশী গরীবুল্লাহ শাহ হাউজিং সোসাইটির বাসিন্দা শবনম আক্তার বলেন, 'গতকালও গ্যাসের চাপ কম থাকায় রান্না করতে অনেক সময় লেগেছে এবং আজ একদমই গ্যাস না থাকায় তিনি রান্নাবান্না করতে পারেননি। বাধ্য হয়ে হোটেল থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে।'
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে প্রতিদিন প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। তবে এই চরম সংকটের মধ্যে সরবরাহ নেমে এসেছে মাত্র ১৮০ থেকে ২১০ এমএমসিএফডির মধ্যে, অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় বর্তমানে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে।
কেজিডিসিএলের কর্মকর্তারা জানান, মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি সমস্যা এবং বঙ্গোপসাগরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে গ্যাস সরবরাহ হ্রাস পেয়েছে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশনস) মো. শোয়েব জানান, মহেশখালী এলাকায় বর্তমানে বাতাসের গতি প্রায় ৩৮ নট। নিরাপদে এলএনজিবাহী জাহাজ টার্মিনালে ভেড়ানোর জন্য বাতাসের গতি ২০ নটের নিচে থাকা প্রয়োজন। কর্মকর্তারা আশা করছেন, আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে এলএনজিবাহী জাহাজটি টার্মিনালে ভেড়ানো সম্ভব হবে এবং গ্যাস সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক হবে। তবে সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত নগরীর পরিবহন ও আবাসিক খাতে এই ভোগান্তি অব্যাহত থাকতে পারে।
