টানা বৃষ্টি ও ডিজেল সংকটে ডিমের সরবরাহ কমছে, বাড়ছে দাম
দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ডিমের দাম ডজনে ২০-২৫ টাকা বেড়েছে। রাজধানীর খুচরা বাজারে বর্তমানে প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকায়।
খামারিরা জানিয়েছেন, ডিজেল সংকট ও টানা ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে ডিমের উৎপাদন কমে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে বাজার দরে।
রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি পিস লাল ফার্মের ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৩ টাকা করে। সাদা ডিম বিক্রি হচ্ছে ১২ টাকা করে। সে হিসাবে সাদা ডিমের ডজন বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকায়। অথচ এক সপ্তাহ আগেও প্রতি ডজন লাল ডিম বিক্রি হয়েছে ১২৫-১৩০ টাকায় এবং সাদা ডিম ছিল ১২০-১২৫ টাকার মধ্যে।
পাইকারি বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মঙ্গলবার তেজগাঁও ডিমের আড়তে প্রতি পিস লাল ডিম বিক্রি হয়েছে ১০ টাকা ৮০ পয়সায়। সাদা ডিম বিক্রি হয়েছে ১০ টাকায়। খামার পর্যায়ে লাল ডিম বিক্রি হচ্ছে ১০ টাকা ৪০ পয়সায়।
রাজধানীর শাহজাদপুরের খুচরা ডিম বিক্রেতা আল আমিন বলেন, "পাইকারিতে ডিমের দাম বেড়েছে। তাই বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।"
খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টানা বৃষ্টি ও মেঘলা আবহাওয়ার কারণে ডিমের উৎপাদনশীলতা কমে গেছে। গত ৮-১০ দিন ধরে টানা বৃষ্টিপাতের কারণে মুরগি প্রয়োজন অনুযায়ী আলো পাচ্ছে না। আবার খামারে ব্যবহৃত জেনারেটরের জন্য পর্যাপ্ত ডিজেলও পাওয়া যাচ্ছে না।
এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে পাইকারিতে প্রতি পিস ডিম ৭-৮ টাকায় বিক্রি হয়েছে, যেখানে উৎপাদন খরচ ছিল প্রায় ১০ থেকে সাড়ে ১০ টাকা। দীর্ঘ সময় ধরে উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে বিক্রি করতে হওয়ায় অনেক খামারি খামার বন্ধ করে দিয়েছেন বা উৎপাদন সক্ষমতা কমিয়ে এনেছেন।
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) মহাসচিব ও ইউনাইটেড অ্যাগ্রো কমপ্লেক্সের মালিক খন্দকার মোহাম্মদ মহসিন টিবিএসকে বলেন, "আমার এক লাখ ২০ হাজার লেয়ার মুরগির ধারণক্ষমতার খামার রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে তিনটি খামারে মুরগি আছে মাত্র ১৫-১৭ হাজার। ডিজেল সংকটের কারণে জেনারেটর চালাতে পারি না। তিন দিনের জন্য মাত্র ১০ লিটার ডিজেল দেওয়া হয়।"
দীর্ঘমেয়াদে ডিমের দাম কম থাকায় অনেক খামার বন্ধ হয়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, "গত ৭-৮ মাস ধরে খামারিরা লোকসানে ডিম বিক্রি করেছেন। এত দীর্ঘ সময় ধরে কখনো দাম কম ছিল না। কৃষকরা উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে বিক্রি করেছেন। ফলে অনেকে খামার বন্ধ করে দিয়েছেন বা সক্ষমতা কমিয়ে এনেছেন।"
সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাতে উৎপাদন কমেছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, "টানা মেঘলা আবহাওয়া ও বৃষ্টিপাত হলে ডিমের উৎপাদন ১২-১৭ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। পর্যাপ্ত আলো না পেলে মুরগির স্বাভাবিক উদ্দীপনা থাকে না। ফলে ডিম উৎপাদনও কমে যায়। এখন বাজারে ডিমের সংকট রয়েছে।"
ডিমের আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধিতে বিপাকে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষও। রাজধানীর গুলশানে একটি বাড়িতে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করা জাহিদুল ইসলাম টিবিএসকে বলেন, "চাল, তেল, চিনি, সবজি, মাছ-মাংস—সবকিছুর দামই বেশি। খাওয়ার মধ্যে ডিমই কিছুটা সাধ্যের মধ্যে ছিল। এখন ডিমের দামও ডজনে ২০ টাকা বেড়েছে।"
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলট্রি সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. বাপন দে টিবিএসকে বলেন, "টানা বৃষ্টিপাতের কারণে ডিমের উৎপাদনশীলতা কমে যায়। আমাদের দেশের লেয়ার মুরগিগুলো মূলত শীতপ্রধান দেশের জাত। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতে খাদ্যে আর্দ্রতা বেড়ে ফাঙ্গাস হতে পারে। আবার ডিম পাড়া মুরগির দৈনিক প্রায় ১৬ ঘণ্টা আলো প্রয়োজন হয়। দিনের আলোর পাশাপাশি কৃত্রিম আলোরও প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু মেঘলা আবহাওয়ায় পর্যাপ্ত আলো পাওয়া যায় না। এতে হরমোনে প্রভাব পড়ে এবং ডিমের উৎপাদন কমে যায়। এবার আগেভাগেই বৃষ্টি শুরু হওয়ায় অনেক খামারি অপ্রস্তুত অবস্থায় সমস্যায় পড়েছেন।"
