রাজশাহীর ৩ পরিত্যক্ত মিল ফের চালু, ৫ হাজার কর্মসংস্থান তৈরি করল প্রাণ-আরএফএল
সাভারের একটি পোশাক কারখানায় চার বছর কাজ করার পর ২৪ বছর বয়সী সানজিদা আক্তার ২০২৪ সালে রাজশাহীতে নিজের বাড়িতে ফিরে আসেন। পরিবারের সহায়তা ছাড়া দূরে থেকে সন্তান লালন-পালনের পাশাপাশি কারখানার জীবন সামলাতে গিয়ে তিনি হিমশিম খাচ্ছিলেন।
মাসের পর মাস তিনি মনে করেছিলেন, তার কর্মজীবন বুঝি শেষ হয়ে গেছে। তবে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) মডেলের আওতায় দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা রাজশাহী টেক্সটাইল মিল পুনরায় চালু করে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। এরপরই পরিস্থিতি বদলে যায়।
এখন সানজিদা তার বাড়ি বানেশ্বর থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরের একটি জুতা কারখানায় কাজ করছেন।
সানজিদা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'আমি কখনও ভাবিনি বাড়ির কাছে আবার কারখানায় চাকরি পাব। এখন আমি আয়ও করতে পারছি, পরিবারের সঙ্গেও থাকতে পারছি এবং একই সঙ্গে সন্তানের দেখভালও করতে পারছি।'
সানজিদার গল্প এখন রাজশাহীতে নতুন করে উঠে আসা অসংখ্য গল্পের একটি। দীর্ঘদিন অবহেলিত এবং দেশের সবচেয়ে কম শিল্পায়িত অঞ্চলগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত এ অঞ্চলে শিল্পের পুনর্জাগরণের চিত্র ফুটে উঠছে এতে। বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় চালু হওয়ায় স্থানীয়ভাবে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে এবং শ্রমিকদের ঢাকা ও অন্যান্য শিল্পাঞ্চলে পাড়ি দেওয়ার নির্ভরতা কমছে।
গত দুই বছরে প্রাণ-আরএফএল রাজশাহীতে বন্ধ থাকা তিনটি কারখানা পুনরুজ্জীবিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত রাজশাহী টেক্সটাইল মিল, রাজশাহী জুট মিল এবং আরেকটি বেসরকারি কারখানা। এসব কারখানায় প্রায় ৫ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং আগামী বছরগুলোতে এই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কারখানাগুলোতে এখন ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার রপ্তানি বাজারের জন্য নন-লেদার জুতা, লাগেজ, ব্যাকপ্যাক, ট্রলি, নারীদের হ্যান্ডব্যাগ, তাঁবু ও ছাতা উৎপাদন করা হচ্ছে।
পরিত্যক্ত মিল থেকে রপ্তানিমুখী কারখানা
১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত রাজশাহী টেক্সটাইল মিল ক্রমাগত লোকসানের কারণে ২০০৩ সাল থেকে বন্ধ ছিল। দুই দশকেরও বেশি সময় অচল থাকার পর প্রাণ-আরএফএলের বিনিয়োগ উদ্যোগে কারখানাটি আবার চালু হয়েছে।
বর্তমানে কারখানাটিতে প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিক কাজ করছেন। তাদের অনেকেই আগে কাজের জন্য ঢাকা বা গাজীপুরে চলে গিয়েছিলেন।
৩০ বছর বয়সী স্বপ্না খাতুন একসময় গাজীপুরে কাজ করার সময় তার ছোট মেয়েকে রাজশাহীতে রেখে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। এখন তিনি পাবা উপজেলার বাড়ি থেকে মাত্র ১২ কিলোমিটার দূরের একটি কারখানায় কাজ করছেন।
তিনি বলেন, 'দূরে কাজ করলে সন্তানের পড়াশোনা ও পারিবারিক জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থানীয়ভাবে চাকরি হলে জীবন অনেক সহজ হয়ে যায়।'
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করা ২২ বছর বয়সী সুলতানা খাতুন, যিনি পুনরায় চালু হওয়া আরেকটি কারখানায় কাজ করছেন, বলেন এই সুযোগের কারণে স্নাতক শেষ করে তাকে আর ঢাকায় যেতে হয়নি।
জুতা ও লাগেজ শিল্পে বড় বিনিয়োগ
গত দুই বছরে জুতা ও লাগেজ উৎপাদনে প্রাণ-আরএফএল প্রায় ৩২৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে চলতি বছরে আরও ২০০ কোটি টাকা এবং আগামী তিন বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় ৪৮ লাখ জোড়া জুতা উৎপাদন করছে প্রতিষ্ঠানটি। আন্তর্জাতিক বাজারের বাড়তে থাকা চাহিদা মেটাতে আগামী তিন বছরের মধ্যে উৎপাদন দেড় কোটি জোড়ায় উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্যমতে, চীনে উৎপাদন ব্যয় বাড়তে থাকায় বৈশ্বিক ক্রেতারা সরবরাহের উৎস বৈচিত্র্যময় করতে বাংলাদেশমুখী হচ্ছেন, বিশেষ করে নন-লেদার জুতার ক্ষেত্রে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ১১৯ কোটি ডলারের জুতা রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে নন-লেদার জুতা থেকে এসেছে ৫২ কোটি ২০ লাখ ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২৫ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি।
বর্তমানে নরসিংদী, রাজশাহী, রংপুর ও পাবনায় প্রাণ-আরএফএলের আটটি জুতা ও লাগেজ কারখানা চালু রয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রামে আরও দুটি কারখানা সংস্কারের কাজ চলছে।
প্রতিষ্ঠানটি ৪৫টি দেশে পণ্য রপ্তানি করে, যার প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ। নন-লেদার জুতা ও লাগেজ থেকে রপ্তানি আয় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে ১৭৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা আগের বছর ছিল ৯২ কোটি টাকা।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, 'আমরা শক্তিশালী ক্রয়াদেশ পাচ্ছি। কিন্তু উৎপাদন সম্প্রসারণে দেরি হওয়ায় সুযোগ হাতছাড়া হচ্ছে। বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু করা আমাদের জন্য দ্রুত সমাধান দিচ্ছে, একই সঙ্গে ঢাকার বাইরে কর্মসংস্থানও তৈরি করছে।'
বন্ধ জুট মিলে এখন তৈরি হচ্ছে তাঁবু ও ছাতা
প্রাণ-আরএফএল রাজশাহী জুট মিলও পুনরায় চালু করেছে। ৩৫ বছরের পিপিপি চুক্তির আওতায় চলতি বছরের শুরুতে প্রতিষ্ঠানটি মিলটি ইজারা নেওয়ার আগে প্রায় ১৪ বছর ধরে এটি বন্ধ ছিল।
পুরোনো কারখানার একটি শেডে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৫০০ শ্রমিক বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর জন্য রপ্তানিমুখী তাঁবু ও ছাতা তৈরি করছেন।
কারখানা কর্মকর্তারা জানান, বর্তমান পরীক্ষামূলক উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ছাতা তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। ভবিষ্যতে উৎপাদন সক্ষমতা ১০ হাজার ইউনিটের বেশি করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ছোট পরিসরে তাঁবু উৎপাদনও শুরু হয়েছে, যা ধীরে ধীরে বাড়ানো হবে।
প্রাণ-আরএফএলের জুতা ও চামড়াজাত পণ্য বিভাগের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা রাহাত হোসেন রনি বলেন, 'আমরা বিদ্যমান অবকাঠামোসহ ৩৫ একর জমি ইজারা নিয়েছি।'
তিনি বলেন, 'শুরুর দিকে আমরা পুরোনো সরকারি ভবনগুলো ব্যবহার করেছি। সেগুলোর পুরো ব্যবহার নিশ্চিত করার পর নিজেদের বিনিয়োগে আরও দুটি কারখানা ভবন নির্মাণ করেছি।'
রনির ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন ভবনগুলোর একটির আয়তন ৬০ হাজার বর্গফুট এবং অন্যটির আয়তন ১ লাখ ৫০ হাজার বর্গফুট।
তিনি আরও বলেন, 'আমরা ইতোমধ্যে বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে আলোচনা করছি। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে এই কারখানাতেই ৭ থেকে ৮ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে।'
শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে বাংলাদেশের শিল্পখাত বিকেন্দ্রীকরণের সম্ভাবনাকে সামনে এনেছে। তাদের ভাষ্যমতে, ঢাকা থেকে ছোট শহরে চলে যাওয়া শ্রমিকরা কম জীবনযাত্রার ব্যয়ের কারণে বেশি ক্রয়ক্ষমতা ভোগ করতে পারেন।
প্রাণ-আরএফএল কর্মকর্তাদের মতে, বৈশ্বিক উৎপাদন ধীরে ধীরে চীন থেকে সরে আসায় বাংলাদেশের বৃহৎ গ্রামীণ শ্রমশক্তি দেশটিকে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার মতো দেশের তুলনায় প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা দিচ্ছে।
রনি বলেন, 'কেউ যদি ঢাকার বদলে রাজশাহীতে একই বেতন পান, তাহলে তার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।'
তিনি বলেন, গ্রামীণ এলাকায় দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি এখনো উৎপাদনশীলতায় প্রভাব ফেলছে। এছাড়া এখনো ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কাঁচামাল চীন থেকে আমদানি করতে হয়, ফলে সরবরাহে বিলম্ব হচ্ছে। প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে শুল্ক ও বন্ডেড ওয়্যারহাউস প্রক্রিয়া সহজ করার আহ্বান জানান রনি।
